মানিকতলা ও মুরারিপুকুর বোমা মামলা।
উপস্থিত শ্রদ্ধেয় মণ্ডলী এবং আমার প্রিয় দেশবাসী,
আজ থেকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে, এই বাংলার আকাশ-বাতাস এক অদ্ভুত গুমোট অন্ধকারে ঢেকে গিয়েছিল। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ এদেশের মানুষের বুকে যে ক্ষত তৈরি করেছিল, তা কেবল ক্ষোভের আগুন জ্বালায়নি, জন্ম দিয়েছিল এক নতুন যুগের—অগ্নিযুগ। আজ আমি আপনাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাব ১৯০৮ সালের মে মাসের এক কালজয়ী ইতিহাসে। যে ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু ছিল কলকাতার এক বাগানবাড়ি—মুরারিপুকুর বাগানবাড়ি, আর যে মামলাটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল, তার নাম মানিকতলা বা মুরারিপুকুর বোমা মামলা।
তখনকার দিনে একটা কথা প্রচলিত ছিল—"ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যায় না।" কিন্তু বাংলার একদল তরুণ, যাঁদের চোখে ছিল স্বাধীনতার স্বপ্ন আর বুকে ছিল মৃত্যুকে জয় করার অদম্য সাহস, তাঁরা ঘোষণা করলেন—ঐ অন্যায়ের সূর্যকে আমরা রক্তিম সন্ধ্যায় ডুবিয়ে দেব। তাঁরা অহিংসার দীর্ঘ পথ ছেড়ে, 'চোখের বদলে চোখ' এবং 'রক্তের বদলে রক্ত' নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন।
প্রশ্ন জাগতে পারে, কেন এই সশস্ত্র বিপ্লবের প্রয়োজন হলো?
১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন যখন বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করলেন, তখন বাঙালি বুঝেছিল যে শুধু পিটিশন আর অনুনয়-বিনয় করে ব্রিটিশদের মন গলানো যাবে না। নরমপন্থী আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা তরুণ প্রজন্মকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। ঠিক এই সময়ে ঋষি অরবিন্দ ঘোষের অনুপ্রেরণায় এবং তাঁর ভাই বারীন্দ্রকুমার ঘোষের নেতৃত্বে একদল যুবক তৈরি হলেন।
তাঁদের লক্ষ্য কী ছিল? লক্ষ্য ছিল—সশস্ত্র অভ্যুত্থান।
"নমস্কার , এবার হবে শক্তির আরাধনা।"
বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, উল্লাসকর দত্ত, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, অবিনাশ ভট্টাচার্য—এই তরুণরা মানিকতলার ৩২ নম্বর মুরারিপুকুর রোডের বাগানবাড়িতে জড়ো হলেন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো ওটা একটা সাধারণ বাগানবাড়ি, যেখানে যুবকেরা আধ্যাত্মিক চর্চা বা চাষবাস করছেন। কিন্তু ভেতরে? ভেতরে তখন তৈরি হচ্ছিল ব্রিটিশ রাজত্ব ধ্বংস করার বিস্ফোরক! উল্লাসকর দত্তের রসায়নের জ্ঞানে সেখানে তৈরি হচ্ছিল বোমা, আর অনুশীলন সমিতির যুবকেরা নিচ্ছিলেন কঠোর শারীরিক ও মানসিক সামরিক প্রশিক্ষণ।
এই মামলার মূল সূত্রপাত কিন্তু কলকাতার মানিকতলায় নয়, হয়েছিল বিহারের মুজফফরপুরে।
কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট ডি. এইচ. কিংসফোর্ড ছিলেন এক চরম অত্যাচারী বিচারক। সামান্য অপরাধে তিনি ভারতীয় বিপ্লবীদের, এমনকি কিশোরদেরও বেত্রাঘাতের মতো নিষ্ঠুর শাস্তি দিতেন। বিপ্লবী সুশীল সেনকে চাবুক মারার আদেশ দিয়ে তিনি যুগান্তর দলের হিটলিস্টে চলে আসেন। বিপ্লবীরা সিদ্ধান্ত নেন—কিংসফোর্ডকে মরতে হবে।
ব্রিটিশ সরকার কিংসফোর্ডের প্রাণভয়ে তাঁকে বদলি করে দিল বিহারের মুজফফরপুরে। কিন্তু বিপ্লবীদের চোখ এড়ানো কি এত সহজ? দুই বীর কিশোর—১৮ বছরের ক্ষুদিরাম বসু আর ১৯ বছরের প্রফুল্ল চাকী দায়িত্ব নিলেন কিংসফোর্ডকে শাস্তি দেওয়ার।
১৯০৮ সালের ৩০শে এপ্রিল। মুজফফরপুরের অন্ধকার রাত। কিংসফোর্ডের ক্লাব থেকে ফেরার পথে তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে বোমা ছুড়লেন ক্ষুদিরাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য! সেই গাড়িতে কিংসফোর্ড ছিলেন না, ছিলেন মিস ও মিসেস কেনেডি নামের দুই ইউরোপীয় মহিলা। বোমা বিস্ফোরণে তাঁদের মৃত্যু হয়।
এরপরের ইতিহাস আমাদের সবার জানা, যা আজও আমাদের চোখে জল এনে দেয়। প্রফুল্ল চাকী পুলিশের হাতে ধরা দেওয়ার আগেই মোক্ষমা স্টেশনে নিজের রিভলভারের গুলিতে আত্মাহুতি দিলেন। আর ক্ষুদিরাম? ওয়াইনি স্টেশনে ধরা পড়লেন এবং মাত্র ১৮ বছর বয়সে হাসিমুখে ফাঁসির দড়ি গলায় পরে নিলেন।
কবি গেয়ে উঠলেন—
"একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি / হাসি হাসি পরব ফাঁসি দেখবে ভারতবাসী।"
মুজফফরপুরের এই বোমা বিস্ফোরণ ব্রিটিশ প্রশাসনকে নাড়িয়ে দিল। পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্ট সাহেব বুঝতে পারলেন, এই বোমার উৎস অন্য কোথাও। শুরু হলো চিরুনি তল্লাশি।
২রা মে, ১৯০৮ সাল। ভোররাত।
মানিকতলার মুরারিপুকুর বাগানবাড়ি যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন শত শত সশস্ত্র পুলিশ চারদিক থেকে বাড়িটি ঘিরে ফেলল। পুলিশ সেখানে তল্লাশি চালিয়ে যা পেল, তা দেখে তাদের চোখ চড়কগাছ হয়ে গেল!
মাটির তলা থেকে উদ্ধার হলো:
প্রচুর পরিমাণে বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির রাসায়নিক (পিকরিক অ্যাসিড),
রাইফেল, রিভলভার ও ডিনামাইট,
বিপ্লবী ইশতেহার এবং বোমা তৈরির গোপন ফর্মুলা।
সেখান থেকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার হলেন বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, উল্লাসকর দত্ত, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সহ বহু তরুণ বিপ্লবী। একই দিনে কলকাতার কর্লিস স্ট্রিট থেকে গ্রেপ্তার করা হলো স্বয়ং অরবিন্দ ঘোষকে। ব্রিটিশদের ধারণা ছিল, অরবিন্দই হলেন এই পুরো বিপ্লবী নেটওয়ার্কের মূল মস্তিস্ক।
সব মিলিয়ে মোট ৩৩ জন (পরবর্তীতে সংখ্যাটি বৃদ্ধি পায়) বিপ্লবীকে গ্রেপ্তার করে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে পাঠানো হলো। শুরু হলো ভারতের ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ ও নাটকীয় মামলা—আলিপুর বোমা মামলা বা মানিকতলা বোমা মামলা।
এই মামলার বিচার চলাকালীন আলিপুর জেলের ভেতরে যে ঘটনা ঘটেছিল, তা কোনো থ্রিলার সিনেমার চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়।
বিপ্লবীদের মধ্যেই একজন, নাম নরেন্দ্রনাথ গোস্বামী (নরেন গোঁসাই), সে পুলিশের অত্যাচারের মুখে বা সরকারি সুযোগ-সুবিধার লোভে 'রাজসাক্ষী' হয়ে গেল। সে যদি আদালতে দাঁড়িয়ে অরবিন্দ ঘোষ এবং বাকিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়ে দিত, তবে সবার ফাঁসি নিশ্চিত ছিল। বিপ্লবীরা জেলের ভেতরে বসেই সিদ্ধান্ত নিলেন—এই বিশ্বাসঘাতককে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না।
কিন্তু জেলের কড়া পাহারার মধ্যে অস্ত্র আসবে কোথা থেকে? ধন্য সেই বিপ্লবীদের নেটওয়ার্ক! জেলের ভেতরেই গোপনে পাচার হয়ে এল দুটি রিভলভার। দায়িত্ব নিলেন দুই নির্ভীক যোদ্ধা—কানাইলাল দত্ত এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসু।
১ সেপ্টেম্বর, ১৯০৮। জেলের হাসপাতাল ওয়ার্ডে নরেন গোঁসাইকে ডেকে এনে গুলি করে ঝাঁঝরা করে দিলেন কানাই ও সত্যেন। জেলের ভেতরেই বিশ্বাসঘাতকের শাস্তি হলো। এই ঘটনার পর কানাইলাল ও সত্যেন্দ্রনাথের ফাঁসি হয়, কিন্তু তাঁরা হাসিমুখে মৃত্যুকে বরণ করেছিলেন কারণ তাঁরা তাঁদের কমরেডদের এবং অরবিন্দ ঘোষকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন।
এই মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন তরুণ ব্যারিস্টার চিত্তরঞ্জন দাশ (দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ)। তিনি অরবিন্দ ঘোষের পক্ষে বিনা পয়সায় ওকালতি করতে দাঁড়িয়েছিলেন। আদালতে দাঁড়িয়ে চিত্তরঞ্জন দাশ যে ঐতিহাসিক সওয়াল করেছিলেন, তা আজও আইন জগতের এক অমূল্য দলিল।
তিনি ব্রিটিশ বিচারকের চোখে চোখ রেখে বলেছিলেন:
"আমার মক্কেল অরবিন্দ ঘোষের বিরুদ্ধে আপনারা যে অভিযোগ এনেছেন, তা অপ্রাসঙ্গিক। অরবিন্দ কেবল একজন মানুষ নন, তিনি হলেন দেশপ্রেমের এক দর্শন। তিনি যদি আজ আদালতে অপরাধী হন, তবে মনে রাখবেন, তিনি ইতিহাসের দরবারে নির্দোষ প্রমাণিত হবেন। কারণ তাঁর বাণী কেবল ভারতের জন্য নয়, সমগ্র মানবজাতির স্বাধীনতার বাণী।"
দীর্ঘ এক বছর ধরে চলা এই মামলায় ১২৬ জন সাক্ষী এবং ৪০০০-এর বেশি নথিপত্র পেশ করা হয়। অবশেষে ১৯০৯ সালের মে মাসে রায় ঘোষিত হলো:
প্রমাণের অভাবে অরবিন্দ ঘোষ সম্পূর্ণ খালাস পেলেন। (পরবর্তীতে তিনি পন্ডিচেরিতে চলে যান এবং আধ্যাত্মিক সাধনায় মগ্ন হন)।
বারীন্দ্রকুমার ঘোষ এবং উল্লাসকর দত্তকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় (পরবর্তীতে আপিলে তা যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হয়)।
উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমচন্দ্র দাস সহ বাকিদের আন্দামানের সেলুলার জেলে কালাপানির সাজা দেওয়া হয়।
প্রিয় সুধী,
মানিকতলা বোমা মামলা হয়তো আইনি দিক থেকে ব্রিটিশরা জিতেছিল, অনেক বিপ্লবীকে আন্দামানের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু নৈতিক দিক থেকে জয় হয়েছিল ভারতের। এই মামলা প্রমাণ করে দিয়েছিল যে, ভারতীয় যুবসমাজ আর ব্রিটিশদের লাথি-ঝাঁটা সহ্য করতে রাজি নয়। স্বাধীনতার জন্য তারা হাসিমুখে বুকের রক্ত ঢেলে দিতে পারে।
মুরারিপুকুরের সেই মাটি আজ হয়তো সাধারণ এক শহুরে কংক্রিটের নিচে ঢাকা পড়ে গেছে, কিন্তু সেই মাটির প্রতিটা ধূলিকণায় মিশে আছে বারীন্দ্রকুমারের সাহস, উল্লাসকরের মেধা, ক্ষুদিরামের আত্মত্যাগ আর ঋষি অরবিন্দের জাতীয়তাবাদী চেতনা।
আজ আমরা যে স্বাধীন ভারতের মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছি, তা কিন্তু এমনি এমনি আসেনি। এর পেছনে রয়েছে মানিকতলার বাগানবাড়ির সেই বারুদের গন্ধ, আর বিপ্লবীদের শৃঙ্খল ভাঙার গান। আজ এই ব্লগ থেকে আসুন আমরা সেইসব বীর শহিদ ও বিপ্লবীদের স্মরণ করি এবং নিজেদের মনে প্রশ্ন করি—তাঁরা যে ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন, আমরা কি সেই দেশ গড়তে পেরেছি?
আসুন সমস্বরে চিৎকার করে বলি, যাঁর ধ্বনিতে একদিন কেঁপে উঠেছিল ব্রিটিশ রাজপ্রাসাদ—
"বন্দে মাতরম্!"
"ইনকিলাব জিন্দাবাদ!"
ধন্যবাদ। জয় হিন্দ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Your valuable feedback or questions below comment Please let me know. Thank you.