বোম্বাইয়ের প্রথম ‘স্টাইলিশ’ ডন রুস্তম মোদী ও ১৯৬০-এর কাঁপানো ডাকাতি।
আজ থেকে প্রায় ৬০ বছর আগের কথা। বোম্বাই তখন আজকের মতো এত ব্যস্ত বা বহুতল ভবনে ঢাকা ছিল না। কিন্তু আরব সাগরের তীরের এই শহরে তখন তৈরি হচ্ছিল এক নতুন আন্ডারওয়ার্ল্ড। আমরা অনেকেই হাজি মাস্তান, বরদারাজন বা করিম লালার নাম শুনেছি। কিন্তু আপনি কি জানেন এই সব ডনদের উত্থানের আগে ১৯৬০-এর দশকে বোম্বাই পুলিশকে যিনি একাই নাকানিচুবানি খাইয়েছিলেন তিনি কে ছিলেন?
তিনি কোনো বস্তি থেকে উঠে আসা সাধারণ পকেটমার ছিলেন না। তিনি ছিলেন সুশিক্ষিত মার্জিত পোশাক পরিহিত এবং পার্সি পরিবারের একজন সন্তান। তাঁর নাম—রুস্তম সোহরাব মোদী। আর তাঁর দলবলকে শহর চিনত "রুস্তম গ্যাং" নামে।
আজকের ব্লগে আমরা এমন এক অপরাধীর গল্প শুনব যে তৎকালীন বোম্বাইয়ের ব্যাংকার ব্যবসায়ী এবং পুলিশ কমিশনারের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। এটি কেবল কিছু চুরির গল্প নয় এটি হলো নিখুঁত পরিকল্পনা স্টাইল এবং বিশ্বাসঘাতকতার এক রোমাঞ্চকর দলিল।
রুস্তম সোহরাব মোদী। অপরাধ জগতের আর পাঁচটা গ্যাংস্টারের সাথে তাঁর আকাশ-পাতাল তফাত ছিল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শন সবসময় দামি স্যুট পরতেন চমৎকার ইংরেজি বলতেন এবং তাঁর চালচলন ছিল একদম রাজকীয়। সাধারণ মানুষ তাঁকে দেখে কোনো বড় কোম্পানির ম্যানেজার বা ব্যবসায়ী ভাবত। কিন্তু এই ভদ্র চেহারার পেছনে লুকিয়ে ছিল এক অপরাধী মাস্টারমাইন্ড।
১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে রুস্তম তাঁর নিজস্ব একটি দল বা 'গ্যাং' তৈরি করেন। তাঁর এই গ্যাং-এর বিশেষত্ব ছিল—সেখানে কোনো আনাড়ি চোর ছিল না। তিনি বেছে বেছে শহরের সেরা তালা ভাঙার কারিগর গাড়ি চালক এবং জালিয়াতিতে দক্ষ মানুষদের দলে নেন।
রুস্তম গ্যাং-এর কাজের ধরণ বা MODUS OPERANDI ছিল একদম হলিউড স্টাইলের। তারা কোনো সাধারণ মানুষের বাড়িতে বা ছোট দোকানে ডাকাতি করত না। তাদের টার্গেট ছিল বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, ধনকুবেরদের লকার এবং ব্যাংক। ১৯৬০ সালের দিকে রুস্তম গ্যাং বোম্বাইয়ে একের পর এক এমন সব ডাকাতি করতে শুরু করে যা পুলিশকে স্তব্ধ করে দেয়। তারা অপরাধ করার পর ঘটনাস্থলে কোনো হিংস্রতার ছাপ রাখত না বরং রেখে যেত এক নিখুঁত চাতুরীর স্বাক্ষর।
এবার আসা যাক ১৯৬০ সালের সেই মূল অধ্যায়ে। এই বছরটি ছিল রুস্তম গ্যাং-এর সাফল্যের চূড়া এবং একই সাথে তাদের পতনের সূত্রপাত।
ফোর্ট এলাকার ব্যাংকিং ডিস্ট্রিক্ট অপারেশন:
১৯৬০ সালের মাঝামাঝি সময়ে বোম্বাইয়ের ফোর্ট এলাকার একটি নামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এক দুঃসাহসিক ডাকাতি হয়। মাঝরাতে রুস্তম এবং তাঁর গ্যাং সিকিউরিটি সিস্টেমকে ফাঁকি দিয়ে ভেতরে ঢোকে। কোনো মারামারি নয় কোনো হইচই নয়। রুস্তমের প্রধান সহযোগী যে লকার ভাঙায় ওস্তাদ ছিল সে মাত্র কয়েক মিনিটে সেই সময়ের আধুনিকতম লকারটি ভেঙে ফেলে। সেই রাতে তারা লাখ লাখ টাকার ক্যাশ এবং গহনা নিয়ে চম্পট দেয়।
কালবা দেবীর কাপড়ের গদির ডাকাতি:
সে যুগে বোম্বাইয়ের কালবা দেবী এবং জহুরি বাজার ছিল টাকার খনি। বড় বড় মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা ব্যাংকের চেয়ে নিজেদের গদিতে বা সিন্দুকে বেশি টাকা রাখতেন। রুস্তম মোদী এটি জানতেন। ১৯৬০ সালের এক বৃষ্টিভেজা রাতে রুস্তম গ্যাং একটি বিলাসবহুল গাড়ি চড়ে এক বড় ব্যবসায়ীর অফিসের সামনে এসে দাঁড়ায়। গার্ডদের তারা এতটাই আত্মবিশ্বাসের সাথে ধোঁকা দেয় যে গার্ডরা ভেবেছিল খোদ মালিকের কোনো ভিআইপি অতিথি এসেছেন। ভেতরে ঢুকে মাত্র ১৫ মিনিটে পুরো সিন্দুক খালি করে তারা হাওয়া হয়ে যায়।
রুস্তমের স্টাইল:
পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী রুস্তম মোদী ডাকাতি করার সময় কখনো তাড়াহুড়ো করতেন না। তিনি পকেটে দামী সিগারেট রাখতেন। একবার এক ডাকাতির জায়গায় তিনি আরাম করে সিগারেট খেয়ে তার ছাই ফেলে এসেছিলেন যা বোম্বাই পুলিশকে খোঁচা দেওয়ার সামিল ছিল।
১৯৬০ সালের শেষ নাগাদ রুস্তম গ্যাং বোম্বাই পুলিশের কাছে এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়ায়। খবরের কাগজে প্রতিদিন হেডলাইন হতো—"আবারও ব্যর্থ পুলিশ রুস্তম গ্যাং-এর নতুন ধামাকা"। বোম্বাইয়ের তৎকালীন পুলিশ কমিশনারের ওপর ওপরমহল থেকে প্রচণ্ড চাপ আসতে শুরু করে।
কিন্তু প্রবাদ আছে না—"চোরের দশ দিন তো সাধুর এক দিন"। রুস্তম মোদী যত বড়ই মাস্টারমাইন্ড হোন না কেন, বোম্বাই পুলিশও চুপ করে বসে ছিল না। ১৯৬০ সালের শেষের দিকে পুলিশ কমিশনার এই গ্যাং-টিকে ধরার জন্য একটি স্পেশাল স্কোয়াড গঠন করেন। পুলিশের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল রুস্তমের অহংকার এবং তাঁর বিলাসবহুল জীবনযাত্রা।
রুস্তম ডাকাতির টাকা দিয়ে রেসের মাঠে বাজি ধরতেন, বোম্বাইয়ের দামী দামী ক্লাবে মদ-নারীতে মত্ত থাকতেন। পুলিশ তাঁর এই দুর্বলতাকেই কাজে লাগায়।
টাকা ভাগাভাগি এবং বিশ্বাসঘাতকতা:
যে কোনো বড় গ্যাং-এর পতনের পেছনে থাকে অভ্যন্তরীণ কোন্দল। রুস্তম গ্যাং-এর ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। ১৯৬০ সালের একটি বড় ডাকাতির পর টাকার ভাগাভাগি নিয়ে রুস্তমের সাথে তাঁর এক বিশ্বস্ত সহযোগীর তীব্র ঝামেলা হয়। সেই সহযোগী মনে করেছিল, রুস্তম নিজে সিংহভাগ টাকা রেখে তাদের ঠকাচ্ছেন।
এই ক্ষোভ থেকেই সেই সহযোগী বোম্বাই পুলিশের এক ইনফর্মারের কাছে রুস্তমের পরবর্তী পরিকল্পনার কথা ফাঁস করে দেয়।
সেই শেষ রাত:
১৯৬০ সালের শেষের দিকের এক রাতে, রুস্তম গ্যাং যখন আরেকটি বড় অপারেশনের ছক কষছিল তখন বোম্বাইয়ের একটি গোপন আস্তানায় পুলিশ চারদিক থেকে ঘেরাও করে। রুস্তম পালানোর চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু এবার পুলিশ ছিল সম্পূর্ণ প্রস্তুত। কোনো গুলি না চালিয়েই অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে পুলিশ রুস্তম সোহরাব মোদী এবং তাঁর পুরো গ্যাংকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
যখন রুস্তমকে হাতকড়া পরানো হয় তখনও তাঁর মুখে সেই পরিচিত অহংকারী হাসি ছিল। তিনি পুলিশ অফিসারকে দেখে বলেছিলেন, "আপনারা আমাকে ধরেছেন ঠিকই, কিন্তু আমার রেকর্ড ভাঙতে বোম্বাইয়ের আরও বহু বছর সময় লাগবে।"
রুস্তম সোহরাব মোদীর গ্রেপ্তারের পর তাঁর কঠোর শাস্তি হয় এবং দীর্ঘ সময় তিনি জেল খাটেন। এর সাথে সাথেই অবসান ঘটে ১৯৬০-এর দশকের সেই আলোড়ন সৃষ্টিকারী "রুস্তম গ্যাং"-এর।
কিন্তু বোম্বাইয়ের ক্রাইম হিস্ট্রিতে রুস্তম মোদীর গুরুত্ব কোথায়?
তিনিই ছিলেন প্রথম অপরাধী যিনি বোম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডকে শিখিয়েছিলেন যে কেবল বাহুবল বা বন্দুক দিয়ে নয় মগজ এবং স্টাইল দিয়েও অপরাধের সাম্রাজ্য চালানো যায়। পরবর্তীতে সত্তর বা আশির দশকে ডনরা যে সুট-বুট পরা দামি গাড়ি চড়া বা চোরাচালানের চতুর পদ্ধতি অবলম্বন করেছিল, তার প্রাথমিক খসড়া যেন এই রুস্তম মোদীই ১৯৬০ সালে তৈরি করে দিয়ে গিয়েছিলেন।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই ঘটনাগুলোকে কোনো সিনেমার গল্পের মতো মনে হতে পারে। কিন্তু এটি ছিল বাস্তব। বোম্বাইয়ের ইতিহাসের পাতায় রুস্তম মোদীর নাম এক কুখ্যাত কিন্তু অত্যন্ত চতুর অপরাধী হিসেবে চিরকাল থেকে যাবে।
রুস্তম গ্যাং-এর এই রোমাঞ্চকর ইতিহাস নিয়ে আপনার কী মতামত? আপনি কি এই গ্যাং-এর ব্যাপারে আগে কখনো শুনেছেন? কমেন্ট করে আমাদের জানান। ব্লগটি ভালো লাগলে লাইক এবং বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। এই রকমই আরও ঐতিহাসিক অপরাধের গল্প জানতে আমাদের ফলো করুন।
দেখা হবে পরের ব্লগে। ধন্যবাদ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Your valuable feedback or questions below comment Please let me know. Thank you.