কলকাতার ধারাবাহিক ব্যাংক ও পোস্ট অফিস ডাকাতি – এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস।

নমস্কার। কলকাতা—যাকে আমরা 'সিটি অফ জয়' বা আনন্দের শহর বলে জানি। যে শহর তার সংস্কৃতি আড্ডা আর শান্ত পরিবেশের জন্য পরিচিত। কিন্তু আজ থেকে কয়েক দশক আগে, এই শান্ত শহরের বুকেই দানা বেঁধেছিল এক চরম অশান্তি। একের পর এক ব্যাংক আর পোস্ট অফিসে হতে শুরু করেছিল দুর্ধর্ষ সব ডাকাতি।
দিনদুপুরে, ব্যস্ততম রাস্তায়, খোদ পুলিশের নাকের ডগা দিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা লুঠ হয়ে যাচ্ছিল। এটা কোনো সিনেমার গল্প নয় এটা আমাদের এই কলকাতারই এক অন্ধকার অধ্যায়। আজকের ব্লগে আমরা ফিরে যাব সেই সময়ে যখন কলকাতার ব্যাংক আর পোস্ট অফিসগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল এবং লালবাজারের গোয়েন্দাদের রাতের ঘুম উড়ে গিয়েছিল।

কোনো অপরাধই হঠাৎ করে আকাশ থেকে পড়ে না তার পেছনে থাকে একটা নির্দিষ্ট সময়কাল এবং সামাজিক পটভূমি। ৭০, ৮০ বা ৯০-এর দশকের কলকাতার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট ছিল অত্যন্ত জটিল।
বেকারত্ব ও রাজনৈতিক অস্থিরতা: তৎকালীন সময়ে যুবসমাজের একাংশের মধ্যে তীব্র হতাশা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল।
অস্ত্রের সহজলভ্যতা: সীমান্ত পেরিয়ে বা ভিন রাজ্য থেকে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের শহরে প্রবেশ ঘটেছিল।
ডিজিটালহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা: মনে রাখবেন সে যুগে আজকের মতো সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল না ছিল না কোনো ডিজিটাল অ্যালার্ম বা বায়োমেট্রিক লকিং সিস্টেম। ক্যাশ কাউন্টারগুলো চলত খাতা-কলমে আর লোহা বা কাঠের সিন্দুকে জমা থাকত সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত টাকা। এই দুর্বলতারই সুযোগ নিয়েছিল অপরাধীরা।
এই গ্যাংগুলোর কাজ করার ধরন বা 'Modus Operandi' ছিল অত্যন্ত পেশাদার এবং মারাত্মক। তারা শুধু ডাকাতিই করত না তার আগে চলত নিখুঁত রেইকি ।
অপারেশনের প্রধান ধাপগুলো ছিল:
অস্ত্রের প্রদর্শন ও ত্রাস সৃষ্টি: পাইপগান, ওয়ান শটার বা চপারের মুখে পুরো ব্যাংক বা পোস্ট অফিসকে নিমেষে জিম্মি করে ফেলা হতো।
টেলিফোন লাইনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা: ডাকাতি শুরুর আগেই ল্যান্ডলাইন ফোনের তার কেটে দেওয়া হতো যাতে কেউ পুলিশকে খবর দিতে না পারে।
দ্রুত গতিতে অপারেশন ও চম্পট: মাত্র ৫ থেকে ৭ মিনিটের মধ্যে পুরো অপারেশন শেষ করে বাইরে অপেক্ষারত অ্যাম্বাসেডর গাড়ি বা দ্রুতগতির মোটরবাইকে চড়ে তারা ভিড়ের মধ্যে মিশে যেত।
কলকাতার শোভাবাজার, বেহালা, শিয়ালদহ বা ভবানীপুরের মতো জনবহুল এলাকার পোস্ট অফিস এবং ব্যাংকগুলোতে যখন এই ঘটনাগুলো ঘটত তখন মানুষ আতঙ্কে পাথর হয়ে যেত।

চলুন, সেই সময়ের কিছু নির্দিষ্ট ঘটনার দিকে তাকানো যাক যা খবরের কাগজের প্রথম পাতায় জায়গা করে নিয়েছিল।
ব্যস্ত সময়ে হানা: একটি নামী রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শাখায় দুপুর দুটোয় যখন ব্যাংকের কাজ শেষের মুখে তখন গ্রাহক সেজে জনা চারেক যুবক ঢুকল। কাউন্টারে গিয়ে টাকার চেক দেওয়ার বদলে তারা বের করল রিভলভার। ম্যানেজারকে বেঁধে রেখে লকার থেকে সমস্ত টাকা লুঠ করে তারা চম্পট দিল।
পোস্ট অফিসের ক্যাশ ভ্যান টার্গেট: শুধু পোস্ট অফিসের ভেতরেই নয় পোস্ট অফিসের টাকা যখন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ক্যাশ ভ্যানে করে নিয়ে যাওয়া হতো তখন রাস্তায় গাড়ি আটকে বোমাবাজি করে টাকা লুঠের ঘটনাও ঘটেছে। বোমার আওয়াজে কাঁপত কলকাতা আর ধোঁয়ার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা পালাত।
এই সমস্ত ঘটনার পেছনে কারা ছিল? কোনো স্থানীয় পকেটমার বা ছিঁচকে চোর নয় এর পেছনে ছিল আন্তঃরাজ্য অপরাধী চক্র এবং কিছু ক্ষেত্রে তৎকালীন কুখ্যাত গ্যাংস্টাররা।
জনগণের ক্ষোভ এবং সংবাদমাধ্যমের তীব্র চাপের মুখে পড়ে লালবাজার (কলকাতা পুলিশ সদর দফতর)। গোয়েন্দা বিভাগের তুখোড় অফিসারদের নিয়ে তৈরি করা হয় স্পেশাল টাস্ক ফোর্স।
সোর্স নেটওয়ার্ক সক্রিয় করা: গোয়েন্দারা তাদের পুরনো 'ইনফর্মার' বা সোর্সদের কাজে লাগান। শহরের চোরাই অস্ত্রের কারবারিদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়।
ব্যাংক ও পোস্ট অফিসের নিরাপত্তা বদল: পুলিশ প্রশাসনের তরফ থেকে ব্যাংক ও পোস্ট অফিসগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয় সশস্ত্র গার্ড রাখার এবং ক্যাশ কাউন্টারের নিরাপত্তা মজবুত করার।
এনকাউন্টার ও গ্রেফতারি: অবশেষে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে পুলিশ কলকাতার বিভিন্ন ডেরায় হানা দেয়। বেশ কিছু জায়গায় অপরাধীদের সাথে পুলিশের গুলির লড়াই বা এনকাউন্টার হয়। মূল অপরাধী গ্রেফতার করার পর ধীরে ধীরে এই ধারাবাহিক ডাকাতির চেইন ভাঙতে শুরু করে।

ধীরে ধীরে সময় বদলেছে। নব্বইয়ের দশকের সেই অন্ধকার দিন পেরিয়ে কলকাতা আজ এক নতুন যুগে পদার্পণ করেছে। আজকের ব্যাংক বা পোস্ট অফিসগুলো আর সেই কাঠের কাউন্টার বা দুর্বল সিন্দুকে বন্দি নয়।
আজ আমাদের চারপাশে রয়েছে:
২৪ ঘণ্টা সিসিটিভি (CCTV) নজরদারি।
সেন্ট্রালাইজড অ্যালার্ম সিস্টেম, যা সামান্য বিপদেও সরাসরি পুলিশ কন্ট্রোল রুমে সিগন্যাল পাঠিয়ে দেয়।
 ডিজিটাল ট্রানজেকশন, যার ফলে ব্যাংকে ফিজিক্যাল ক্যাশ রাখার পরিমাণ অনেক কমে গেছে।
কলকাতার ইতিহাসের এই ধারাবাহিক ডাকাতির ঘটনাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অপরাধীরা যতই চতুর হোক না কেন আইনের হাত থেকে পার পাওয়া অসম্ভব। আর প্রশাসন যদি সতর্ক থাকে তবে সাধারণ মানুষের আমানত সবসময় সুরক্ষিত থাকে।
আজকের এই ঐতিহাসিক রোমাঞ্চকর অধ্যায়টি আপনাদের কেমন লাগল কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। এই ধরনের আরও অপরাধ ও তদন্তের সত্য ঘটনা জানতে আমাদের ফলো করুন। ভালো থাকুন, সতর্ক থাকুন। ধন্যবাদ।

মন্তব্যসমূহ