১৮৪৭: ভারতের প্রথম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং ব্রিটিশদের আসল উদ্দেশ্য।

নমস্কার বন্ধুরা। আজ আমরা সময়ের চাকা ঘুরিয়ে চলে যাব পৌনে দুইশত বছর পেছনে—১৮৪৭ সালে। আজ আমরা এমন এক প্রতিষ্ঠানের গল্প বলব, যা ভারতের আধুনিক প্রকৌশল বা ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার মেরুদণ্ড গড়ে দিয়েছিল। হ্যাঁ, আমি কথা বলছি আইআইটি রুরকি (IIT Roorkee)-র ব্যাপারে। তবে ১৮৪৭ সালে যখন এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, তখন এর নাম আইআইটি ছিল না। এর নাম ছিল টমাসন কলেজ অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং (Thomason College of Civil Engineering)।
এটি কেবল ভারতের নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, ব্রিটিশরা, যারা এ দেশে এসেছিল ব্যবসা করতে এবং পরবর্তীতে শাসন করতে, তারা কেন হঠাৎ করে ভারতে এত বড় একটা টেকনিক্যাল কলেজ তৈরি করতে গেল? তাদের উদ্দেশ্য কি শুধুই ভারতীয়দের শিক্ষিত করা ছিল, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে ছিল কোনো বিশাল সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ এবং মাস্টারপ্ল্যান? আজ আমরা এই ব্লগ ওপোস্টে এই রোমাঞ্চকর ইতিহাস বিস্তারিত আলোচনা করবো।

১৮৪৭ সালের এই প্রজেক্টটি বুঝতে হলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। ১৮৩০ এবং ১৮৪০-এর দশকে উত্তর ভারতে, বিশেষ করে বর্তমান উত্তরপ্রদেশ অঞ্চলে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। লাখ লাখ মানুষ খাদ্যাভাবে মারা যায়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বুঝতে পারে যে, যদি এই অঞ্চলে কৃষিকাজ সচল রাখতে হয় এবং নিজেদের রাজস্ব বা ট্যাক্স আদায় নিশ্চিত করতে হয়, তবে জলের সুব্যবস্থা করতেই হবে।
আর এই ভাবনা থেকেই শুরু হয় ইতিহাসের অন্যতম বিশাল এক প্রকৌশল যজ্ঞ—উচ্চ গঙ্গা খাল বা Upper Ganges Canal প্রজেক্ট।
হরিদ্বারের কাছ থেকে গঙ্গা নদীর জলকে খালের মাধ্যমে শত শত মাইল দূরে চাষের জমিতে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। এই খালের নকশা এবং তদারকির দায়িত্বে ছিলেন একজন ব্রিটিশ সামরিক প্রকৌশলী, যার নাম প্রোবি কটলি (Proby Cautley)। এই খালের কাজ যখন শুরু হলো, তখন ব্রিটিশরা একটা বিশাল সমস্যার মুখোমুখি হলো।
সমস্যাটা কী ছিল? সমস্যাটা ছিল ‘দক্ষ জনবল’ বা স্কিলড ম্যানপাওয়ারের অভাব। এত বড় একটা খাল খনন করা, তার ওপর সেতু বা অ্যাকুইডাক্ট (Aqueduct) তৈরি করার জন্য প্রচুর সংখ্যক সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, ওভারসিয়ার এবং ড্রাফটসম্যানের প্রয়োজন ছিল। ব্রিটেন থেকে এত মানুষ জাহাজে করে ভারতে আনা যেমন ব্যয়বহুল ছিল, তেমনই সময়সাপেক্ষ।
তখনকার উত্তর-পশ্চিম প্রদেশের লেফটেন্যান্ট গভর্নর জেমস টমাসন (James Thomason) একটি যুগান্তকারী প্রস্তাব দিলেন। তিনি বললেন, আমাদের যদি ইঞ্জিনিয়ার দরকার হয় তবে ব্রিটেন থেকে আনার দরকার নেই। আমরা ভারতেই ভারতের মানুষদের এবং এখানে থাকা ব্রিটিশদের ট্রেইন করার জন্য একটি কলেজ তৈরি করব। আর সেই খালের হেডকোয়ার্টার বা মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল রুরকি (Roorkee) নামক একটি ছোট গ্রাম। ব্যস, এভাবেই জন্ম হলো এই ঐতিহাসিক প্রজেক্টের।

১৮৪৭ সালের ১৯ অক্টোবর। জেমস টমাসনের প্রস্তাব পাস হলো এবং রুরকিতে অফিশিয়ালি ভারতের প্রথম ইঞ্জিনিয়ারিং ক্লাসের সূচনা হলো। প্রথম দিকে এটি খুব ছোট আকারে শুরু হয়েছিল। শুরুতে মাত্র তিনজন ছাত্র নিয়ে ক্লাস শুরু হয়, যার প্রধান ছিলেন লেফটেন্যান্ট হিলিয়াম ম্যাকলোগান (William Maclagan)।
কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে এই প্রজেক্টটি বিশাল রূপ ধারণ করে। ১৮৫৪ সালে জেমস টমাসনের মৃত্যুর পর তাঁর সম্মানার্থে এই কলেজের নাম রাখা হয় 'টমাসন কলেজ অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং'।
এই কলেজের সিলেবাস এবং পড়াশোনার মান এতটাই কঠিন ও আধুনিক ছিল যে একে বলা হতো ইউরোপের বাইরে সেরা ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট। এখানে ছাত্রদের তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হতো:
প্রথম শ্রেণি: মূলত ব্রিটিশ অফিসারদের জন্য, যারা সরাসরি রয়্যাল ইঞ্জিনিয়ার্স-এর সমমানের পদ পেতেন।
দ্বিতীয় শ্রেণি: যেখানে ইউরোপীয় এবং ভারতীয়দের ওভারসিয়ার বা পরিদর্শক পদের জন্য তৈরি করা হতো।
তৃতীয় শ্রেণি: যেখানে সম্পূর্ণ ভারতীয় ছাত্রদের স্থানীয় ভাষায় (উর্দু বা হিন্দি) সাব-ওভারসিয়ার এবং ড্রাফটসম্যান হওয়ার প্র্যাক্টিক্যাল শিক্ষা দেওয়া হতো।
তার মানে বুঝতেই পারছেন, প্রজেক্টটি কতটা সুপরিকল্পিত ছিল। তাত্ত্বিক শিক্ষার চেয়ে মাঠপর্যায়ের কাজের ওপর বেশি জোর দেওয়া হতো।

আপনারা জানলে অবাক হবেন, আইআইটি রুরকি প্রজেক্টের আসল ল্যাবরেটরি কিন্তু কোনো চার দেয়ালের ক্লাসরুম ছিল না। এর আসল ল্যাবরেটরি ছিল স্বয়ং গঙ্গা খাল প্রজেক্ট।
কলেজের ছাত্ররা সকালে ক্লাসরুমে অঙ্ক কষতেন এবং বিকেলে সরাসরি খালের কনস্ট্রাকশন সাইটে গিয়ে কাজ শিখতেন। রুরকির পাশেই রয়েছে বিখ্যাত 'সোলাানি অ্যাকুইডাক্ট' (Solani Aqueduct)। এটি ছিল সেই সময়ের একটি ইঞ্জিনিয়ারিং বিস্ময়। মাটির ওপর দিয়ে নদী বা খাল বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ইট ও চুন-সুরকি দিয়ে তৈরি বিশাল এক সেতু।
এই সোলাানি অ্যাকুইডাক্ট তৈরিতে রুরকি কলেজের ছাত্র এবং শিক্ষকরা দিনরাত কাজ করেছেন। এই প্রজেক্টের মাধ্যমেই ভারতে প্রথম আধুনিক ইটের ভাটা, আধুনিক চুন-সুরকির মিশ্রণ টেকনোলজি এবং হাইড্রোলিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিকাশ ঘটে। ১৮৫৪ সালে যখন গঙ্গা খালের উদ্বোধন করা হয়, তখন তা ছিল বিশ্বের দীর্ঘতম কৃত্রিম খাল। আর এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল ১৮৪৭ সালের সেই রুরকি প্রজেক্ট।

এবার আসি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে। ব্রিটিশরা ভারতের মাটিতে এত বড় একটা প্রজেক্ট করল, এত টাকা খরচ করে কলেজ বানাল—তারা কি সত্যিই ভারতীয়দের উন্নতি চেয়েছিল?
ইতিহাসকে যদি আমরা নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি, তবে এর উত্তর হবে: না, এটি কোনো নিঃস্বার্থ জনকল্যাণ ছিল না। এর পেছনে ছিল খাঁটি ব্রিটিশ বাণিজ্যিক ও সামরিক স্বার্থ।
প্রথমত: অর্থনৈতিক স্বার্থ। গঙ্গা খাল তৈরি না হলে উত্তর ভারত থেকে নীল, তুলা, আফিম এবং শস্যের উৎপাদন কমে যেত। আর উৎপাদন কমে গেলে ব্রিটিশ সরকারের ট্যাক্স বা রাজস্ব আদায় কমে যেত। অর্থাৎ, নিজেদের পকেট ভারী করার জন্যই তাদের এই অবকাঠামো এবং ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের প্রয়োজন ছিল।
দ্বিতীয়ত: খরচ কমানো। ব্রিটেন থেকে একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার ভারতে আনতে যে খরচ হতো, রুরকি কলেজ থেকে পাস করা একজন ভারতীয়কে তার চেয়ে এক-চতুর্থাংশ বা চার ভাগের এক ভাগ বেতনে খাটিয়ে নেওয়া যেত। একে বলা যেতে পারে কস্ট কাটিং(Cost cutting) পলিসি।
তৃতীয়ত: সামরিক নিয়ন্ত্রণ। রুরকি কলেজ থেকে পাস করা সাব-ওভারসিয়ার ও ইঞ্জিনিয়াররা পরবর্তীতে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর জন্য রাস্তা, সেনানিবাস (Cantonment) এবং রেলপথ তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন, যা ভারতের বুকে ব্রিটিশ রাজত্বকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করতে সাহায্য করেছিল।
তাই ১৮৪৭-এর এই প্রজেক্টটি ব্রিটিশদের কাছে ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ (Long-term investment) যার রিটার্ন তারা শতগুণ বেশি পেয়েছিল। 
তবে ব্রিটিশদের উদ্দেশ্য যা-ই থাক না কেন, এই প্রজেক্টটি ভারতের মাটিকে এমন কিছু দিয়ে গিয়েছিল যা পরবর্তীতে স্বাধীন ভারতের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।
১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর, এই কলেজের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়। ১৯৪৯ সালে স্বাধীন ভারতের উত্তরপ্রদেশ সরকার আইন পাস করে একে রুরকি বিশ্ববিদ্যালয় (University of Roorkee) হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং এটিই ছিল স্বাধীন ভারতের প্রথম টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি।
এরপর আসে সেই ঐতিহাসিক ক্ষণ। ২০০১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর। ভারত সরকার এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটিকে আইআইটি নেটওয়ার্কের অন্তর্ভুক্ত করে এবং এর নতুন নামকরণ হয় ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি রুরকি (IIT Roorkee)। এটি ভারতের সপ্তম আইআইটি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
১৮৪৭ সালের সেই ৩ জন ছাত্রের ছোট্ট প্রজেক্টটি আজ হাজার হাজার শিক্ষার্থীর এক বিশাল বিদ্যাপীঠ, যা আজ গ্লোবাল র‍্যাঙ্কিংয়ে ভারতের নাম উজ্জ্বল করছে।

বন্ধুরা, ১৮৪৭ সালের ব্রিটিশদের সেই রুরকি প্রজেক্টের গল্প আমাদের এটাই শেখায় যে, ইতিহাসের কিছু কিছু অধ্যায় শোষণের উদ্দেশ্যে শুরু হলেও, সময়ের সাথে সাথে তা প্রগতির আলোয় রূপান্তরিত হয়। ব্রিটিশরা হয়তো নিজেদের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার জন্য এই কলেজ তৈরি করেছিল, কিন্তু এখানকার ভারতীয় ছাত্ররা যে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন, তা তারা দেশের পুনর্গঠনে বিলিয়ে দিয়েছিলেন।
আজকের আইআইটি রুরকি কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি ভারতের আধুনিকায়নের জীবন্ত ইতিহাস।
আপনাদের কী মনে হয়? ব্রিটিশদের এই ১৮৪৭ প্রজেক্ট যদি না হতো, তবে কি ভারতের ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা আজকের এই জায়গায় পৌঁছাতে পারত? আপনাদের মতামত নিচে কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন।
ব্লগ পোষ্টটি ভালো লাগলে লাইক করুন বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন এবং এইরকম ঐতিহাসিক ও তথ্যসমৃদ্ধ ব্লগ পড়তে আমাদের ফলো করতে ভুলবেন না। দেখা হবে পরের পোস্টে ধন্যবাদ।

মন্তব্যসমূহ