ব্রিটিশ ভারত ও জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (১৮৫১)।

নমস্কার। আজ আমরা ইতিহাসের এমন একটি অধ্যায়ে ফিরে যাব যা ভারতের মাটির নিচের রহস্য উন্মোচন করেছিল। আজ আমরা কথা বলব জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (GSI)-এর প্রতিষ্ঠা এবং এর পেছনের ব্রিটিশ উপনিবেশিক স্বার্থ ও বৈজ্ঞানিক অভিযান নিয়ে।
সালটা ১৮৫১ আজ থেকে পৌনে দুইশত বছর আগে, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতের বুকে এমন এক প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়, যা আজ বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ভূবৈজ্ঞানিক সংস্থা। কিন্তু কেন তারা এটা করেছিল? শুধু বিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা থেকে? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে ছিল অন্য কোনো বড় উদ্দেশ্য?
১৮ শতকের শেষের দিকে এবং ১৯ শতকের শুরুতে ব্রিটেনে তখন শিল্প বিপ্লব বা Industrial Revolution তুঙ্গে। আর এই শিল্প বিপ্লবের চাকা সচল রাখতে সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটার প্রয়োজন ছিল, তা হলো কয়লা (Coal)। ইংল্যান্ডের বুক চিরে তখন তৈরি হচ্ছে রেললাইন, চাকা ঘুরছে স্টিম ইঞ্জিনের। আর এই বিপুল পরিমাণ কয়লার সন্ধানেই ব্রিটিশদের নজর পড়ে তাদের সবচেয়ে বড় উপনিবেশ—ভারতের ওপর।

ভারতে কয়লা অনুসন্ধানের কাজ অবশ্য ১৮৫১ সালের আগেই শুরু হয়েছিল। ১৮৩৬ সালে ব্রিটিশ সরকার একটি ‘কোল কমিটি’ বা কয়লা কমিটি গঠন করে। কিন্তু এলোমেলো অনুসন্ধানে কাজ হচ্ছিল না। তাদের প্রয়োজন ছিল একজন দক্ষ দূরদর্শী মানুষের, যিনি পদ্ধতিগতভাবে মাটির নিচের সম্পদ খুঁজে বের করতে পারবেন।
অবশেষে ১৮৫১ সালের ৪ মার্চ, কোলকাতার একটি ছোট ভাড়া বাড়িতে যাত্রা শুরু হলো জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া-র। আর এই সংস্থার প্রথম সুপারিন্টেন্ডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হলো আয়ারল্যান্ডের একজন তরুণ এবং অত্যন্ত মেধাবী ভূতত্ত্ববিদকে—যার নাম টমাস ওল্ডহাম (Thomas Oldham)।
টমাস ওল্ডহাম যখন দায়িত্ব নেন, তখন তাঁর হাতে কোনো বড় টিম ছিল না। না ছিল উন্নত প্রযুক্তি, না ছিল যাতায়াতের ভালো ব্যবস্থা। ছিল শুধু ভারতের দুর্গম জঙ্গল, ম্যালেরিয়ার ভয় আর এক বুক বৈজ্ঞানিক জেদ। ওল্ডহাম সাহেব বুঝতে পেরেছিলেন, শুধু কয়লা খুঁজলে হবে না, ভারতের মাটির একটি সম্পূর্ণ ভূতাত্ত্বিক মানচিত্র বা Geological Map তৈরি করতে হবে।

একবার ভাবুন তো, ১৮৫০-এর দশকের ভারতের কথা। কোনো পাকা রাস্তা নেই, জিপিএস নেই, উপগ্রহের ছবি নেই। ওল্ডহাম এবং তাঁর সহযোগীরা কীভাবে কাজ করতেন?
তাঁরা মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে, ঘোড়ায় চড়ে কিংবা হাতির পিঠে চেপে ভারতের দুর্গম অঞ্চলে যেতেন। তাঁদের সাথে থাকত ভারী হাতুড়ি, কম্পাস এবং পাথর কাটার যন্ত্রপাতি। বর্ষাকালে জঙ্গলগুলোতে ম্যালেরিয়া এবং কলেরার প্রকোপ থাকত মারাত্মক। বহু তরুণ ব্রিটিশ ভূতত্ত্ববিদ এই সমীক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।
কিন্তু এই চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও GSI-এর বিজ্ঞানীরা ভারতের মাটির স্তরবিন্যাস বা Stratigraphy বুঝতে শুরু করেন। তাঁরা দামোদর উপত্যকা, রানীগঞ্জ এবং রাজমহল পাহাড়ের কয়লা ক্ষেত্রগুলোর নিখুঁত মানচিত্র তৈরি করেন। এই আবিষ্কারগুলোই কিন্তু পরবর্তীতে ভারতের রেলওয়ে নেটওয়ার্কের মূল জ্বালানির জোগান দিয়েছিল।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের বুঝতে হবে। ব্রিটিশরা কিন্তু এই বিপুল অর্থ এবং শ্রম ভারতের উন্নয়নের জন্য খরচ করেনি। এর পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল উপনিবেশিক অর্থনীতি।
প্রথমত, ভারতের কয়লা ব্যবহার করে ব্রিটিশ জাহাজ এবং রেল চালানো, যাতে ব্রিটেন থেকে কয়লা আমদানির খরচ বেঁচে যায়।
দ্বিতীয়ত, কয়লার পাশাপাশি লোহা, তামা এবং অন্যান্য মূল্যবান খনিজ খুঁজে বের করা যা ব্রিটিশ শিল্পকারখানার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
সুতরাং GSI একদিকে যেমন ছিল একটি বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান অন্যদিকে এটি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করার একটি বড় হাতিয়ার। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় "Colonial Science" বা উপনিবেশিক বিজ্ঞান। তবে উদ্দেশ্য যা-ই হোক না কেন এর ফলে ভারতের ভূপ্রকৃতির যে বৈজ্ঞানিক নথিপত্র তৈরি হয়েছিল তা ছিল অতুলনীয়।

শুধুমাত্র অর্থনৈতিক খনিজ খোঁজার মধ্যেই কিন্তু ১৮৫১ সালের এই সার্ভে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিজ্ঞানের জগতে GSI এমন কিছু আবিষ্কার করেছিল যা গোটা পৃথিবীর ভূতত্ত্বের ইতিহাস বদলে দেয়।
 গন্ডোয়ানা তত্ত্ব (Gondwana Sequence): GSI-এর বিজ্ঞানীরা ভারতের মধ্যপ্রদেশের গন্ড উপজাতির নামানুসারে এক বিশেষ শিলাস্তরের নামকরণ করেন 'গন্ডোয়ানা'। পরবর্তীতে দেখা যায়, এই একই ধরণের শিলা ও জীবাশ্ম দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং অ্যান্টার্কটিকাতেও রয়েছে। এই আবিষ্কারটিই পরবর্তীতে প্রমাণ করে যে কোটি কোটি বছর আগে এই সমস্ত মহাদেশ একসাথে যুক্ত ছিল যাকে আমরা আজ 'প্যানজিয়া' বা 'গন্ডোয়ানাল্যান্ড' বলি।
 জীবাশ্ম বিজ্ঞান বা Paleontology: ভারতের মাটিতে যে একসময় বিশাল বিশাল ডাইনোসর ঘুরে বেড়াত, তা GSI-এর করা খননকার্যের ফলেই জানা যায়। জবলপুরের কাছ থেকে তারা বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ডাইনোসরের জীবাশ্ম আবিষ্কার করে।
 ভূমিকম্প ও হিমালয় গবেষণা: হিমালয় পর্বতমালা কীভাবে তৈরি হলো, তার টেকটোনিক মুভমেন্ট এবং ভারতের বড় বড় ভূমিকম্পের (যেমন ১৮৯৭ সালের আসামের ভূমিকম্প) প্রথম বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করেছিল এই সংস্থাই।

১৮৫১ সালে মাত্র কয়েকজন মানুষ নিয়ে যে যাত্রার শুরু হয়েছিল, তা আজ একটি বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া সম্পূর্ণ ভারতীয় বিজ্ঞানীদের নিয়ন্ত্রণে আসে। আজ স্বাধীন ভারতের পরিকাঠামো উন্নয়ন খনিজ সম্পদ রক্ষা, ভূগর্ভস্থ জলের সন্ধান এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় GSI এক অপরিহার্য ভূমিকা পালন করছে।
ব্রিটিশরা হয়তো তাদের নিজেদের স্বার্থে এই সংস্থাটি তৈরি করেছিল কিন্তু টমাস ওল্ডহাম এবং তাঁর উত্তরসূরি বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও সততাকে অস্বীকার করা যায় না। তাঁদের ঘাম এবং রক্তের বিনিময়েই আজ আমরা জানতে পেরেছি আমাদের এই রত্নগর্ভা ভারতের মাটির আসল শক্তি ও সম্পদকে।
১৮৫১ সালের সেই জিওলজিক্যাল সার্ভে শুধু ইতিহাসের একটি পাতা নয়, এটি হলো ভারতের আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তিপাথর।
আজকের এই ব্লগ টি আপনাদের কেমন লাগলো, কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। ইতিহাসের এমন আরও অজানা গল্প পড়তে আমাদের ফলো করতে ভুলবেন না। দেখা হবে পরের পোস্টে। ধন্যবাদ।

মন্তব্যসমূহ