রক্তের শপথ: ব্রিটিশ ভারত ও থাগি অবসান | দ্য ট্রু স্টোরি অফ থাগস(thuggee)।

নমস্কার। আজ আমরা ইতিহাসের এমন এক অন্ধকার গলিতে প্রবেশ করতে যাচ্ছি, যা শুনলে আজও গায়ে কাঁটা দেয়।
কল্পনা করুন, আপনি ১৮২০ বা ১৮৩০ সালের ভারতের একজন ব্যবসায়ী। নিজের দলবল, ঘোড়া আর মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে এক শহর থেকে অন্য শহরে যাচ্ছেন। পথ দীর্ঘ এবং বিপজ্জনক। হঠাৎ মাঝপথে আপনাদের সাথে দেখা হয়ে গেল একদল অমায়িক, ভদ্র পথচারীর। তারা আপনারই মতো তীর্থযাত্রী বা ব্যবসায়ী। তারা আপনার সাথে গল্প জুড়ে দিল, আপনার সুখ-দুঃখের ভাগীদার হলো। কয়েকদিন একসাথে চলার পর আপনার মনে হলো, এরা তো পর নয়, পরম বন্ধু!
তারপর একদিন সূর্যাস্ত হলো। কোনো এক নির্জন নদীর তীরে বা ঘন জঙ্গলের ধারে আপনারা সবাই মিলে রাতের খাবারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। হঠাৎ সেই বন্ধুদের মধ্য থেকে একজন আকাশে তাকিয়ে অদ্ভুত এক পাখির ডাক ডেকে উঠল— অথবা চিৎকার করে বলে উঠল, "পান আনো!"
আর মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল দৃশ্যপট। আপনার সেই পরম বন্ধুরা পকেট থেকে বের করল একটি হলুদ বা কাপড়ের টুকরো। সেকেন্ডের মধ্যে তা পেঁচিয়ে ধরল আপনার এবং আপনার সঙ্গীদের গলায়। কোনো তরবারি চলল না, কোনো পিস্তলের আওয়াজ হলো না। মাত্র কয়েক মিনিটে নিঃশব্দে শেষ হয়ে গেল পুরো একটি দল। লাশগুলো মাটিতে পুঁতে, তার ওপর রান্না করে খেয়ে দেয়ে তারা আবার মিলিয়ে গেল অন্ধকারে।
এরা কোনো সাধারণ ডাকাত ছিল না। এরা ছিল 'থাগি'। প্রায় সাড়ে চারশো বছর ধরে ভারতের বুকে রাজত্ব করা এক গোপন ঘাতক সম্প্রদায়। আজ আমরা জানবো কীভাবে ব্রিটিশ ভারতের এক দূরদর্শী অফিসার এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় অপরাধী সিন্ডিকেটকে ধ্বংস করেছিলেন।

থাগি' শব্দটি এসেছে সংস্কৃত 'স্থগ' থেকে, যার অর্থ প্রতারক বা ধূর্ত। কিন্তু এরা কেবল সাধারণ চোর-ডাকাত ছিল না। এটি ছিল একটি বংশানুক্রমিক গোপন ধর্মীয় গোষ্ঠী। অবাক করা বিষয় হলো, এই গোষ্ঠীতে হিন্দু এবং মুসলমান— উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই ছিল। কিন্তু তারা সবাই সম্মিলিতভাবে পূজা করত দেবী কালীর এক ভয়ঙ্কর রূপের, যাকে তারা 'ভবানী' বলে ডাকত।
তাদের বিশ্বাস ছিল, তারা কোনো অপরাধ করছে না; বরং দেবী কালীর নির্দেশে মহাবিশ্বের ভারসাম্য রক্ষা করছে। তারা বিশ্বাস করত, দেবী কালী তাদের এই হত্যার অনুমতি দিয়েছেন, তবে কিছু কঠোর নিয়মের বিনিময়ে:
তারা কখনো কোনো নারীর রক্তপাত করবে না।
তারা কোনো কুষ্ঠরোগী, ধোপা বা সাধু-সন্ন্যাসীকে হত্যা করবে না।
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— তারা তরবারি বা কোনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে রক্তপাত ঘটাবে না।
হত্যাকাণ্ডের জন্য তাদের প্রধান অস্ত্র ছিল 'রুমাল'— একটি হলুদ বা কাপড়ের টুকরো, যার এক প্রান্তে একটি মুদ্রা বা গিঁট বাঁধা থাকত, যাতে গলায় ফাঁস দিতে সুবিধা হয়। এই নিখুঁত শ্বাসরোধ করার বিদ্যাকে বলা হতো 'ফাঁসিগারি'।
থাগিরা সমাজের মূল স্রোতেই মিশে থাকত। বছরের আট মাস তারা হয়তো সাধারণ কৃষক, তাঁতি বা সরকারি কর্মচারী হিসেবে জীবন কাটাত। কেউ টেরও পেত না আপনার পাশের বাড়ির শান্ত মানুষটি আসলে একজন পেশাদার খুনি। কিন্তু শরৎকাল এলেই, দেবী দুর্গা বা কালীর পূজার পর, তারা দলবদ্ধ হয়ে বেরিয়ে পড়ত 'রুমাল' হাতে।
তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য একটি নিজস্ব সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করত, যার নাম ছিল 'রামাসি' (Ramasi)। এই ভাষা সাধারণ মানুষ বা পুলিশ কেউ বুঝত না।

এখন প্রশ্ন আসতেই পারে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করার পরও কেন কেউ তাদের ধরতে পারল না? গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুযায়ী, থাগিরা প্রায় ২০ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে (যদিও এই সংখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক আছে, তবে সংখ্যাটা যে কয়েক লাখ ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই)।
এর পেছনে তিনটি প্রধান কারণ ছিল:
১. কোনো প্রমাণ না রাখা: থাগিরা 'লুগ্গা' বা কবর খোদক রাখত। মানুষ হত্যার সাথে সাথে তাদের পেটের চর্বি বা শরীর কেটে এমনভাবে মাটিতে পুঁতে ফেলা হতো এবং ওপরে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হতো, যাতে বন্য পশুরাও গন্ধ না পায়। নিখোঁজ হওয়া মানুষজন শুধু হারিয়ে গেছে বলেই ধরে নেওয়া হতো।
২. দেশীয় রাজাদের আশ্রয়: অনেক স্থানীয় রাজা, জমিদার এবং পুলিশ কর্মকর্তা থাগিদের কাছ থেকে লুটের মালের একটি বড় অংশ পেতেন। তাই তারা থাগিদের সুরক্ষা দিতেন এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতেন না।
৩. ভারতের রাজনৈতিক শূন্যতা: ১৮ শতকের শেষে এবং ১৯ শতকের শুরুতে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন এবং মারাঠাদের পরাজয়ের পর ভারতে এক বিশাল রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। রাস্তাঘাট ছিল অরক্ষিত, আর এই সুযোগটাই নিয়েছিল থাগিরা।

১৮২০-এর দশক। ভারতের বড় একটা অংশ তখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে। গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ভারতের সামাজিক সংস্কারের দিকে নজর দিচ্ছিলেন। ঠিক এই সময়ে মঞ্চে প্রবেশ করলেন একজন সাধারণ ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তা— ক্যাপ্টেন উইলিয়াম স্লিম্যান (William Sleeman)।
স্লিম্যান যখন মধ্য ভারতের জবলপুরে পোস্টিং পেলেন, তখন তিনি লক্ষ্য করলেন, প্রতি বছর শত শত মানুষ কোনো চিহ্ন ছাড়াই নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে। সাধারণ পুলিশ একে ডাকাতদের কাজ বলে এড়িয়ে গেলেও, স্লিম্যান বুঝতে পারলেন এর পেছনে কোনো সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক কাজ করছে।
তিনি প্রথাগত তদন্তের পথ ছেড়ে এক অভিনব পদ্ধতি বেছে নিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, থাগিদের কোনো বাহ্যিক প্রমাণ নেই, তাই এদের ধ্বংস করতে হলে এদের ভেতর থেকেই কাউকে ভাঙতে হবে।
১৮৩০ সালে স্লিম্যান 'থাগি অ্যান্ড ডাকাত বিভাগ' (Thuggee and Dacoity Department) গঠন করেন। তিনি এক বিশাল 'তথ্যদাতা' বা 'ইনফর্মার' নেটওয়ার্ক তৈরি করলেন। তিনি গ্রেপ্তারকৃত থাগিদের একটি প্রস্তাব দিলেন— "তোমরা যদি তোমাদের দলের বাকিদের নাম এবং তাদের গোপন কবরস্থান দেখিয়ে দাও, তবে তোমাদের ফাঁসি না দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হবে।"
এই কৌশলটি ম্যাজিকের মতো কাজ করল। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত থাগি, যার নাম ছিল আমির আলী (কারো মতে থাগ বেহরাম), সে নিজের দলের এবং অন্যান্য দলের সমস্ত গোপন রহস্য ফাঁস করে দিল। আমির আলী নিজেই স্বীকার করেছিল যে সে তার জীবনে প্রায় ৯৩১টি হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিল।

স্লিম্যান প্রতিটি থাগির দেওয়া স্বীকারোক্তি মিলিয়ে একটি বিশাল বংশলতিকা বা 'ফ্যামিলি ট্রি' তৈরি করলেন। তিনি ভারতের মানচিত্রে দাগিয়ে দিলেন কোথায় কোথায় থাগিরা আক্রমণ করে।
শুরু হলো ইতিহাসের অন্যতম নিখুঁত এবং কঠোর গোয়েন্দা অভিযান।
১৮৩০ থেকে ১৮৪০ সালের মধ্যে প্রায় ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ থাগিকে বন্দি করা হয়। স্লিম্যানের তৈরি করা প্রমাণ এবং থাগিদের নিজেদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে আদালতে বিচার শুরু হয়।
শত শত থাগিকে জনসমক্ষে ফাঁসি দেওয়া হয়, যাতে মানুষের মন থেকে তাদের ভয় দূর হয়।
বাকিদের আন্দামানে কালাপানি বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে পাঠানো হয়।
আর যারা সরকারি সাক্ষী বা ইনফর্মার হয়েছিল, তাদের জবলপুরের একটি বিশেষ সংশোধনাগারে রাখা হয়, যেখানে তাদের তাবু তৈরি ও কাপড় বোনার মতো শিল্প শেখানো হয়, যাতে তাদের সন্তানরা আর এই অপরাধে জড়িয়ে না পড়ে।
১৮৫০ সালের মধ্যে ভারতের বুক থেকে 'থাগি' নামক এই ভয়ঙ্কর প্রথার সম্পূর্ণ অবসান ঘটে। স্লিম্যানের এই অবিশ্বাস্য সাফল্যের পর তাকে 'স্যার' উপাধিতে ভূষিত করা হয় এবং জবলপুরের একটি গ্রামের নাম রাখা হয় 'স্লিম্যানাবাদ'।

থাগি দমনের এই ইতিহাস যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনই এর কিছু অন্ধকার দিকও আধুনিক ঐতিহাসিকরা তুলে ধরেন। অনেকে মনে করেন, ব্রিটিশরা এই 'থাগি' ভীতিকে কিছুটা বাড়িয়ে চড়িয়ে দেখিয়েছিল, যাতে তারা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজ্যগুলোর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং ভারতীয়দের 'অসভ্য' ও 'বর্বর' হিসেবে চিত্রিত করতে পারে।
তবে সমালোচনা যাই থাক না কেন, এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, উইলিয়াম স্লিম্যান এবং তাঁর দল যদি এই গোপন খুনিদের নেটওয়ার্ক ধ্বংস না করতেন, তবে ভারতের রাস্তাঘাট সাধারণ মানুষের জন্য কখনো নিরাপদ হতো না।
আজকের ইংরেজি ভাষার একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ 'Thug' (যার অর্থ গুন্ডা বা অপরাধী), তা কিন্তু এই ভারতীয় থাগি শব্দ থেকেই এসেছে। হলিউডের বিখ্যাত সিনেমা 'ইন্ডিয়ানা জোনস অ্যান্ড দ্য টেম্পল অফ ডুম'-এও এই থাগিদের খলনায়ক হিসেবে দেখানো হয়েছে।
ইতিহাসের পাতা থেকে থাগিরা আজ হারিয়ে গেছে। কিন্তু তাদের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়— মানুষের অন্ধ বিশ্বাস এবং কুসংস্কার কীভাবে চরম নৃশংসতার জন্ম দিতে পারে, আর সঠিক নেতৃত্ব ও বুদ্ধিমত্তা কীভাবে সেই অন্ধকারকে দূর করতে পারে।
আজকের ব্লগ আপনাদের কেমন লাগলো? থাগিদের এই ইতিহাস কি আপনারা আগে জানতেন? কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। ভালো লাগলে শেয়ার করতে ভুলবেন না। দেখা হবে পরের ব্লগে। ধন্যবাদ।

মন্তব্যসমূহ