চম্বলের আসল গাব্বার সিং এবং ১৯৫০-এর দশকের সন্ত্রাস।

আরে ও সাম্বা! কিতনে আদমি থে?" — ১৯৭৫ সালের 'শোলে' সিনেমার এই সংলাপ শোনেননি, এমন ভারতীয় খুঁজে পাওয়া দায়। সিনেমার গাব্বার সিংকে আমরা সবাই চিনি। কিন্তু আপনারা কি জানেন সেলুলয়েডের এই কাল্পনিক চরিত্রের পেছনে লুকিয়ে ছিল এক রক্তমাংসের বাস্তব মানুষ? যার ভয়ে ১৯৫০-এর দশকে কেঁপে উঠেছিল গোটা চম্বল উপত্যকা মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ এবং রাজস্থানের বিস্তীর্ণ অঞ্চল?
হ্যাঁ আজ আমরা কথা বলছি আসল গাব্বার সিং গুজ্জারকে নিয়ে। সিনেমার গাব্বারের চেয়েও বাস্তবের গাব্বার ছিল বহুগুণ বেশি ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর এবং কুখ্যাত। আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগে ১৯৫০-এর দশকে সে চম্বলের বুকে যে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল  তার গল্প যেকোনো থ্রিলারের চেয়েও রোমহর্ষক। চলুন আজ ইতিহাসের সেই অন্ধকার অধ্যায়ে ফিরে যাওয়া যাক।

গাব্বার সিংয়ের জন্ম হয়েছিল ১৯২৬ সালে, মধ্যপ্রদেশের ভিন্দ জেলার এক সাধারণ গুজ্জার পরিবারে। ছোটবেলায় সে কিন্তু জন্মগত অপরাধী ছিল না। তবে চম্বলের মাটি আর সেখানকার বাতাস বরাবরই কিছুটা বিদ্রোহী। ১৯৫০ সালের দিকে মাত্র ২৪-২৫ বছর বয়সে গাব্বার সিং অপরাধের দুনিয়ায় পা রাখে।
শোনা যায়, কোনো এক পারিবারিক বা জমিজমাসংক্রান্ত বিবাদের জেরে সে ঘর ছাড়ে। আর সেই সময় চম্বলে ঘর ছাড়ার একটাই মানে ছিল— 'বাগী' বা ডাকাত হয়ে যাওয়া। চম্বলের গভীর গিরিখাত বা 'বিহড়' ছিল অপরাধীদের লুকিয়ে থাকার স্বর্গরাজ্য। গাব্বার সেই বিহড়ে গিয়ে তৎকালীন এক কুখ্যাত ডাকাত দলের সঙ্গে হাত মেলায়। কিন্তু তার ভেতরের নিষ্ঠুরতা এবং নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা তাকে বেশিদিন কারো অধীনে থাকতে দেয়নি। ১৯৫৫ সালের মধ্যে সে নিজের একটি শক্তিশালী ডাকাত দল বা 'গ্যাং' তৈরি করে ফেলে। আর এখান থেকেই শুরু হয় তার আসল সন্ত্রাসের অধ্যায়।

১৯৫০ থেকে ১৯৫৯— এই এক দশক ছিল চম্বলের ইতিহাসে গাব্বার সিংয়ের রাজত্ব। তৎকালীন সময়ে ডাকাতদের একটা নিজস্ব নিয়ম বা 'কোড অব কন্ডাক্ট' থাকত। অনেকে নিজেদের রবিন হুড ভাবত গরিবদের সাহায্য করত। কিন্তু গাব্বার সিংয়ের কোনো নিয়ম ছিল না। তার একমাত্র ভাষা ছিল— চরম নিষ্ঠুরতা।

গাব্বার সিংয়ের সন্ত্রাসের কিছু ভয়ঙ্কর বৈশিষ্ট্য ছিল:
নাক কেটে দেওয়া: গাব্বার সিংয়ের সবচেয়ে প্রিয় শাস্তি ছিল মানুষের নাক কেটে নেওয়া। সে বিশ্বাস করত একজন মানুষের সম্মান তার নাকে থাকে। পুলিশকে খবর দেওয়ার সন্দেহে বা দাবি মতো টাকা না দিলে সে গ্রামের পর গ্রাম মানুষের নাক কেটে নিত। বলা হয় সে প্রায় ১১৬ জনের নাক কেটেছিল।
শিশুদের অপহরণ ও হত্যা: গাব্বার কোনো বাছবিচার করত না। সে ধনী পরিবারের শিশুদের অপহরণ করত এবং মুক্তিপণ না পেলে অত্যন্ত নির্মমভাবে তাদের হত্যা করত।
গণহত্যা: ১৯৫৬-৫৭ সালের দিকে সে গোয়ালিয়র এবং ভিন্দ অঞ্চলের বেশ কিছু গ্রামে ঢুকে নির্বিচারে সাধারণ মানুষকে গুলি করে হত্যা করে যা তৎকালীন নেহরু সরকারকেও নাড়িয়ে দিয়েছিল।
একটি ঐতিহাসিক তথ্য: গাব্বার সিং গুজ্জারের মাথার ওপর তৎকালীন সরকার ৫০,০০০ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। ১৯৫০-এর দশকে ৫০,০০০ টাকা কত বড় অঙ্ক ছিল  তা নিশ্চয়ই আপনারা আন্দাজ করতে পারছেন! আজ অব্দি ভারতের ইতিহাসে কোনো ডাকাতের ওপর এত বড় পুরস্কার খুব কমই রাখা হয়েছে।

গাব্বার সিংয়ের এই তাণ্ডব তৎকালীন মধ্যপ্রদেশ এবং উত্তরপ্রদেশ পুলিশের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু গাব্বারকে ধরা এত সহজ ছিল না কেন?
এর পেছনে প্রধান কারণ ছিল চম্বলের ভৌগোলিক অবস্থান। চম্বলের গিরিখাত বা 'খাদ' এমন এক গোলকধাঁধা, যেখানে স্থানীয় লোক ছাড়া পথ চেনা অসম্ভব। গাব্বার এই ভূপ্রকৃতিকে নিজের হাতের তালুর মতো চিনত। পুলিশ যখনই তাকে ঘেরাও করার চেষ্টা করত সে চম্বল নদী পার হয়ে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে পালিয়ে যেত।
এছাড়া তার নিষ্ঠুরতার কারণে সাধারণ মানুষ পুলিশের মুখ খুলতে ভয় পেত। কেউ মুখ খুললেই পরের দিন তার পুরো পরিবার সাফ হয়ে যেত। ফলে পুলিশ কোনো সঠিক তথ্য বা 'ইনফরমার' পাচ্ছিল না। ১৯৫৮ সাল নাগাদ গাব্বার সিং এতটাই বেপরোয়া হয়ে ওঠে যে, সে সরাসরি পুলিশ অফিসারদের হুমকি দেওয়া শুরু করে।

কিন্তু প্রদীপের নিচে অন্ধকার যেমন চিরকাল থাকে না তেমনি পাপের ঘড়াও একদিন পূর্ণ হয়। গাব্বার সিংয়ের সন্ত্রাস বন্ধ করতে মধ্যপ্রদেশ সরকার এক মাস্টারস্ট্রোক খেলে। তারা এই অভিযানের দায়িত্ব দেয় তৎকালীন সময়ের অত্যন্ত সৎ এবং সাহসী পুলিশ অফিসার আইপিএস কে.এফ. রুস্তমজী (K.F. Rustamji)-কে।
রুস্তমজী বুঝতে পেরেছিলেন প্রথাগত উপায়ে গাব্বারকে ধরা যাবে না। তিনি একটি বিশেষ কমান্ডো ফোর্স তৈরি করেন এবং চম্বলের ভেতরে গোপন ঘাঁটি গাড়েন। অবশেষে আসে সেই ঐতিহাসিক দিন— ১৩ নভেম্বর, ১৯৫৯।
গোপন সূত্রে খবর আসে গাব্বার সিং তার দলবল নিয়ে ভিন্দ জেলার জগন্নাথপুুর গ্রামের কাছে একটি পাহাড়ি এলাকায় লুকিয়ে আছে। রুস্তমজীর নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনী চারিদিক থেকে সেই এলাকা ঘিরে ফেলে। শুরু হয় ভারতের ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ এবং ভয়ঙ্কর এনকাউন্টার।
দুই পক্ষ থেকেই হাজার হাজার রাউন্ড গুলি চলে। পুলিশ বাহিনী গাব্বারের দলকে পালানোর কোনো সুযোগ দেয়নি। তুমুল লড়াইয়ের পর পুলিশের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় কুখ্যাত ডাকাত গাব্বার সিং গুজ্জার। দীর্ঘ এক দশকের সন্ত্রাসের অবসান ঘটে চম্বলের মাটিতে। গ্রামবাসীরা এতটাই স্বস্তি পেয়েছিল যে গাব্বারের মৃত্যুর পর তারা মিষ্টি বিতরণ করেছিল।

গাব্বার সিংয়ের মৃত্যুর পর পুলিশ অফিসার কে.এফ. রুস্তমজী তার ডায়েরিতে এই অভিযানের বিস্তারিত লিখেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৭০-এর দশকে যখন লেখক জুটি সলিম-জাভেদ 'শোলে' সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখছিলেন, তখন তারা চম্বলের এই বাস্তব গাব্বার সিংয়ের গল্প থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই পর্দার 'গাব্বার সিং' চরিত্রটি তৈরি করেন। যদিও সিনেমার গাব্বারের পোশাক বা স্টাইল ছিল কিছুটা কাল্পনিক, কিন্তু তার নিষ্ঠুরতা এবং চম্বলের ব্যাকগ্রাউন্ড পুরোপুরি বাস্তব গাব্বার সিং গুজ্জার থেকেই নেওয়া হয়েছিল।
ইতিহাস আমাদের শেখায়, ক্ষমতার দম্ভ আর হিংস্রতার পথ সাময়িক ভয় তৈরি করতে পারে, কিন্তু তার শেষটা সবসময়ই করুণ হয়। ১৯৫০-এর দশকের সেই ত্রাস আজ শুধু ইতিহাসের পাতায় আর সিনেমার পর্দায় বন্দি।
আপনাদের কী মনে হয়? সিনেমার গাব্বার বেশি ভয়ঙ্কর ছিল, নাকি বাস্তবের এই গাব্বার সিং গুজ্জার? কমেন্ট করে অবশ্যই জানান। ব্লগ টি ভালো লাগলে লাইক এবং শেয়ার করতে ভুলবেন না। এই রকম আরও ঐতিহাসিক ও রোমাঞ্চকর গল্প জানতে আমাদের ফলো করুন। ধন্যবাদ, দেখা হবে পরের পোস্টে।

মন্তব্যসমূহ