ব্রিটিশদের তৈরি গোদাবরী ও কৃষ্ণা ডেল্টা সিস্টেম।
নমস্কার বন্ধুরা। আজ আমরা ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের এমন এক অঞ্চলের গল্প বলবো, যাকে বলা হয় ভারতের ধানের গোলা বা রাইস বোল অফ ইন্ডিয়া। কিন্তু আপনি কি জানেন, আজ থেকে প্রায় পৌনে দুশো বছর আগে এই সমৃদ্ধ অঞ্চলটি কেমন ছিল? সবুজ ফসলের বদলে সেখানে ছিল শুধুই হাহাকার, খরা এবং একের পর এক দুর্ভিক্ষ।
তাহলে কীভাবে একটি চরম অবহেলিত ও খরা পীড়িত অঞ্চল ভারতের অন্যতম উর্বর ভূমিতে পরিণত হলো? এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে উনিশ শতকের এক অবিশ্বাস্য ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ইতিহাস— ব্রিটিশ আমলে তৈরি গোদাবরী ও কৃষ্ণা ডেল্টা সেচ ব্যবস্থা। স্যার আর্থার কটন নামক এক ব্রিটিশ সামরিক প্রকৌশলীর হাত ধরে কীভাবে বদলে গিয়েছিল দক্ষিণ ভারতের ভাগ্য, এবং কেন আজও কোটি কোটি মানুষ তাকে ভগবানের মতো শ্রদ্ধা করেন? আজ আমরা এই ব্লগে বিস্তারিত আলোচনা করব ব্রিটিশদের তৈরি সেই গোদাবরী ও কৃষ্ণা ডেল্টা সিস্টেমের সম্পূর্ণ ইতিহাস ও তাদের দূরদর্শী ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গল্প। ব্লগটি শেষ পর্যন্ত অবশ্যই পড়ুন।
"ইতিহাসের পাতায় একটু পেছনে ফেরা যাক। ১৮৩০ এবং ১৮৪০ এর দশকে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত উত্তর সরকার বা বর্তমান অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলীয় জেলাগুলোর অবস্থা ছিল শোচনীয়। গোদাবরী ও কৃষ্ণা— এই দুটি ভারতের অত্যন্ত দীর্ঘ এবং বিশাল নদী হওয়া সত্ত্বেও, বর্ষাকাল ছাড়া বছরের বাকি সময় এই অঞ্চলে জলের তীব্র সংকট দেখা দিত। বর্ষায় নদীগুলো দুকূল ছাপিয়ে বন্যা ডেকে আনত, আর শীত ও গ্রীষ্মে নদী শুকিয়ে খরায় ফসল নষ্ট হতো।
সবচেয়ে বড় বিপর্যয় নেমে আসে ১৮৩২ থেকে ১৮৩৩ সালের মধ্যে, যা ইতিহাসে 'গুন্টুর দুর্ভিক্ষ' (Guntur Famine) বা 'ডোক্কালা কারুভু' নামে পরিচিত। এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে কৃষ্ণা ও গোদাবরী অঞ্চলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ অনাহারে মারা যান। গ্রামকে গ্রাম উজাড় হয়ে গিয়েছিল, মানুষ বেঁচে থাকার জন্য নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজস্ব আদায় এক ধাক্কায় প্রায় শূন্যে নেমে আসে। কোম্পানি বুঝতে পারে যে, এই অঞ্চলের নদীগুলোকে যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে এই বিশাল মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি রোখা সম্ভব নয়। ঠিক এই চরম সংকটের মুহূর্তে মাদ্রাজ সরকারের নির্দেশে দৃশ্যপটে আগমন ঘটে এক দূরদর্শী মানুষের— ক্যাপ্টেন (পরবর্তীতে স্যার) আর্থার কটন।"
১৮৪৪ সালে আর্থার কটনকে গোদাবরী অঞ্চলের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার জন্য পাঠানো হয়। তিনি পুরো অঞ্চল ঘুরে একটি বৈপ্লবিক প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, গোদাবরী নদীর বিপুল জলরাশি যা প্রতি বছর বঙ্গোপসাগরে গিয়ে বৃথা মিশে যাচ্ছে, তাকে যদি একটি বড় বাঁধ বা 'Anicut' তৈরি করে আটকে খালের মাধ্যমে কৃষিজমিতে পাঠানো যায়, তবে এই পুরো অঞ্চলের ভাগ্য বদলে যাবে।
১৮৪৭ সালে ব্রিটিশ সরকার এই প্রকল্পের অনুমোদন দেয় এবং রাজামুন্দ্রির কাছে ধবলেশ্বরমে গোদাবরী নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। কিন্তু এই কাজ মোটেও সহজ ছিল না। গোদাবরী নদী যেখানে সমুদ্রে মিশছে, সেখানে তার বিস্তার ছিল প্রায় চার মাইল বা সাড়ে ছয় কিলোমিটারেরও বেশি । নদীটি সেখানে চারটি প্রধান শাখায় বিভক্ত ছিল।
আর্থার কটন এবং তাঁর ভারতীয় সহকর্মী ও শ্রমিকদের অদম্য পরিশ্রমে ১৮৫২ সালের মধ্যে এই বিশাল অ্যানিকাট বা বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ হয়। কটন সাহেব স্থানীয় পাথর, চুন এবং মাটির এক অদ্ভুত মিশ্রণ ব্যবহার করে এই বাঁধ তৈরি করেছিলেন, যা সেই সময়ের প্রযুক্তির তুলনায় ছিল এক অবিশ্বাস্য বিস্ময়। এই ডেল্টা সিস্টেমের মাধ্যমে নদী থেকে শত শত মাইল দীর্ঘ খাল বা ক্যানেল খনন করা হয়। ফলাফল কী হয়েছিল জানেন? যে গোদাবরী অঞ্চলে মাত্র কয়েক হাজার একর জমিতে চাষ হতো, এই বাঁধ তৈরির পর প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ একর জমি সরাসরি সেচের আওতায় চলে আসে। পুরো অঞ্চলে চিরতরে দুর্ভিক্ষ দূর হয়ে যায়।"
"গোদাবরী প্রকল্পের অভূতপূর্ব সাফল্যের পর, ব্রিটিশ সরকার কৃষ্ণা নদীর অববাহিকাতেও একই ধরণের সেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৮৫২ সালেই বিজয়ওয়াড়ার কাছে (তৎকালীন বেজওয়াদা) কৃষ্ণা নদীর ওপর আরও একটি বিশাল অ্যানিকাট নির্মাণের কাজ শুরু হয়, যার নকশাও তৈরি করেছিলেন স্বয়ং স্যার আর্থার কটন এবং এর বাস্তবায়ন করেন ক্যাপ্টেন চার্লস ওর ।
১৮৫৫ সালের মধ্যে কৃষ্ণা অ্যানিকাটের মূল কাজ সম্পন্ন হয়। বিজয়ওয়াড়ার দুই পাশে দুটি পাহাড়ের মধ্যবর্তী সরু অংশে নদীকে আটকে এই বাঁধটি দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে কৃষ্ণা নদীর দুই পাড়ে— অর্থাৎ কৃষ্ণা ও গুন্টুর জেলায় এক বিশাল খালের নেটওয়ার্ক তৈরি হয়। এই কৃষ্ণা ডেল্টা সিস্টেমের মাধ্যমে আরও প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ একর অনাবাদী জমি উর্বর ফসলী জমিতে রূপান্তরিত হয়।
পরবর্তীকালে, ১৯৫০-এর দশকে এই পুরনো ব্রিটিশ অ্যানিকাটের ওপর ভিত্তি করেই বর্তমানের বিখ্যাত প্রকাশম ব্যারেজ নির্মাণ করা হয়, যা আজ আপনারা বিজয়ওয়াড়াতে দেখতে পান। এই দুটি ডেল্টা সিস্টেম বা সেচ ব্যবস্থা কেবল চাষের জলই সরবরাহ করেনি, বরং এই ক্যানেলগুলো তৎকালীন সময়ে যাতায়াত এবং পণ্য পরিবহনের অত্যন্ত সস্তা ও প্রধান মাধ্যমে পরিণত হয়েছিল।
বন্ধুরা, এবার একটু ভাবুন— ব্রিটিশদের এই বিশাল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোজেক্টগুলোর আসল প্রভাব কী হয়েছিল?
প্রথমত, অর্থনৈতিক পরিবর্তন। এই দুটি ডেল্টা সিস্টেম চালু হওয়ার পর অন্ধ্রপ্রদেশের কোস্টাল বা উপকূলীয় জেলাগুলোর অর্থনীতি রাতারাতি বদলে যায়। চাল, তুলা এবং তামাকের উৎপাদন বহুগুণ বেড়ে যায়। যে অঞ্চল ব্রিটিশদের ট্যাক্স দিতে পারছিল না, সেখান থেকে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হতে শুরু করে।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক মুক্তি। দুর্ভিক্ষের কারণে যে মানুষগুলো একসময় ক্রীতদাসের মতো জীবনযাপন করছিলেন বা এলাকা ছেড়ে পালাচ্ছিলেন, তারা নিজেদের জমিতেই স্বাবলম্বী হয়ে ওঠেন। এই সেচ ব্যবস্থার ফলেই দক্ষিণ ভারতে আধুনিক কৃষিকাজের বিপ্লব ঘটেছিল।
তবে এখানে একটি কথা মনে রাখা দরকার— ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বা ব্রিটিশ রাজ এই প্রজেক্টগুলো সম্পূর্ণ জনকল্যাণের জন্য করেনি। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের রাজস্ব বা ট্যাক্স বাড়ানো এবং কাঁচামাল সহজে ব্রিটেনে রপ্তানি করা। কিন্তু তা সত্ত্বেও, স্যার আর্থার কটনের মতো কিছু দূরদর্শী ইঞ্জিনিয়ারের কাজের ধরণ এবং ভারতীয় শ্রমিকদের হাড়ভাঙা খাটুনি এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবনে যে আশীর্বাদ এনে দিয়েছিল, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
আজও অন্ধ্রপ্রদেশের গোদাবরী ও কৃষ্ণা ডেল্টা অঞ্চলের মানুষের ঘরে ঘরে স্যার আর্থার কটনের ছবি বা মূর্তি দেখতে পাওয়া যায়। স্থানীয় মানুষ তাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে 'গোদাবরী ভাগীরথ' বলে ডাকেন। রাজামুন্দ্রিতে তাঁর নামে একটি সুন্দর মিউজিয়ামও রয়েছে। ১৮ শতকে তৈরি এই ডেল্টা সিস্টেমগুলোর ওপর ভিত্তি করেই আজকের আধুনিক অন্ধ্রপ্রদেশ এবং ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা দাঁড়িয়ে রয়েছে। ব্রিটিশদের শাসন আমলের বহু কালো অধ্যায় থাকলেও, এই কলোনিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সৃষ্টি আজও লক্ষ লক্ষ মানুষের মুখে অন্ন জোগাচ্ছে।
গোদাবরী এবং কৃষ্ণা নদীর এই ঐতিহাসিক ডেল্টা সিস্টেম সম্পর্কে আপনার কী মতামত? আপনি কি কখনো প্রকাশম ব্যারেজ বা ধবলেশ্বরম ব্যারেজ দেখতে গিয়েছেন? আমাদের কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। ব্লগটি ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন এবং এই ধরণের ঐতিহাসিক ও তথ্যসমৃদ্ধ পোস্ট পেতে ফোল করতে ভুলবেন না। দেখা হবে পরের ব্লগে। ধন্যবাদ, জয় হিন্দ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Your valuable feedback or questions below comment Please let me know. Thank you.