১৮৫৭ সালের বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও ভারতের উচ্চশিক্ষা স্থাপনা।

নমস্কার বন্ধুরা। ১৮৫৭ সাল— এই বছরটির কথা শুনলেই আমাদের মাথায় প্রথমে কী আসে? নিশ্চিতভাবেই মহাবিদ্রোহ বা সিপাহী বিদ্রোহের কথা। মঙ্গল পাণ্ডে, ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ আর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে ভারতীয় সিপাহীদের গর্জে ওঠার ইতিহাস।
কিন্তু আপনারা কি জানেন, ঠিক এই একই বছরে, যখন পুরো দেশ বারুদের গন্ধে ফুটছে, তখন পর্দার আড়ালে ভারতের মাটিতে এমন একটি নীরব বিপ্লব ঘটে গিয়েছিল, যা আগামী ১০০ বছরের ভারতের ভাগ্য বদলে দিয়েছিল। হ্যাঁ, আমি ১৮৫৭ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ভারতের বুকে তিনটি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা বলছি— কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, বোম্বাই বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়।
আজকের ভিডিওতে আমরা ইতিহাসের সেই পাতায় ফিরে যাব। আমরা জানবো কেন ব্রিটিশরা হঠাৎ ভারতে উচ্চশিক্ষার বিস্তারে এত আগ্রহী হয়ে উঠল। এর পেছনে তাদের আসল উদ্দেশ্য কী ছিল? এবং কীভাবে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আজকের আধুনিক ভারতের বুদ্ধিজীবী সমাজ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের মেরুদণ্ড তৈরি করেছিল। পুরো গল্পটা জানতে ব্লগটি শেষ পর্যন্ত অবশ্যই পড়ুন।

১৮৫৭ সালের এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কিন্তু হুট করে একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট নীল নকশা ছিল। আমাদের একটু পিছিয়ে যেতে হবে ১৮৫৪ সালে। তৎকালীন 'বোর্ড অব কন্ট্রোল'-এর সভাপতি স্যার চার্লস উড ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসিকে একটি নির্দেশনামা পাঠান। ইতিহাসে একে বলা হয় "উডের ডেসপ্যাচ" । একে ভারতের ইংরেজি শিক্ষার "ম্যাগনা কার্টা" বা মহামতি সনদও বলা হয়ে থাকে।
চার্লস উড তাঁর রিপোর্টে সুপারিশ করেছিলেন যে, ভারতে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত একটি সুশৃঙ্খল কাঠামো তৈরি করা দরকার। আর এই কাঠামোর চূড়ায় থাকবে বিশ্ববিদ্যালয়। তিনি পরামর্শ দেন, ব্রিটেনের 'লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়'-এর আদলে ভারতের প্রধান তিনটি প্রেসিডেন্সি শহর— কলকাতা, বোম্বাই এবং মাদ্রাজে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হোক।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ব্রিটিশরা কেন ভারতীয়দের উচ্চশিক্ষিত করতে চাইল? তারা কি আমাদের ভালো চেয়েছিল?

এখানেই লুকিয়ে আছে আসল মোড়। এর পেছনে ব্রিটিশদের দুটি মূল উদ্দেশ্য ছিল:
প্রথমত, বিশাল ভারত সাম্রাজ্য চালানোর জন্য ব্রিটিশ সরকারের প্রচুর কেরানি এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তার প্রয়োজন ছিল। ব্রিটেন থেকে এত মানুষ আনা অসম্ভব এবং ব্যয়বহুল। তাই তারা এমন একদল ভারতীয় তৈরি করতে চেয়েছিল যারা দেখতে ভারতীয় হলেও, চিন্তাভাবনা ও শিক্ষায় হবে ব্রিটিশ। লর্ড মেকলের ভাষায়: "A class of persons, Indian in blood and colour, but English in taste, in opinions, in morals, and in intellect."
দ্বিতীয়ত, ব্রিটিশ সংস্কৃতির প্রতি অনুগত একটি উচ্চবিত্ত সমাজ তৈরি করা, যারা ব্রিটিশ শাসনকে ভারতের জন্য আশীর্বাদ মনে করবে।

এবার আসা যাক ১৮৫৭ সালের মূল ঘটনায়। ১৮৫৭ সালের ২৪শে জানুয়ারি ‘ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট’ পাস হয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। এর ঠিক কয়েক মাস পর ১৮ই জুলাই বোম্বাই বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৫ই সেপ্টেম্বর মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস হয়।
ভাবুন একবার। একদিকে মিরাট, দিল্লি, কানপুরে ব্রিটিশদের দিকে কামান দাগা হচ্ছে, লর্ড ক্যানিং চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারছেন না যে ভারতে ব্রিটিশ শাসন টিকবে কি না— আর ঠিক সেই সময়েই ব্রিটিশ আমলারা বসে বসে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস এবং আইন তৈরি করছেন। এটা সত্যিই এক অদ্ভুত ঐতিহাসিক বৈপরীত্য।
এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শুরুর দিকের কিছু মজার তথ্য আপনাদের জানাই:
এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কিন্তু শুরুতে আজকের মতো বড় বড় ক্যাম্পাস বা ক্লাসরুম নিয়ে গড়ে ওঠেনি। এগুলো ছিল মূলত অ্যাফিলিয়েটিং বা পরীক্ষামূলক বিশ্ববিদ্যালয় (Affiliating Universities)। অর্থাৎ, এদের কাজ ছিল শুধু পরীক্ষা নেওয়া, সিলেবাস তৈরি করা আর ডিগ্রি দেওয়া। কলেজগুলো আলাদা ছিল, যেমন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ বা বোম্বাইয়ের এলফিনস্টোন কলেজ।
শুরুতে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চ্যান্সেলর বা আচার্য হতেন স্বয়ং ভারতের গভর্নর জেনারেল বা প্রদেশের গভর্নররা।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম আধুনিক বহুমুখী বিশ্ববিদ্যালয় হলো এই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। এর প্রথম চ্যান্সেলর ছিলেন লর্ড ক্যানিং এবং প্রথম ভারতীয় ভাইস-চ্যান্সেলর ছিলেন স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দুই স্নাতক কে ছিলেন জানেন? বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং যদুনাথ বোস। বঙ্কিমচন্দ্র, যিনি পরবর্তীতে আমাদের জাতীয় স্তোত্র 'বন্দে মাতরম' লিখেছিলেন। এছাড়া ভারতের প্রথম নারী স্নাতক কাদম্বিনী গাঙ্গুলী এবং চন্দ্রমুখী বসুও এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্রীবৃন্দ ছিলেন।
পশ্চিম ভারতের শিক্ষার আলো ছড়াতে ১৮৫৭ সালের জুলাই মাসে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। স্যার জন জনসন ছিলেন এর প্রথম চ্যান্সেলর। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ের বুকে আধুনিক বিচারব্যবস্থা, আইন এবং সমাজবিজ্ঞানের চর্চায় বিশাল ভূমিকা রেখেছিল। জাস্টিস মহাদেব গোবিন্দ রানাডে, বাল গঙ্গাধর তিলকের মতো ব্যক্তিত্বরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যুক্ত ছিলেন।
দক্ষিণ ভারতের চেন্নাই বা তৎকালীন মাদ্রাজে সেপ্টেম্বর মাসে এটি স্থাপিত হয়। দক্ষিণ ভারতের মেধা ও বিজ্ঞান চর্চার মূল কেন্দ্র হয়ে ওঠে এই প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তীতে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী সি. ভি. রমন বা এস. চন্দ্রশেখর— এঁদের সবারই শিক্ষার ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল এই মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়।

এবার দেখা যাক, এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কী পড়ানো হতো? শিক্ষার মাধ্যম সম্পূর্ণভাবে ছিল ইংরেজি। পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত ছিল ইউরোপীয় সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস, গণিত এবং বিজ্ঞান। তবে প্রাচ্যের ভাষা যেমন সংস্কৃত, আরবি, ফারসিও পড়ার সুযোগ ছিল।
পরীক্ষার পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত কঠিন। প্রথম দিকে ম্যাট্রিকুলেশন বা প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাসের হার ছিল খুবই কম। ব্রিটিশরা চেয়েছিল ফিল্টারিং করতে— অর্থাৎ, কেবল মাত্র অতি মেধাবীরাই যেন ওপরের স্তরে পৌঁছাতে পারে। একে বলা হতো ডাউনওয়ার্ড ফিল্ট্রেশন থিওরি । তারা ভেবেছিল ওপরের কিছু মানুষ শিক্ষিত হলে তাদের দেখে নিচের স্তরের সাধারণ মানুষ এমনিই শিক্ষিত হয়ে যাবে, যা পরবর্তীতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ প্রমাণিত হয়।

বন্ধুরা, এবার আসি এই প্রজেক্টের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে। ব্রিটিশরা এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তৈরি করেছিল নিজেদের অনুগত দাস বা কেরানি তৈরির কারখান হিসেবে। কিন্তু ইতিহাস সবসময় শাসকের ইচ্ছেমতো চলে না।
ব্রিটিশদের এই চাল তাদের ওপরই উল্টো মার দিয়েছিল। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে যখন ভারতীয় যুবকেরা ইংরেজি শিখে বের হলো, তারা শুধু কেরানি হলো না। তারা মিল্টন, শেকসপিয়র পোলেন, রুশো, ভলতেয়ার এবং ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাস পড়ল। তারা বুঝল স্বাধীনতা কী, গণতন্ত্র কী, এবং অধিকার কী।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয়ে উঠল জাতীয়তাবাদের মূল কেন্দ্র। কলকাতা, বোম্বাই এবং মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই পরবর্তীতে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করলেন। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, গোপাল কৃষ্ণ গোখলে, দাদাভাই নওরোজি, ফিরোজশাহ মেহতা, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু— এঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন এই ব্রিটিশ নির্মিত শিক্ষা ব্যবস্থারই ফসল।
যে ইংরেজি ভাষাকে ব্রিটিশরা শৃঙ্খল বানাতে চেয়েছিল, ভারতীয় বুদ্ধিজীবীরা সেই ইংরেজি ভাষাকেই অস্ত্র বানিয়ে সারা ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের মানুষের সাথে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করলেন। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী এক হয়ে গেল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে।
তাহলে পরিশেষে আমরা কী বলতে পারি? ১৮৫৭ সালের এই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রজেক্টটি কি ব্রিটিশদের ভারতের প্রতি দয়া ছিল? একদমই না। এটি ছিল তাদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের একটি প্রশাসনিক প্রজেক্ট।
কিন্তু, ভারতীয়দের মেধা এবং স্বাধীনচেতা মানসিকতা সেই ঔপনিবেশিক শিক্ষাকেই নিজেদের মুক্তির হাতিয়ারে রূপান্তরিত করেছিল। ১৮৫৭ সালের সেই ছোট্ট চারাগাছগুলো আজ বিশাল বৃক্ষ। আজকের স্বাধীন ভারতে এই তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় কোটি কোটি শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দিয়ে দেশের উন্নতিতে অবদান রাখছে।
ইতিহাসের এই অধ্যায়টি আমাদের শেখায় যে, শিক্ষার আলো আপনি যে উদ্দেশ্যেই জ্বালান না কেন, তা অন্ধকার দূর করবেই।
আশা করি আজকের এই ঐতিহাসিক জার্নিটি আপনাদের ভালো লেগেছে। যদি ১৮৫৭ সালের এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রজেক্টের ওপর লেখা ব্লগটি আপনাদের তথ্যবহুল মনে হয়ে থাকে, তবে অবশ্যই  বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন এবং আমাদের ফলো করতে ভুলবেন না। আপনার মূল্যবান মতামত নিচে কমেন্ট করে জানান। দেখা হবে পরেরপোস্টে। ধন্যবাদ, জয় হিন্দ।

মন্তব্যসমূহ