১৯১১ – নতুন রাজধানী স্থাপনের মহাকাব্যিক ইতিহাস।

নমস্কার বন্ধুরা। আজ থেকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে, ১৯১১ সালের ১২ই ডিসেম্বর। দিল্লির তীব্র শীতের সকালে একটি ঘোষণা পুরো ভারতীয় উপমহাদেশের ভাগ্য এবং ভূগোল চিরতরে বদলে দিয়েছিল। এমন একটি সিদ্ধান্ত যা তৎকালীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় গোপন বিষয়গুলোর একটি ছিল।
ঘোষণাটি করেছিলেন স্বয়ং ব্রিটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জ। তিনি ঘোষণা করেন—ভারতের রাজধানী আর প্রাসাদ নগরী কলকাতা থাকছে না তা স্থানান্তরিত হচ্ছে প্রাচীন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু দিল্লিতে।
ভাবুন তো, যে কলকাতা ছিল দেড়শ বছর ধরে ব্রিটিশ ভারতের প্রাণকেন্দ্র, যে শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল পুরো এশিয়ায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বাণিজ্য ও রাজনীতি এক নিমেষে সেই শহরের মুকুট কেড়ে নেওয়া হলো কিন্তু কেন? কেন ব্রিটিশরা তাদের সাধের কলকাতা ছেড়ে দিল্লির ধুলোবালির মধ্যে নতুন রাজধানী গড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন? আজ আমরা ইতিহাসের সেই রোমাঞ্চকর অধ্যায়ে ডুব দেব।

এই রাজধানী পরিবর্তনের নেপথ্যে কোনো রাতারাতি নেওয়া সিদ্ধান্ত ছিল না। এর পেছনে ছিল গভীর রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ভয়।
১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস যখন কলকাতাকে বাংলার তথা ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ঘোষণা করেন, তখন পরিস্থিতি আলাদা ছিল। কিন্তু ১৯ শতকের শেষ এবং ২০ শতকের শুরুতে কলকাতা হয়ে ওঠে ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
প্রথম কারণ বঙ্গভঙ্গ এবং গণ-অসন্তোষ: ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন যখন বাংলাকে ভাগ করলেন তখন পুরো বাংলা জ্বলে উঠেছিল। ‘স্বদেশী আন্দোলন’ এবং ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের ডাক ব্রিটিশ অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দেয়।
দ্বিতীয় কারণ সশস্ত্র বিপ্লবের উত্থান: কলকাতার আনাচে-কানাচে গড়ে উঠছিল অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তরের মতো বিপ্লবী সংগঠন। ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকী, কানাইলাল দত্তদের মতো তরুণ বিপ্লবীদের ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র কার্যকলাপ ইংরেজ শাসকদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ স্বয়ং কলকাতায় নিজেকে নিরাপদ মনে করছিলেন না।
ব্রিটিশরা বুঝতে পেরেছিল, কলকাতাকে ভারতের রাজধানী রাখা মানে জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির ওপর বসে থাকা। তাই তারা এমন এক জায়গায় যেতে চাইল যা রাজনৈতিকভাবে কিছুটা শান্ত এবং ভৌগোলিকভাবে ভারতের কেন্দ্রে অবস্থিত।

তাহলে প্রশ্ন আসে, নতুন রাজধানী হিসেবে দিল্লিকেই কেন বেছে নেওয়া হলো? বম্বে বা মাদ্রাজ কেন নয়?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে ভারতের মনস্তত্ত্বে। দিল্লি কেবল একটি শহর নয়, এটি ছিল ক্ষমতার প্রতীক। মহাভারতের ইন্দ্রপ্রস্থ থেকে শুরু করে পৃথ্বীরাজ চৌহান, সুলতানি আমল এবং মুঘল সাম্রাজ্য—যিনিই ভারতকে শাসন করতে চেয়েছেন, তিনি দিল্লিকে নিজের কেন্দ্র বানিয়েছেন। ভারতের সাধারণ মানুষের মনে একটা ধারণা গেঁথে গিয়েছিল যে—"যিনি দিল্লির সিংহাসনে বসেন, তিনিই ভারতের ঈশ্বর।"
ব্রিটিশরা এই মনস্তত্ত্বকে কাজে লাগাতে চেয়েছিল। তারা দেখাতে চেয়েছিল, তারা কোনো বিদেশি বণিক নয়, বরং তারা মুঘলদের প্রকৃত উত্তরসূরি এবং ভারতের বৈধ শাসক। এছাড়া ভৌগোলিক দিক থেকে দিল্লি ছিল ভারতের একদম কেন্দ্রে, যেখান থেকে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতকে শাসন করা কলকাতার তুলনায় অনেক সহজ ছিল।

এবার আসা যাক ১৯১১ সালের সেই ঐতিহাসিক দিনে। রাজধানী পরিবর্তনের এই পুরো পরিকল্পনাটি এতটাই গোপনে করা হয়েছিল যে, ব্রিটিশ পার্লামেন্টের অনেক সদস্যও তা জানতেন না।
১৯১১ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ 'দিল্লি দরবার' অনুষ্ঠিত হয়। ইংল্যান্ডের রাজা পঞ্চম জর্জ এবং রানি মেরি স্বয়ং ভারতে আসেন। দিল্লির কিংসওয়ে ক্যাম্পে (বর্তমান করোনেশন পার্ক) লাখো মানুষের সামনে এক বিশাল দরবার বসে।
দরবারের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজার রাজ্যাভিষেক উদযাপন করা। সবাই ভাবছিল সাধারণ কিছু ঘোষণা হবে। কিন্তু দুপুরের দিকে রাজা পঞ্চম জর্জ তাঁর রাজকীয় ঘোষণায় দুটি বোমা ফাটালেন:
১. প্রথমত, তীব্র প্রতিবাদের মুখে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ করা হলো (যা বাঙালিদের শান্ত করার একটি চাল ছিল)।
২. আর দ্বিতীয়ত, ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরের চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হলো।
এই ঘোষণা শোনার পর কলকাতার ব্যবসায়ী এবং অভিজাত মহল স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে, দিল্লির ভাগ্য আকাশে নতুন সূর্য উদিত হলো। এর ঠিক তিন দিন পর, ১৫ই ডিসেম্বর, রাজা এবং রানি নতুন রাজধানীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

ঘোষণা তো হলো, কিন্তু রাজধানী বানাবে কে? দিল্লি তখনো মোঘল আমলের পুরনো শহর বা শাহজাহানাবাদেই সীমাবদ্ধ ছিল। ব্রিটিশরা চাইছিল এমন এক নতুন শহর তৈরি করতে, যা রোমান সাম্রাজ্যের মতো জাঁকজমকপূর্ণ হবে এবং যা দেখে সাধারণ মানুষ ব্রিটিশ শক্তির প্রতি নতজানু হবে।
এই বিশাল দায়িত্ব দেওয়া হলো তৎকালীন দুই বিখ্যাত স্থপতি—স্যার এডউইন লুটিয়েন্স এবং স্যার হার্বার্ট বেকার কে। তারা বেছে নিলেন দিল্লির দক্ষিণে অবস্থিত 'রাইসিনা হিলস' নামক একটি উঁচু স্থান।
শুরু হলো এক মহাকাব্যিক নির্মাণযজ্ঞ।
তৈরি হলো বিশাল 'ভাইসরয় হাউস' (যা আজ আমাদের রাষ্ট্রপতি ভবন)।
তৈরি হলো  সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিং' (নর্থ ও সাউথ ব্লক) এবং 'কাউন্সিল হাউস' (যা আমাদের পুরনো সংসদ ভবন)।
তৈরি করা হলো রাজপথ (বর্তমান কর্তব্যপথ) এবং বিশ্বযুদ্ধে শহীদ সৈনিকদের স্মরণে ইন্ডিয়া গেট।
এই শহরটি গড়তে সময় লেগেছিল দীর্ঘ ২০ বছর চার কোটি পাউন্ডের বেশি খরচ হয়েছিল সেই সময়ে। অবশেষে ১৯৩১ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি লর্ড আরউইনের আমলে এই 'নয়া দিল্লি' বা 'নিউ দিল্লি'-র আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। আজ আমরা যে দিল্লির প্রশাসনিক এলাকা দেখি স্থপতি লুটিয়েন্সের নামানুসারে তাকে এখনো 'লুটিয়েন্স দিল্লি' বলা হয়।
১৯১১ সালের এই সিদ্ধান্তের ফলে কার লাভ হলো আর কার ক্ষতি?
কলকাতার জন্য এটি ছিল এক বিরাট ধাক্কা। রাতারাতি কলকাতার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব কমতে শুরু করে। বহু বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান তাদের সদর দফতর কলকাতায় রেখেও তাদের মূল নজর দিল্লির দিকে ঘুরিয়ে নেয়। তবে কলকাতার সংস্কৃতি, সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় এর কোনো প্রভাব পড়েনি। কলকাতা তার নিজস্ব মহিমায় 'সাংস্কৃতিক রাজধানী' হিসেবে টিকে রইল।
আর দিল্লির কথা যদি বলি, ১৯১১ সালের সেই সিদ্ধান্তের কারণেই আজ দিল্লি ভারতের ক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দু। মোঘলদের ভাঙাচোরা শহর থেকে এটি আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এবং আধুনিক মেগাসিটিতে পরিণত হয়েছে। ভারতের ভাগ্য আজ এই দিল্লি থেকেই নির্ধারিত হয়।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ১৯১১ সালের রাজধানী স্থানান্তর কেবল এক শহর থেকে অন্য শহরে অফিস আদালত সরিয়ে নেওয়া ছিল না। এটি ছিল ব্রিটিশদের এক সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক চাল, যা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে স্তিমিত করতে চেয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রাজধানী বদলালেও ভারতীয়দের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা দমে যায়নি। দিল্লি থেকেই পরবর্তীতে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ডাক দিয়েছিলেন—"দিল্লি চলো"।
আজকের স্বাধীন ভারতের বুক চিরে সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকা নতুন দিল্লি ও পুরনো কলকাতার এই মেলবন্ধনই আমাদের বৈচিত্র্যের প্রতীক।
১৯১১ সালের এই ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে আপনার কী মতামত? কলকাতা রাজধানী থাকলেই কি ভালো হতো, নাকি দিল্লির সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল? কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। ব্লগ টি ভালো লাগলে শেয়ার করতে ভুলবেন না। দেখা হবে পরের পোস্টে। ধন্যবাদ, জয় হিন্দ।

মন্তব্যসমূহ