চম্বলের বাগী মানসিং ও মোহর সিংয়ের ত্রাসের দুই দশক (১৯৫০-১৯৭০)।
নমস্কার। আজ আমরা ফিরে যাব ইতিহাসের এমন এক অধ্যায়ে, যেখানে আইনের শাসন আর প্রকৃতির নির্মমতা মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। ভারতের মানচিত্রের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত একটি অঞ্চল—চম্বল।মধ্যপ্রদেশ রাজস্থান আর উত্তরপ্রদেশের সীমানা ছুঁয়ে যাওয়া এই চম্বল নদীর উপত্যকা শুধু তার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের জন্য পরিচিত নয় এটি পরিচিত ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এবং রোমাঞ্চকর ডাকাত বা 'বাগী'দের উপাখ্যানের জন্য।
সাধারণ মানুষের কাছে তারা ছিল ডাকাত কিন্তু চম্বলের গিরিখাতের গভীরে তারা নিজেদের বলত বাগী—অর্থাৎ বিদ্রোহী। আজ আমরা আলোচনা করব ১৯৫০ থেকে ১৯৭০—এই দুই দশকের এমন দুজন মানুষকে নিয়ে যাদের নামে চম্বলের বাতাস কেঁপে উঠত। একজন হলেন বাগী ঠাকুর মানসিং, আর অন্যজন দস্যু মোহর সিং। এই ব্লগে আমরা জানব কীভাবে চম্বলের বিহাইন্ড বা গিরিখাতগুলো হয়ে উঠেছিল অপরাধের রাজধানী, এবং কীভাবে এই দুই সর্দার পুরো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন।
মানসিং বা মোহর সিংয়ের গল্প বোঝার আগে চম্বলকে বোঝা জরুরি। চম্বল নদী হাজার বছর ধরে মাটি কেটে এমন এক গোলকধাঁধা তৈরি করেছে, যাকে বলা হয় 'বিহাইন্ড' বা Ravines। মাইলের পর মাইল জুড়ে ছড়ানো এই মাটির ঢিবির ভেতর একবার ঢুকে পড়লে, আধুনিক সেনাবাহিনী বা পুলিশের পক্ষেও কাউকে খুঁজে বের করা অসম্ভব ছিল।
কিন্তু এরা কেন বাগী হতো? চম্বলে একটা কথা প্রচলিত আছে—"চম্বল কা পানি যো পিয়েগা, ও বাগী বনেগা।" তবে এর পেছনে আসল কারণ ছিল সামন্ততান্ত্রিক শোষণ জমির বিবাদ এবং জাতপাতের লড়াই। যখন কোনো সাধারণ মানুষ আইনি ব্যবস্থায় বিচার পেত না তখন সে বন্দুক তুলে নিত। তারা নিজেদের রবিন হুড মনে করত—ধনীদের লুটতরাজ করা আর গরিবদের সাহায্য করা ছিল তাদের ঘোষিত নীতি। আর এই সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন সুবেদার মানসিং।
১৯৫০-এর দশকে চম্বলের অবিসংবাদিত রাজা ছিলেন ঠাকুর মানসিং। উত্তরপ্রদেশের আগ্রা জেলার চম্বল অঞ্চলের এক রাজপুত পরিবারে তাঁর জন্ম। মানসিং কিন্তু জন্মগত অপরাধী ছিলেন না। স্থানীয় জমি ও পারিবারিক বিবাদের জেরে যখন পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন তাঁর ওপর অন্যায় করে তখন তিনি চম্বলের গিরিখাতে আশ্রয় নেন।
মানসিংয়ের উপদ্রব বা রাজত্বকাল ১৯৫০ থেকে ১৯৫৫ সালের মধ্যে চরম সীমায় পৌঁছায়। কিন্তু মানসিংয়ের স্টাইল ছিল আলাদা। তিনি খাকি পোশাক পরতেন কপালে তিলক কাটতেন এবং তাঁর দলের কঠোর নিয়ম ছিল—কোনো নারী, শিশু বা গরিব মানুষের ওপর হাত তোলা যাবে না। তিনি ধনীদের অপহরণ করতেন আর সেই টাকা বিলিয়ে দিতেন গরিবদের বিয়েতে বা গ্রামের মন্দিরে।
১৯৫০-এর দশকের শুরুতে মানসিংয়ের দল এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে, মধ্যপ্রদেশ এবং উত্তরপ্রদেশ পুলিশ যৌথভাবে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে ভয় পেত। প্রায় ১১১২টি ডাকাতি এবং ১৮৫টি খুনের মামলার সাথে তাঁর নাম জড়িয়েছিল, যার মধ্যে বহু পুলিশ অফিসারও ছিলেন। সরকারের কাছে মানসিং ছিলেন এক নম্বর শত্রু কিন্তু স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি ছিলেন 'রাজা বাবু'।
অবশেষে ১৯৫৫ সালের শেষভাগে, এক বিশাল পুলিশি এনকাউন্টারে মানসিং এবং তাঁর ছেলে সুবেদার সিং নিহত হন। মানসিংয়ের মৃত্যুর পর চম্বলে সাময়িকভাবে একটা শূন্যতা তৈরি হয় কিন্তু গিরিখাতের বন্দুকগুলো স্তব্ধ হয়নি। ঠিক এই সময়েই চম্বলের মাটিতে পা রাখেন আরেক নিষ্ঠুর ও পরাক্রমশালী বাগী—মোহর সিং।
মানসিংয়ের মৃত্যুর পর ১৯৬০-এর দশকে চম্বলের দৃশ্যপট বদলে যায়। এবার আর 'রবিন হুড' ইমেজ নয়, চম্বলে প্রবেশ করল চরম নিষ্ঠুরতা এবং আধুনিক অস্ত্র। আর এই নতুন যুগের নায়ক ছিলেন মোহর সিং গুর্জর।
মোহর সিংয়ের উত্থান ঘটে মধ্যপ্রদেশের ভিন্ড-মোরেনা অঞ্চল থেকে। মানসিংয়ের আদর্শবাদের বিপরীতে মোহর সিং ছিলেন অত্যন্ত বাস্তববাদী এবং ভয়ঙ্কর। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে চম্বলে টিকে থাকতে হলে ভীতি প্রদর্শন জরুরি। ১৯৬০ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে মোহর সিং চম্বলে নিজের একচ্ছত্র সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন।
তিনি প্রথম চম্বলের ডাকাত দলে সেমি-অটোমেটিক রাইফেল এবং আধুনিক বন্দুকের ব্যবহার শুরু করেন। তাঁর দলের সদস্য সংখ্যা ছিল শতাধিক। মোহর সিংয়ের প্রধান ব্যবসা ছিল 'পকড়' বা অপহরণ। তিনি বড় বড় ব্যবসায়ী ও জমিদারদের অপহরণ করতেন এবং কোটি কোটি টাকা মুক্তিপণ আদায় করতেন। যদি কেউ মুক্তিপণ দিতে দেরি করত, মোহর সিং নিজে তার অঙ্গচ্ছেদ করতে বা হত্যা করতে দ্বিধা করতেন না।
১৯৭০ সালের মধ্যে মোহর সিংয়ের মাথার ওপর তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে ২ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল—যা সেই সময়ে ছিল ভারতের ইতিহাসের অন্যতম সর্বোচ্চ পুরস্কারের রাশি। পুলিশ রেকর্ডে তাঁর বিরুদ্ধে প্রায় সাড়ে তিনশো খুন এবং ডাকাতির মামলা ছিল। চম্বলের মানুষ সূর্য ডোবার পর ঘর থেকে বের হতে ভয় পেত কারণ তখন চম্বল চলত মোহর সিংয়ের ইশারায়।
আমরা যদি ১৯৫০ থেকে ১৯৭০—এই ২০ বছরের চম্বলকে দেখি, তবে মানসিং এবং মোহর সিংয়ের মধ্যে একটি স্পষ্ট পার্থক্য দেখতে পাব।
মানসিং ছিলেন সামন্ততান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতীক। তিনি বাগী হয়েছিলেন সম্মানের লড়াইয়ে। তাঁর একটি নৈতিক কোড বা নিয়মাবলী ছিল। তিনি গরিবদের বন্ধু ছিলেন।
অপরদিকে, মোহর সিং ছিলেন আধুনিক অপরাধ জগতের চম্বল সংস্করণ। তাঁর কাছে ক্ষমতা এবং ব্যবসাই ছিল শেষ কথা। মানসিং যেখানে পুলিশের সাথে সম্মুখ সমরে বিশ্বাস করতেন মোহর সিং সেখানে নিখুঁত পরিকল্পনা এবং নির্মমতায় বিশ্বাস করতেন।
তবে দুজনের মধ্যেই একটা মিল ছিল—উভয়েরই গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ছিল চমৎকার। গ্রামের সাধারণ মানুষ পুলিশের চেয়ে এই বাগীদের বেশি ভয় পেত এবং শ্রদ্ধা করত যার ফলে পুলিশ বছরের পর বছর চেষ্টা করেও চম্বলের গিরিখাতে এদের স্পর্শ করতে পারেনি।
১৯৭০ সালের পর ভারত সরকার এবং মধ্যপ্রদেশ প্রশাসন বুঝতে পারে যে শুধু বন্দুকের গুলিতে চম্বলকে শান্ত করা যাবে না। হাজার হাজার পুলিশ ফোর্স পাঠিয়েও মোহর সিং বা মাধো সিংয়ের মতো ডাকাতদের দমন করা যাচ্ছিল না। এই অচলাবস্থা ভাঙতে এগিয়ে এলেন গান্ধীবাদী নেতা লোকনায়ক জয়প্রকাশ নারায়ণ।
জয়প্রকাশ নারায়ণ চম্বলের বাগীদের বোঝাতে সক্ষম হন যে হিংসার পথ ছেড়ে মূল স্রোতে ফিরে আসাই একমাত্র সমাধান। ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসে মধ্যপ্রদেশের জৌরা নামক স্থানে এক ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে। চম্বলের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান।
দস্যু সম্রাট মোহর সিং, তাঁর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মাধো সিং এবং আরও শত শত বাগী মহাত্মা গান্ধীর ছবির সামনে এবং জয়প্রকাশ নারায়ণের চরণে তাদের আধুনিক অস্ত্র সমর্পণ করেন। মোহর সিং নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে চম্বলের হিংস্র জীবন থেকে তিনি মুক্তি চেয়েছিলেন।
সরকার তাদের মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করে জেল হেফাজতের নির্দেশ দেয়। পরবর্তীতে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে মোহর সিং সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করেন এমনকি তিনি স্থানীয় পুরসভার রাজনীতিতেও অংশ নেন এবং ২০২০ সালে বার্ধক্যজনিত কারণে তাঁর মৃত্যু হয়।
১৯৫০ থেকে ১৯৭০ সালের চম্বলের এই উপদ্রব ভারতের অপরাধ ও সমাজবিজ্ঞানের এক অনন্য অধ্যায়। মানসিং এবং মোহর সিং—দুজনই চম্বলের শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা ভৌগোলিক জটিলতা এবং সামাজিক বৈষম্যের ফসল ছিলেন।
আজ চম্বল বদলে গেছে। সেই কুখ্যাত গিরিখাতগুলোতে এখন চাষবাস হচ্ছে চম্বল নদী এখন পর্যটন ও ঘড়িয়াল অভয়ারণ্যের জন্য পরিচিত। বন্দুকের গর্জন এখন আর চম্বলের বাতাসকে ভারী করে তোলে না। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় মানসিংয়ের 'বাগী' আদর্শ আর মোহর সিংয়ের 'ত্রাস' চিরকাল চম্বলের এক রোমাঞ্চকর এবং অন্ধকার অধ্যায় হিসেবেই থেকে যাবে।
আজকের এই আলোচনা আপনাদের কেমন লাগল, কমেন্ট করে জানাবেন। চম্বলের ইতিহাস নিয়ে এমন আরও ব্লগ পড়তে আমাদের ফলো করুন। ধন্যবাদ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Your valuable feedback or questions below comment Please let me know. Thank you.