পোস্টগুলি

চম্বলের আসল গাব্বার সিং এবং ১৯৫০-এর দশকের সন্ত্রাস।

ছবি
আরে ও সাম্বা! কিতনে আদমি থে?" — ১৯৭৫ সালের 'শোলে' সিনেমার এই সংলাপ শোনেননি, এমন ভারতীয় খুঁজে পাওয়া দায়। সিনেমার গাব্বার সিংকে আমরা সবাই চিনি। কিন্তু আপনারা কি জানেন সেলুলয়েডের এই কাল্পনিক চরিত্রের পেছনে লুকিয়ে ছিল এক রক্তমাংসের বাস্তব মানুষ? যার ভয়ে ১৯৫০-এর দশকে কেঁপে উঠেছিল গোটা চম্বল উপত্যকা মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ এবং রাজস্থানের বিস্তীর্ণ অঞ্চল? হ্যাঁ আজ আমরা কথা বলছি আসল গাব্বার সিং গুজ্জারকে নিয়ে। সিনেমার গাব্বারের চেয়েও বাস্তবের গাব্বার ছিল বহুগুণ বেশি ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর এবং কুখ্যাত। আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগে ১৯৫০-এর দশকে সে চম্বলের বুকে যে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল  তার গল্প যেকোনো থ্রিলারের চেয়েও রোমহর্ষক। চলুন আজ ইতিহাসের সেই অন্ধকার অধ্যায়ে ফিরে যাওয়া যাক। গাব্বার সিংয়ের জন্ম হয়েছিল ১৯২৬ সালে, মধ্যপ্রদেশের ভিন্দ জেলার এক সাধারণ গুজ্জার পরিবারে। ছোটবেলায় সে কিন্তু জন্মগত অপরাধী ছিল না। তবে চম্বলের মাটি আর সেখানকার বাতাস বরাবরই কিছুটা বিদ্রোহী। ১৯৫০ সালের দিকে মাত্র ২৪-২৫ বছর বয়সে গাব্বার সিং অপরাধের দুনিয়ায় পা রাখে। শোনা যায়, কোনো এক পারিবারিক বা জমিজম...

বোম্বাইয়ের প্রথম ‘স্টাইলিশ’ ডন রুস্তম মোদী ও ১৯৬০-এর কাঁপানো ডাকাতি।

ছবি
আজ থেকে প্রায় ৬০ বছর আগের কথা। বোম্বাই তখন আজকের মতো এত ব্যস্ত বা বহুতল ভবনে ঢাকা ছিল না। কিন্তু আরব সাগরের তীরের এই শহরে তখন তৈরি হচ্ছিল এক নতুন আন্ডারওয়ার্ল্ড। আমরা অনেকেই হাজি মাস্তান, বরদারাজন বা করিম লালার নাম শুনেছি। কিন্তু আপনি কি জানেন এই সব ডনদের উত্থানের আগে ১৯৬০-এর দশকে বোম্বাই পুলিশকে যিনি একাই নাকানিচুবানি খাইয়েছিলেন তিনি কে ছিলেন? তিনি কোনো বস্তি থেকে উঠে আসা সাধারণ পকেটমার ছিলেন না। তিনি ছিলেন সুশিক্ষিত মার্জিত পোশাক পরিহিত এবং পার্সি পরিবারের একজন সন্তান। তাঁর নাম—রুস্তম সোহরাব মোদী। আর তাঁর দলবলকে শহর চিনত "রুস্তম গ্যাং" নামে। আজকের ব্লগে আমরা এমন এক অপরাধীর গল্প শুনব যে তৎকালীন বোম্বাইয়ের ব্যাংকার ব্যবসায়ী এবং পুলিশ কমিশনারের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। এটি কেবল কিছু চুরির গল্প নয় এটি হলো নিখুঁত পরিকল্পনা স্টাইল এবং বিশ্বাসঘাতকতার এক রোমাঞ্চকর দলিল। রুস্তম সোহরাব মোদী। অপরাধ জগতের আর পাঁচটা গ্যাংস্টারের সাথে তাঁর আকাশ-পাতাল তফাত ছিল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শন সবসময় দামি স্যুট পরতেন চমৎকার ইংরেজি বলতেন এবং তাঁর চালচলন ছিল একদম রাজকীয়। সাধারণ মানুষ তা...

ভারতের ভারী শিল্প এবং উৎপাদন খাত।

ছবি
নমস্কার বন্ধুরা, স্বাগতম আপনাদের আমাদের আজকের এই বিশেষ ব্লগে। আচ্ছা, আপনারা কি কখনো ভেবে দেখেছেন, আজ আমরা যে আধুনিক পৃথিবীতে বাস করছি—যেখানে আকাশচুম্বী ভবন রয়েছে, বিশাল বিশাল সেতু রয়েছে, প্রতিদিন রাস্তায় লাখ লাখ গাড়ি চলছে, আকাশে উড়োজাহাজ উড়ছে—এই সবকিছুর ভিত্তি কী? এর পেছনের আসল শক্তিটি কিন্তু আমাদের চোখের সামনে সরাসরি আসে না। আর সেই শক্তিটি হলো—"ভারী শিল্প এবং উৎপাদন খাত" বা Heavy Industry and Manufacturing Sector। অনেকেই মনে করেন বর্তমান যুগটা কেবল সফটওয়্যার বা আইটি খাতের। কিন্তু সত্যটা হলো, আইটি খাতের তৈরি সফটওয়্যার যে কম্পিউটারে চলে সেই কম্পিউটারও কিন্তু কোনো না কোনো উৎপাদন কারখানায় তৈরি হয়। ভারী শিল্প হলো যেকোনো দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। আজ আমরা এই ব্লগের সফরে জানবো ভারী শিল্প আসলে কী, এটি কীভাবে কাজ করে, আমাদের জীবনে এর গুরুত্ব কতটা এবং এই খাতের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে। আপনি যদি একজন ছাত্র হন ব্যবসায়ী হন কিংবা সাধারণ কোনো কৌতূহলী মানুষ—আজকের এই পোস্টে আপনার চিন্তাভাবনা বদলে দেবে। তাই একদম শেষ পর্যন্ত আমাদের সাথেই থাকুন। শুরুতেই সহজ ভাষায় বুঝে নেওয়া যাক ভারী শ...

চম্বলের বাগী মানসিং ও মোহর সিংয়ের ত্রাসের দুই দশক (১৯৫০-১৯৭০)।

ছবি
নমস্কার। আজ আমরা ফিরে যাব ইতিহাসের এমন এক অধ্যায়ে, যেখানে আইনের শাসন আর প্রকৃতির নির্মমতা মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। ভারতের মানচিত্রের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত একটি অঞ্চল—চম্বল।মধ্যপ্রদেশ রাজস্থান আর উত্তরপ্রদেশের সীমানা ছুঁয়ে যাওয়া এই চম্বল নদীর উপত্যকা শুধু তার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের জন্য পরিচিত নয় এটি পরিচিত ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এবং রোমাঞ্চকর ডাকাত বা 'বাগী'দের উপাখ্যানের জন্য। সাধারণ মানুষের কাছে তারা ছিল ডাকাত কিন্তু চম্বলের গিরিখাতের গভীরে তারা নিজেদের বলত বাগী—অর্থাৎ বিদ্রোহী। আজ আমরা আলোচনা করব ১৯৫০ থেকে ১৯৭০—এই দুই দশকের এমন দুজন মানুষকে নিয়ে যাদের নামে চম্বলের বাতাস কেঁপে উঠত। একজন হলেন বাগী ঠাকুর মানসিং, আর অন্যজন দস্যু মোহর সিং। এই ব্লগে আমরা জানব কীভাবে চম্বলের বিহাইন্ড বা গিরিখাতগুলো হয়ে উঠেছিল অপরাধের রাজধানী, এবং কীভাবে এই দুই সর্দার পুরো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। মানসিং বা মোহর সিংয়ের গল্প বোঝার আগে চম্বলকে বোঝা জরুরি। চম্বল নদী হাজার বছর ধরে মাটি কেটে এমন এক গোলকধাঁধা তৈরি করেছে, যাকে বলা হয় 'বিহাইন্ড' বা Ravines। মাইলের পর মাইল জ...

কলকাতার ধারাবাহিক ব্যাংক ও পোস্ট অফিস ডাকাতি – এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস।

ছবি
নমস্কার। কলকাতা—যাকে আমরা 'সিটি অফ জয়' বা আনন্দের শহর বলে জানি। যে শহর তার সংস্কৃতি আড্ডা আর শান্ত পরিবেশের জন্য পরিচিত। কিন্তু আজ থেকে কয়েক দশক আগে, এই শান্ত শহরের বুকেই দানা বেঁধেছিল এক চরম অশান্তি। একের পর এক ব্যাংক আর পোস্ট অফিসে হতে শুরু করেছিল দুর্ধর্ষ সব ডাকাতি। দিনদুপুরে, ব্যস্ততম রাস্তায়, খোদ পুলিশের নাকের ডগা দিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা লুঠ হয়ে যাচ্ছিল। এটা কোনো সিনেমার গল্প নয় এটা আমাদের এই কলকাতারই এক অন্ধকার অধ্যায়। আজকের ব্লগে আমরা ফিরে যাব সেই সময়ে যখন কলকাতার ব্যাংক আর পোস্ট অফিসগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল এবং লালবাজারের গোয়েন্দাদের রাতের ঘুম উড়ে গিয়েছিল। কোনো অপরাধই হঠাৎ করে আকাশ থেকে পড়ে না তার পেছনে থাকে একটা নির্দিষ্ট সময়কাল এবং সামাজিক পটভূমি। ৭০, ৮০ বা ৯০-এর দশকের কলকাতার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট ছিল অত্যন্ত জটিল। বেকারত্ব ও রাজনৈতিক অস্থিরতা: তৎকালীন সময়ে যুবসমাজের একাংশের মধ্যে তীব্র হতাশা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। অস্ত্রের সহজলভ্যতা: সীমান্ত পেরিয়ে বা ভিন রাজ্য থেকে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের শহরে প্রবেশ ঘটেছিল। ডিজিটাল...

বহুমুখী নদী ও বাঁধ প্রকল্প।

ছবি
নমস্কার বন্ধুরা! মানব সভ্যতার ইতিহাস যদি আমরা দেখি, তবে দেখব সমস্ত বড় বড় সভ্যতা গড়ে উঠেছিল কোনো না কোনো নদীর তীরে। নদী আমাদের জীবন, নদী আমাদের অর্থনীতি। কিন্তু এই নদীই যখন বর্ষাকালে ভয়াবহ বন্যার রূপ নেয়, তখন সবকিছু ধ্বংস করে দেয়। আবার খরা মরসুমে সেই নদীই শুকিয়ে হাহাকার তৈরি করে। নদীর এই রূপকে নিয়ন্ত্রণ করে কীভাবে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা যায়, সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নিয়েছে 'বহুমুখী নদী উপত্যকা প্রকল্প' বা Multipurpose River Valley Project। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু এই বাঁধগুলোকে বলেছিলেন 'আধুনিক ভারতের মন্দির' । কিন্তু কেন একে 'বহুমুখী' বলা হয়? একটা বাঁধ কি শুধুই জল আটকে রাখে, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও অনেক রহস্য? আজকের এই ব্লগে আমরা অত্যন্ত সহজ ভাষায় জানব এই বহুমুখী নদী প্রকল্পের খুঁটিনাটি, এর সুবিধা, অসুবিধা এবং ভারতের কিছু বিখ্যাত বাঁধের গল্প। চলুন শুরু করা যাক সবার আগে বোঝা দরকার, একে আমরা 'বহুমুখী' কেন বলছি। সাধারণ একটি বাঁধ হয়তো শুধু বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য তৈরি হতে পারে। কিন্তু যখন কোনো একটি নির্দিষ্ট নদীকে কেন্দ্র কর...

ব্রিটিশ ভারত ও জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (১৮৫১)।

ছবি
নমস্কার। আজ আমরা ইতিহাসের এমন একটি অধ্যায়ে ফিরে যাব যা ভারতের মাটির নিচের রহস্য উন্মোচন করেছিল। আজ আমরা কথা বলব জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (GSI)-এর প্রতিষ্ঠা এবং এর পেছনের ব্রিটিশ উপনিবেশিক স্বার্থ ও বৈজ্ঞানিক অভিযান নিয়ে। সালটা ১৮৫১ আজ থেকে পৌনে দুইশত বছর আগে, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতের বুকে এমন এক প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়, যা আজ বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ভূবৈজ্ঞানিক সংস্থা। কিন্তু কেন তারা এটা করেছিল? শুধু বিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা থেকে? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে ছিল অন্য কোনো বড় উদ্দেশ্য? ১৮ শতকের শেষের দিকে এবং ১৯ শতকের শুরুতে ব্রিটেনে তখন শিল্প বিপ্লব বা Industrial Revolution তুঙ্গে। আর এই শিল্প বিপ্লবের চাকা সচল রাখতে সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটার প্রয়োজন ছিল, তা হলো কয়লা (Coal)। ইংল্যান্ডের বুক চিরে তখন তৈরি হচ্ছে রেললাইন, চাকা ঘুরছে স্টিম ইঞ্জিনের। আর এই বিপুল পরিমাণ কয়লার সন্ধানেই ব্রিটিশদের নজর পড়ে তাদের সবচেয়ে বড় উপনিবেশ—ভারতের ওপর। ভারতে কয়লা অনুসন্ধানের কাজ অবশ্য ১৮৫১ সালের আগেই শুরু হয়েছিল। ১৮৩৬ সালে ব্রিটিশ সরকার একটি ‘কোল কমিটি’ বা কয়লা কমিটি গঠন করে। কিন্তু এল...

​দ্য গ্রেট ত্রিকোণমিতিক জরিপ: উপমহাদেশের মানচিত্রায়নের মহাকাব্য।

ছবি
নমস্কার। আজ থেকে প্রায় দুশো বছর আগে, যখন স্যাটেলাইট ছিল না, গুগল ম্যাপ ছিল না, এমনকি নিখুঁতভাবে দূরত্ব মাপার মতো আধুনিক কোনো যন্ত্রও ছিল না—তখন একদল মানুষ একটি অবিশ্বাস্য স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁরা চেয়েছিলেন সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশকে ইঞ্চি ইঞ্চি করে মেপে তার একটি নিখুঁত মানচিত্র তৈরি করতে। বিজ্ঞান, অদম্য ইচ্ছা আর চরম আত্মত্যাগের সেই মহাকাব্যিক অভিযানের নাম—The Great Trigonometrical Survey বা মহতী ত্রিকোণমিতিক জরিপ। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতের বিশাল ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ পায়। কিন্তু শাসন করতে গেলে, রাজস্ব আদায় করতে গেলে আর সামরিক আধিপত্য বজায় রাখতে গেলে সবার আগে যা প্রয়োজন, তা হলো একটি নিখুঁত মানচিত্র। তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলি বুঝতে পেরেছিলেন, তরবারি দিয়ে দেশ জয় করা গেলেও, বিজ্ঞান ছাড়া তা ধরে রাখা অসম্ভব। আর এই চিন্তা থেকেই ১৮০২ সালের ১০ এপ্রিল, মাদরাসের (বর্তমান চেন্নাই) সেন্ট থমাস মাউন্ট থেকে শুরু হয় মানব ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ এবং নিখুঁত বৈজ্ঞানিক অভিযান। এই বিশাল যজ্ঞের মূল পরিকল্পনাকারী এবং প্রথম পরিচালক ছিলেন একজন ব্র...

১৮৪৭: ভারতের প্রথম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং ব্রিটিশদের আসল উদ্দেশ্য।

ছবি
নমস্কার বন্ধুরা। আজ আমরা সময়ের চাকা ঘুরিয়ে চলে যাব পৌনে দুইশত বছর পেছনে—১৮৪৭ সালে। আজ আমরা এমন এক প্রতিষ্ঠানের গল্প বলব, যা ভারতের আধুনিক প্রকৌশল বা ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার মেরুদণ্ড গড়ে দিয়েছিল। হ্যাঁ, আমি কথা বলছি আইআইটি রুরকি (IIT Roorkee)-র ব্যাপারে। তবে ১৮৪৭ সালে যখন এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, তখন এর নাম আইআইটি ছিল না। এর নাম ছিল টমাসন কলেজ অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং (Thomason College of Civil Engineering)। এটি কেবল ভারতের নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, ব্রিটিশরা, যারা এ দেশে এসেছিল ব্যবসা করতে এবং পরবর্তীতে শাসন করতে, তারা কেন হঠাৎ করে ভারতে এত বড় একটা টেকনিক্যাল কলেজ তৈরি করতে গেল? তাদের উদ্দেশ্য কি শুধুই ভারতীয়দের শিক্ষিত করা ছিল, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে ছিল কোনো বিশাল সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ এবং মাস্টারপ্ল্যান? আজ আমরা এই ব্লগ ওপোস্টে এই রোমাঞ্চকর ইতিহাস বিস্তারিত আলোচনা করবো। ১৮৪৭ সালের এই প্রজেক্টটি বুঝতে হলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। ১৮৩০ এবং ১৮৪০-এর দশকে উত্তর ভারতে, বিশেষ করে বর্তমান উত্তরপ্রদেশ অঞ্চলে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ...

১৮৫৭ সালের বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও ভারতের উচ্চশিক্ষা স্থাপনা।

ছবি
নমস্কার বন্ধুরা। ১৮৫৭ সাল— এই বছরটির কথা শুনলেই আমাদের মাথায় প্রথমে কী আসে? নিশ্চিতভাবেই মহাবিদ্রোহ বা সিপাহী বিদ্রোহের কথা। মঙ্গল পাণ্ডে, ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ আর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে ভারতীয় সিপাহীদের গর্জে ওঠার ইতিহাস। কিন্তু আপনারা কি জানেন, ঠিক এই একই বছরে, যখন পুরো দেশ বারুদের গন্ধে ফুটছে, তখন পর্দার আড়ালে ভারতের মাটিতে এমন একটি নীরব বিপ্লব ঘটে গিয়েছিল, যা আগামী ১০০ বছরের ভারতের ভাগ্য বদলে দিয়েছিল। হ্যাঁ, আমি ১৮৫৭ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ভারতের বুকে তিনটি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা বলছি— কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, বোম্বাই বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়। আজকের ভিডিওতে আমরা ইতিহাসের সেই পাতায় ফিরে যাব। আমরা জানবো কেন ব্রিটিশরা হঠাৎ ভারতে উচ্চশিক্ষার বিস্তারে এত আগ্রহী হয়ে উঠল। এর পেছনে তাদের আসল উদ্দেশ্য কী ছিল? এবং কীভাবে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আজকের আধুনিক ভারতের বুদ্ধিজীবী সমাজ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের মেরুদণ্ড তৈরি করেছিল। পুরো গল্পটা জানতে ব্লগটি শেষ পর্যন্ত অবশ্যই পড়ুন। ১৮৫৭ সালের এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কিন্তু হুট করে...

১৯১১ – নতুন রাজধানী স্থাপনের মহাকাব্যিক ইতিহাস।

ছবি
নমস্কার বন্ধুরা। আজ থেকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে, ১৯১১ সালের ১২ই ডিসেম্বর। দিল্লির তীব্র শীতের সকালে একটি ঘোষণা পুরো ভারতীয় উপমহাদেশের ভাগ্য এবং ভূগোল চিরতরে বদলে দিয়েছিল। এমন একটি সিদ্ধান্ত যা তৎকালীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় গোপন বিষয়গুলোর একটি ছিল। ঘোষণাটি করেছিলেন স্বয়ং ব্রিটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জ। তিনি ঘোষণা করেন—ভারতের রাজধানী আর প্রাসাদ নগরী কলকাতা থাকছে না তা স্থানান্তরিত হচ্ছে প্রাচীন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু দিল্লিতে। ভাবুন তো, যে কলকাতা ছিল দেড়শ বছর ধরে ব্রিটিশ ভারতের প্রাণকেন্দ্র, যে শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল পুরো এশিয়ায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বাণিজ্য ও রাজনীতি এক নিমেষে সেই শহরের মুকুট কেড়ে নেওয়া হলো কিন্তু কেন? কেন ব্রিটিশরা তাদের সাধের কলকাতা ছেড়ে দিল্লির ধুলোবালির মধ্যে নতুন রাজধানী গড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন? আজ আমরা ইতিহাসের সেই রোমাঞ্চকর অধ্যায়ে ডুব দেব। এই রাজধানী পরিবর্তনের নেপথ্যে কোনো রাতারাতি নেওয়া সিদ্ধান্ত ছিল না। এর পেছনে ছিল গভীর রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ভয়। ১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস যখন কলকাতাকে বাংলার তথা ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ঘোষণা করেন, তখন পরিস্...

ব্রিটিশ আমলের আধুনিক সমুদ্র বন্দর ও ভারতের রূপান্তর।

ছবি
নমস্কার। আজ আমরা ফিরে যাব ইতিহাসের এমন এক অধ্যায়ে, যা আধুনিক ভারতের অর্থনীতি, ভূগোল এবং শহরায়নের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল। আমরা যখন আজকের মুম্বাই, কলকাতা বা চেন্নাইয়ের মতো বিশাল মেগাসিটিগুলোর দিকে তাকাই, আমরা কী দেখি। আকাশচুম্বী অট্টালিকা, ব্যস্ত রাস্তা আর কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই শহরগুলোর আজকের এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে শতবর্ষ পুরোনো কিছু সমুদ্র বন্দর। ১৭শ শতাব্দীতে যখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতের মাটিতে পা রাখে, তখন তাদের মূল লক্ষ্য ছিল বাণিজ্য। আর বাণিজ্যের জন্য সবচেয়ে জরুরি কী ছিল? জলপথ। কারণ সেই যুগে মহাসমুদ্রই ছিল পৃথিবীর একমাত্র হাইওয়ে। আজ আমরা আলোচনা করব কীভাবে ব্রিটিশরা ভারতের বুকে আধুনিক সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করেছিল, কীভাবে সেগুলো ভারতের প্রাচীন বাণিজ্যিক মানচিত্রকে বদলে দিয়েছিল এবং এর পেছনে লুকিয়ে থাকা আসল অর্থনীতিটা কী ছিল। ব্রিটিশরা আসার আগেও ভারতে বন্দর ছিল না, এমন নয়। প্রাচীনকাল থেকেই তামিলনাড়ুর পুহার, গুজরাটের সুরাট বা কেরালার কালিকট বন্দর বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র ছিল। রোমান সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে আরব বণিকেরা এখানে...

ব্রিটিশদের তৈরি গোদাবরী ও কৃষ্ণা ডেল্টা সিস্টেম।

ছবি
নমস্কার বন্ধুরা। আজ আমরা ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের এমন এক অঞ্চলের গল্প বলবো, যাকে বলা হয় ভারতের ধানের গোলা বা রাইস বোল অফ ইন্ডিয়া। কিন্তু আপনি কি জানেন, আজ থেকে প্রায় পৌনে দুশো বছর আগে এই সমৃদ্ধ অঞ্চলটি কেমন ছিল? সবুজ ফসলের বদলে সেখানে ছিল শুধুই হাহাকার, খরা এবং একের পর এক দুর্ভিক্ষ। তাহলে কীভাবে একটি চরম অবহেলিত ও খরা পীড়িত অঞ্চল ভারতের অন্যতম উর্বর ভূমিতে পরিণত হলো? এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে উনিশ শতকের এক অবিশ্বাস্য ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ইতিহাস— ব্রিটিশ আমলে তৈরি গোদাবরী ও কৃষ্ণা ডেল্টা সেচ ব্যবস্থা। স্যার আর্থার কটন নামক এক ব্রিটিশ সামরিক প্রকৌশলীর হাত ধরে কীভাবে বদলে গিয়েছিল দক্ষিণ ভারতের ভাগ্য, এবং কেন আজও কোটি কোটি মানুষ তাকে ভগবানের মতো শ্রদ্ধা করেন? আজ আমরা এই ব্লগে বিস্তারিত আলোচনা করব ব্রিটিশদের তৈরি সেই গোদাবরী ও কৃষ্ণা ডেল্টা সিস্টেমের সম্পূর্ণ ইতিহাস ও তাদের দূরদর্শী ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গল্প। ব্লগটি শেষ পর্যন্ত অবশ্যই পড়ুন। "ইতিহাসের পাতায় একটু পেছনে ফেরা যাক। ১৮৩০ এবং ১৮৪০ এর দশকে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত উত্তর সরকার বা বর্তমান অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলীয় জেলাগুলোর অবস্থ...

রক্তের শপথ: ব্রিটিশ ভারত ও থাগি অবসান | দ্য ট্রু স্টোরি অফ থাগস(thuggee)।

ছবি
নমস্কার। আজ আমরা ইতিহাসের এমন এক অন্ধকার গলিতে প্রবেশ করতে যাচ্ছি, যা শুনলে আজও গায়ে কাঁটা দেয়। কল্পনা করুন, আপনি ১৮২০ বা ১৮৩০ সালের ভারতের একজন ব্যবসায়ী। নিজের দলবল, ঘোড়া আর মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে এক শহর থেকে অন্য শহরে যাচ্ছেন। পথ দীর্ঘ এবং বিপজ্জনক। হঠাৎ মাঝপথে আপনাদের সাথে দেখা হয়ে গেল একদল অমায়িক, ভদ্র পথচারীর। তারা আপনারই মতো তীর্থযাত্রী বা ব্যবসায়ী। তারা আপনার সাথে গল্প জুড়ে দিল, আপনার সুখ-দুঃখের ভাগীদার হলো। কয়েকদিন একসাথে চলার পর আপনার মনে হলো, এরা তো পর নয়, পরম বন্ধু! তারপর একদিন সূর্যাস্ত হলো। কোনো এক নির্জন নদীর তীরে বা ঘন জঙ্গলের ধারে আপনারা সবাই মিলে রাতের খাবারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। হঠাৎ সেই বন্ধুদের মধ্য থেকে একজন আকাশে তাকিয়ে অদ্ভুত এক পাখির ডাক ডেকে উঠল— অথবা চিৎকার করে বলে উঠল, "পান আনো!" আর মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল দৃশ্যপট। আপনার সেই পরম বন্ধুরা পকেট থেকে বের করল একটি হলুদ বা কাপড়ের টুকরো। সেকেন্ডের মধ্যে তা পেঁচিয়ে ধরল আপনার এবং আপনার সঙ্গীদের গলায়। কোনো তরবারি চলল না, কোনো পিস্তলের আওয়াজ হলো না। মাত্র কয়েক মিনিটে নিঃশব্দে শেষ হয়ে গেল পুরো একটি দ...

মানিকতলা ও মুরারিপুকুর বোমা মামলা।

ছবি
উপস্থিত শ্রদ্ধেয় মণ্ডলী এবং আমার প্রিয় দেশবাসী, আজ থেকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে, এই বাংলার আকাশ-বাতাস এক অদ্ভুত গুমোট অন্ধকারে ঢেকে গিয়েছিল। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ এদেশের মানুষের বুকে যে ক্ষত তৈরি করেছিল, তা কেবল ক্ষোভের আগুন জ্বালায়নি, জন্ম দিয়েছিল এক নতুন যুগের—অগ্নিযুগ। আজ আমি আপনাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাব ১৯০৮ সালের মে মাসের এক কালজয়ী ইতিহাসে। যে ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু ছিল কলকাতার এক বাগানবাড়ি—মুরারিপুকুর বাগানবাড়ি, আর যে মামলাটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল, তার নাম মানিকতলা বা মুরারিপুকুর বোমা মামলা। তখনকার দিনে একটা কথা প্রচলিত ছিল—"ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যায় না।" কিন্তু বাংলার একদল তরুণ, যাঁদের চোখে ছিল স্বাধীনতার স্বপ্ন আর বুকে ছিল মৃত্যুকে জয় করার অদম্য সাহস, তাঁরা ঘোষণা করলেন—ঐ অন্যায়ের সূর্যকে আমরা রক্তিম সন্ধ্যায় ডুবিয়ে দেব। তাঁরা অহিংসার দীর্ঘ পথ ছেড়ে, 'চোখের বদলে চোখ' এবং 'রক্তের বদলে রক্ত' নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন। প্রশ্ন জাগতে পারে, কেন এই সশস্ত্র বিপ্লবের প্রয়োজন হলো? ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন যখন বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত ...