ব্রিটিশ আমলের আধুনিক সমুদ্র বন্দর ও ভারতের রূপান্তর।

নমস্কার। আজ আমরা ফিরে যাব ইতিহাসের এমন এক অধ্যায়ে, যা আধুনিক ভারতের অর্থনীতি, ভূগোল এবং শহরায়নের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল। আমরা যখন আজকের মুম্বাই, কলকাতা বা চেন্নাইয়ের মতো বিশাল মেগাসিটিগুলোর দিকে তাকাই, আমরা কী দেখি। আকাশচুম্বী অট্টালিকা, ব্যস্ত রাস্তা আর কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই শহরগুলোর আজকের এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে শতবর্ষ পুরোনো কিছু সমুদ্র বন্দর।
১৭শ শতাব্দীতে যখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতের মাটিতে পা রাখে, তখন তাদের মূল লক্ষ্য ছিল বাণিজ্য। আর বাণিজ্যের জন্য সবচেয়ে জরুরি কী ছিল? জলপথ। কারণ সেই যুগে মহাসমুদ্রই ছিল পৃথিবীর একমাত্র হাইওয়ে। আজ আমরা আলোচনা করব কীভাবে ব্রিটিশরা ভারতের বুকে আধুনিক সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করেছিল, কীভাবে সেগুলো ভারতের প্রাচীন বাণিজ্যিক মানচিত্রকে বদলে দিয়েছিল এবং এর পেছনে লুকিয়ে থাকা আসল অর্থনীতিটা কী ছিল।

ব্রিটিশরা আসার আগেও ভারতে বন্দর ছিল না, এমন নয়। প্রাচীনকাল থেকেই তামিলনাড়ুর পুহার, গুজরাটের সুরাট বা কেরালার কালিকট বন্দর বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র ছিল। রোমান সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে আরব বণিকেরা এখানে আসতেন মশলা, মসলিন আর সিল্কের সন্ধানে।
কিন্তু প্রাচীন ভারতীয় বন্দরগুলো ছিল মূলত প্রাকৃতিক আশ্রয়স্থল বা নদীভিত্তিক বন্দর। আধুনিক যুগের বিশাল বাষ্পচালিত জাহাজ বা ভারী পণ্য বহনের উপযোগী পরিকাঠামো সেখানে ছিল না।
ব্রিটিশরা যখন ভারতের শাসনভার নিজেদের হাতে নিতে শুরু করল, বিশেষ করে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর যখন শাসনভার সরাসরি ব্রিটিশ ক্রাউনের অধীনে চলে গেল, তখন তাদের প্রয়োজন হলো এমন কিছু বন্দর—
যা সারা বছর, সব ঋতুতে সচল থাকবে ।
যেখানে বিশাল গভীর সমুদ্রের জাহাজ অনায়াসে নোঙর করতে পারবে।
এবং সবচেয়ে বড় কথা, যা দিয়ে ভারতের ভেতর থেকে কাঁচামাল দ্রুত ব্রিটেনে পাঠানো যাবে এবং ব্রিটেনের কারখানায় তৈরি পণ্য ভারতের বাজারে আনা যাবে।
এই উদ্দেশ্য থেকেই জন্ম নিল আধুনিক প্রেসিডেন্সি পোর্টস—ক্যালকাটা, বোম্বে এবং মাদ্রাজ।

আসুন প্রথমে কথা বলি কলকাতা বন্দর বা 'ক্যালকাটা পোর্ট' নিয়ে। ১৬৯০ সালে জব চার্নক যখন সুতানুটি, গোবিন্দপুর ও কলকাতা—এই তিন গ্রাম নিয়ে ঘাঁটি গাড়লেন, তার প্রধান কারণই ছিল হুগলি নদী। কলকাতা ছিল ব্রিটিশ ভারতের প্রথম রাজধানী এবং এই বন্দরটি ছিল তাদের সাম্রাজ্যের মুকুট।
১৮৭০ সালে কমিশনার্স ফর দ্য পোর্ট অফ ক্যালকাটা গঠিত হয়। এটিই ছিল ভারতের প্রথম সংবিধিবদ্ধ বন্দর কর্তৃপক্ষ। কলকাতা বন্দর কিন্তু সমুদ্রের তীরে অবস্থিত নয়, এটি একটি নদী বন্দর যা সমুদ্র থেকে প্রায় ১২৩ কিলোমিটার ভেতরে।
ব্রিটিশরা কেন একে আধুনিক করল?
কারণ বাংলা, বিহার এবং আসাম ছিল সম্পদে ভরপুর। আসামের চা, বিহারের নীল আর বাংলার পাট—এই তিনটি পণ্যের বিশ্বজুড়ে বিশাল চাহিদা ছিল। ব্রিটিশরা খিদিরপুর ডক এবং নেতাজি সুভাষ ডক (যা আগে কিং জর্জ ডক নামে পরিচিত ছিল) নির্মাণ করে। এই ডকগুলোতে এমন আধুনিক হাইড্রোলিক ক্রেন এবং রেলওয়ে নেটওয়ার্ক বসানো হয়েছিল, যা তৎকালে এশিয়ার অন্য কোথাও ছিল না।
কলকাতা বন্দর দিয়ে শুধু ব্যবসাই হতো না, এই বন্দর দিয়েই ব্রিটিশরা ভারতের পূর্ব সীমান্ত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নিজেদের সামরিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ করত। এটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই গেটওয়ে অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়া।
এবার আমাদের নজর ঘোরানো যাক পশ্চিম উপকূলে—কিংবদন্তি 'বোম্বে পোর্ট' বা আজকের মুম্বাই বন্দর। ১৬৬১ সালে পর্তুগিজরা ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লসকে যৌতুক হিসেবে এই বোম্বে দ্বীপপুঞ্জ উপহার দিয়েছিল। ব্রিটিশরা দ্রুত বুঝতে পেরেছিল, বোম্বের মতো গভীর এবং সুরক্ষিত প্রাকৃতিক পোতাশ্রয় পুরো ভারত মহাসাগরে আর একটাও নেই।
কিন্তু বোম্বে বন্দরের ভাগ্য পুরোপুরি বদলে গেল ১৮৬৯ সালে। কেন বলুন তো? কারণ এই বছরেই উন্মোচন হলো সুয়েজ খাল (Suez Canal)।
সুয়েজ খাল খোলার ফলে ইউরোপ থেকে ভারতের সামুদ্রিক দূরত্ব এক ধাক্কায় প্রায় ৭,০০০ কিলোমিটার কমে গেল। আর ইউরোপ থেকে আসা জাহাজের জন্য ভারতের প্রথম স্টপ ছিল বোম্বে।
১৮৭৩ সালে গঠিত হলো 'বোম্বে পোর্ট ট্রাস্ট'। ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়াররা তৈরি করলেন প্রিন্সেস ডক এবং মেরিডিয়ান ডক। তুলা বা কটনের ব্যবসার জন্য বোম্বে হয়ে উঠল বিশ্বের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় যখন ব্রিটেনে তুলার জোগান বন্ধ হয়ে যায়, তখন এই বোম্বে বন্দর দিয়েই ভারতের ডেকান বা দাক্ষিণাত্যের তুলা ল্যাঙ্কাশায়ারের টেক্সটাইল মিলে পাঠানো হতো। বোম্বে হয়ে উঠল ভারতের অর্থনৈতিক রাজধানী, যার প্রাণকেন্দ্র ছিল এই আধুনিক সমুদ্র বন্দর।

এবার চলুন দক্ষিণে, মাদ্রাজ বা আজকের চেন্নাই বন্দরে। কলকাতা এবং বোম্বের মতো মাদ্রাজের ভাগ্য অতটা সুপ্রসন্ন ছিল না। মাদ্রাজের উপকূল ছিল একদম খোলা এবং সেখানে প্রায়ই মারাত্মক ঘূর্ণিঝড় হতো। কোনো প্রাকৃতিক খাঁড়ি বা নদী ছিল না যেখানে জাহাজ নিরাপদে দাঁড়াতে পারে। প্রথম দিকে জাহাজগুলো উপকূল থেকে অনেক দূরে সাগরে দাঁড়িয়ে থাকত এবং ছোট নৌকায় করে পণ্য পাড়ে আনা হতো। এতে প্রচুর পণ্য নষ্ট হতো।
কিন্তু ব্রিটিশদের দক্ষিণ ভারতের চামড়া, টেক্সটাইল এবং খনিজ পণ্য রপ্তানি করার জন্য একটি আধুনিক বন্দরের প্রয়োজন ছিল। তাই ১৮৭০-এর দশকে ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়াররা এক অভাবনীয় চ্যালেঞ্জ নিলেন। তারা সমুদ্রের বুকে কংক্রিটের বিশাল দেওয়াল বা ব্রেকওয়াটার তৈরি করে একটি সম্পূর্ণ কৃত্রিম বন্দর তৈরি করলেন।
১৮৮১ সালে মাদ্রাজ বন্দরের আধুনিক রূপ উন্মোচিত হয়। এটি ছিল তৎকালীন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক বিস্ময়। প্রকৃতির প্রতিকূলতাকে জয় করে ব্রিটিশরা দক্ষিণ ভারতের অর্থনীতির চাবিকাঠি নিজেদের হাতে নিয়ে নিয়েছিল এই বন্দরের মাধ্যমে।
বন্ধুরা, এতক্ষণ আমরা যে আধুনিক পরিকাঠামো, ডকইয়ার্ড আর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কথা বললাম—তার একটা অন্য দিকও ছিল। আমাদের বুঝতে হবে, ব্রিটিশরা এই আধুনিক সমুদ্র বন্দরগুলো কিন্তু ভারতের উপকারের জন্য তৈরি করেনি। এর পেছনে ছিল নিখাদ ঔপনিবেশিক অর্থনীতি বা ড্রেন অফ ওয়েলথ  তত্ত্ব।
এই বন্দরগুলোর সঙ্গে ভারতের ভেতরের অংশকে যুক্ত করতে তৈরি করা হয়েছিল রেলওয়ে নেটওয়ার্ক। রেলওয়ে দিয়ে কাঁচামাল আসত বন্দরে, আর বন্দর থেকে জাহাজে করে তা চলে যেত ইংল্যান্ডে।
কলকাতা দিয়ে গেল পাট আর চা।
বোম্বে দিয়ে গেল তুলা।
মাদ্রাজ দিয়ে গেল চামড়া ও খনিজ।
এর ফলে ভারতের কুটির শিল্প ধ্বংস হয়ে গেল। কারণ, ওই বন্দরগুলো দিয়েই আবার ব্রিটেনের সস্তা, মিলে তৈরি কাপড় ভারতের বাজারে প্রবেশ করল। অর্থাৎ, এই আধুনিক বন্দরগুলো ছিল শোষণের পাইপলাইনের শেষ প্রান্ত।
তবে, মুদ্রার অন্য পিঠও আছে। এই বন্দরগুলোকে কেন্দ্র করেই ভারতে আধুনিক ব্যাংকিং, ইন্স্যুরেন্স, কাস্টমস ব্যবস্থা এবং আধুনিক শ্রমবাজারের সৃষ্টি হয়। ডকইয়ার্ডে কাজ করার জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছিল, যা ভারতের আধুনিক শ্রমিক শ্রেণীর জন্ম দেয়।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা যখন ভারত ছেড়ে চলে যায়, তারা আমাদের দিয়ে গিয়েছিল এক বিশাল ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো। স্বাধীন ভারত এই বন্দরগুলোকে শুধু ধরে রাখেনি, বরং সেগুলোকে আরও আধুনিক করেছে।
আজকের কলকাতা বন্দর (যার নাম এখন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী বন্দর), মুম্বাই বন্দর বা চেন্নাই বন্দর—সবই সেই ব্রিটিশ আমলের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আজ বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আজ আমরা 'সাগরমাল্লা' প্রকল্পের মাধ্যমে আমাদের বন্দরগুলোকে আরও উন্নত করছি, কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে আধুনিক সমুদ্র ব্যবস্থাপনার যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ বা 'পোর্ট ট্রাস্ট' সংস্কৃতি তার সূচনা হয়েছিল আজ থেকে দেড়শো বছর আগে ব্রিটিশদের হাত ধরেই।
ইতিহাসের এই চাকা আজ আমাদের এক নতুন ভারতের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যে বন্দরগুলো একসময় সম্পদ লুঠের পথ ছিল, আজ সেই বন্দরগুলোই ভারতের আত্মনির্ভরতা এবং বিশ্বমঞ্চে অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার প্রধান হাতিয়ার।
আজকের এই আলোচনা আপনাদের কেমন লাগল। ব্রিটিশদের এই বন্দর নির্মাণকে আপনারা ভারতের আধুনিকীকরণের আশীর্বাদ হিসেবে দেখেন, নাকি শোষণের হাতিয়ার হিসেবে? কমেন্ট সেকশনে আপনাদের মতামত অবশ্যই জানাবেন।
ব্লগ টি ভালো লাগলে শেয়ার করতে ভুলবেন না। দেখা হবে পরের পোস্টে। ধন্যবাদ, জয় হিন্দ।

মন্তব্যসমূহ