​দ্য গ্রেট ত্রিকোণমিতিক জরিপ: উপমহাদেশের মানচিত্রায়নের মহাকাব্য।

নমস্কার। আজ থেকে প্রায় দুশো বছর আগে, যখন স্যাটেলাইট ছিল না, গুগল ম্যাপ ছিল না, এমনকি নিখুঁতভাবে দূরত্ব মাপার মতো আধুনিক কোনো যন্ত্রও ছিল না—তখন একদল মানুষ একটি অবিশ্বাস্য স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁরা চেয়েছিলেন সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশকে ইঞ্চি ইঞ্চি করে মেপে তার একটি নিখুঁত মানচিত্র তৈরি করতে। বিজ্ঞান, অদম্য ইচ্ছা আর চরম আত্মত্যাগের সেই মহাকাব্যিক অভিযানের নাম—The Great Trigonometrical Survey বা মহতী ত্রিকোণমিতিক জরিপ।
১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতের বিশাল ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ পায়। কিন্তু শাসন করতে গেলে, রাজস্ব আদায় করতে গেলে আর সামরিক আধিপত্য বজায় রাখতে গেলে সবার আগে যা প্রয়োজন, তা হলো একটি নিখুঁত মানচিত্র। তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলি বুঝতে পেরেছিলেন, তরবারি দিয়ে দেশ জয় করা গেলেও, বিজ্ঞান ছাড়া তা ধরে রাখা অসম্ভব। আর এই চিন্তা থেকেই ১৮০২ সালের ১০ এপ্রিল, মাদরাসের (বর্তমান চেন্নাই) সেন্ট থমাস মাউন্ট থেকে শুরু হয় মানব ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ এবং নিখুঁত বৈজ্ঞানিক অভিযান।

এই বিশাল যজ্ঞের মূল পরিকল্পনাকারী এবং প্রথম পরিচালক ছিলেন একজন ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তা ও গণিতবিদ—ব্রিগেডিয়ার-জেনারেল উইলিয়াম ল্যাম্বটন (William Lambton)। ল্যাম্বটন সাধারণ কোনো মানচিত্র তৈরি করতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক জরিপ, যা পৃথিবীর প্রকৃত আকৃতি বা 'Geodetic Shape' নির্ধারণে সাহায্য করবে।
কিন্তু কীভাবে কাজ করত এই ত্রিকোণমিতিক জরিপ। এর মূল ভিত্তি ছিল জ্যামিতির একটি সরল সূত্র—ত্রিকোণমিতি (Trigonometry)।
ধরা যাক, একটি সমতলে একটি নির্দিষ্ট দূরত্বের সরলরেখা টেনে নেওয়া হলো, একে বলা হতো 'Base Line' বা ভূমি রেখা। এবার সেই রেখার দুই প্রান্ত থেকে দূরের কোনো পাহাড়ের চূড়া বা উঁচু দুর্গের চূড়াকে লক্ষ্য করে কোণ (Angle) মাপা হতো। জ্যামিতির নিয়ম অনুযায়ী, একটি ত্রিভুজের একটি বাহুর দৈর্ঘ্য এবং দুটি কোণ জানা থাকলে, বাকি দুটি বাহুর দৈর্ঘ্য নিখুঁতভাবে হিসাব করা যায়। ল্যাম্বটন এই পদ্ধতিতেই একের পর এক কাল্পনিক ত্রিভুজের জাল বুনে পুরো ভারতকে ঢাকতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু কাজটা যতটা সহজ শোনাল, বাস্তবে তা ছিল নরকতুল্য কঠিন। ল্যাম্বটনের প্রধান অস্ত্র ছিল একটি বিশাল থিওডোলাইট (Theodolite) যন্ত্র, যার ওজন ছিল আধ টন বা প্রায় ৫০০ কেজি।বারোজন শক্তিশালী মানুষ মিলে এই যন্ত্র পাহাড়ে, জঙ্গলে, কাদায় বয়ে বেড়াতেন।
একবার ভাবুন, ১৮০২ সালের প্রযুক্তিতে, দক্ষিণ ভারতের তীব্র গরম, ম্যালেরিয়া, বাঘের আক্রমণ আর সাপের কামড় সহ্য করে ল্যাম্বটনের দল কাজ করেছিল। ল্যাম্বটন নিজে প্রায় ২০ বছর এই জরিপের নেতৃত্ব দেন এবং ১৮২৩ সালে জরিপ চলাকালীনই মধ্যপ্রদেশের হিঙ্গনঘাটে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। কিন্তু মৃত্যুর আগে তিনি ভারতের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে মধ্যভাগ পর্যন্ত মানচিত্রের মেরুদণ্ডটি তৈরি করে দিয়ে গিয়েছিলেন।

উইলিয়াম ল্যাম্বটনের মৃত্যুর পর এই মহৎ কাজের দায়িত্ব পান তাঁরই যোগ্য উত্তরসূরি—স্যার জর্জ এভারেস্ট (Sir George Everest)। ১৮২৩ থেকে ১৮৪৩ সাল পর্যন্ত তিনি এই জরিপের সুপারিন্টেন্ডেন্ট হিসেবে কাজ করেন। জর্জ এভারেস্ট ছিলেন একজন আপসহীন এবং অত্যন্ত কড়া মেজাজের মানুষ। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তিনি সামান্যতম ভুলও বরদাশ করতেন না।
জর্জ এভারেস্টের মূল লক্ষ্য ছিল ভারতের দক্ষিণ থেকে উত্তর প্রান্ত পর্যন্ত, অর্থাৎ হিমালয়ের পাদদেশ পর্যন্ত জরিপকে টেনে নিয়ে যাওয়া। একে বলা হতো 'The Great Arc'। এই কাজ করতে গিয়ে এভারেস্ট এবং তাঁর দলকে ভারতের বিশাল গাঙ্গেয় সমভূমি পার হতে হয়েছিল।
দক্ষিণ ভারতে পাহাড় ছিল, তাই উঁচু চূড়া থেকে কোণ মাপা সহজ ছিল। কিন্তু উত্তর ভারতের সমতল ভূমিতে কোনো পাহাড় ছিল না। দূর থেকে কোণ মাপার জন্য কোনো উঁচু জায়গা পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন জর্জ এভারেস্ট কী করলেন? তিনি সমভূমির বুকে বিশাল বিশাল পাথরের ওয়াচ-টাওয়ার বা পর্যবেক্ষণ টাওয়ার তৈরি করলেন, যার অনেকগুলো আজও ভারতের বিভিন্ন গ্রামে টিকে আছে।
তীব্র কুয়াশা এবং গরমের কারণে দিনের বেলা আলো বেঁকে যেত, ফলে কোণ মাপায় ভুল হতো। তাই এভারেস্টের দল রাতের বেলা কাজ শুরু করলেন। টাওয়ারের ওপর জ্বালানো হতো বিশাল ল্যাম্বটন লাইট বা নীল রঙের আলো, আর মাইলের পর মাইল দূর থেকে দূরবীনের চোখ রেখে সেই আলোর কোণ মাপা হতো।
জর্জ এভারেস্টের নিখুঁততার তাগিদ এতটাই বেশি ছিল যে, শত শত মাইল দীর্ঘ ত্রিভুজ লাইনের শেষে যখন হিসাব করা হতো, তখন ভুলের পরিমাণ হতো মাত্র কয়েক ইঞ্চি ১৮৪৩ সালে যখন এভারেস্ট অবসর নেন তখন ভারতের মানচিত্রের মূল কাঠামোটি সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

জর্জ এভারেস্টের অবসরের পর দায়িত্ব নেন অ্যান্ড্রু ভগ (Andrew Waugh)। তাঁর সময়েই এই জরিপ এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে পৌঁছায়। জরিপের দল তখন উত্তর ভারত ও নেপালের সীমান্তে, হিমালয়ের পাদদেশে। নেপাল এবং তিব্বত তখন বিদেশিদের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। তাই জরিপকারীদের দূর থেকে, প্রায় ১০০-১৫০ মাইল দূর থেকে দূরবীনের সাহায্যে হিমালয়ের চূড়াগুলোর উচ্চতা মাপতে হচ্ছিল।
তখনকার নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি পর্বতশৃঙ্গের নামকরণ করা হচ্ছিল রোমান সংখ্যায়—Peak IX, Peak XI, Peak XV ইত্যাদি। কিন্তু এই হাজার হাজার কোণের জটিল গাণিতিক হিসাব বা 'Computation' করার দায়িত্ব কার ছিল?
এখানেই প্রবেশ ঘটে একজন বাঙালি মহাজাদুকরের। তিনি রাধাকান্ত শিকদার (Radhanath Sikdar)। ১৮৩১ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে জর্জ এভারেস্টের হাত ধরে তিনি এই জরিপে 'কম্পিউটার' (তখন কম্পিউটার মানে ছিল যিনি হিসাব করেন) হিসেবে যোগ দেন। রাধাকান্ত ছিলেন একজন অসামান্য গণিতবিদ।
১৮৫২ সাল। কলকাতার সদর দপ্তরে বসে রাধাকান্ত শিকদার নেপাল সীমান্তে মাপা 'Peak XV'-এর উপাত্ত বা ডেটা বিশ্লেষণ করছিলেন। আলোর প্রতিসরণ বা Atmospheric Refraction-এর কারণে উচ্চতার যে তারতম্য হয় তা দূর করার জন্য তিনি নিজস্ব গাণিতিক সূত্র প্রয়োগ করলেন। হিসাব শেষ হতেই রাধাকান্ত স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তিনি দৌড়ে গেলেন তৎকালীন সার্ভেয়ার জেনারেল অ্যান্ড্রু ভগের ঘরে এবং উত্তেজিত হয়ে বললেন—স্যার, আমি পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গটি আবিষ্কার করে ফেলেছি।
হ্যাঁ, রাধাকান্তের হিসাবে Peak XV-এর উচ্চতা বেরিয়েছিল ২৯,০০২ ফুট। আজ আধুনিক স্যাটেলাইট দিয়ে মেপে দেখা গেছে এর উচ্চতা ২৯,০২৯ ফুট। মাত্র ২৭ ফুটের ব্যবধান, যা সেই যুগের প্রযুক্তিতে একটি অলৌকিক ঘটনা। অ্যান্ড্রু ভগ এই শৃঙ্গটির নাম তাঁর পূর্বসূরির সম্মানার্থে রাখলেন—মাউন্ট এভারেস্ট। দুর্ভাগ্যবশত, এই আবিষ্কারের পেছনে যার আসল অবদান, সেই রাধাকান্ত শিকদারের নাম ইতিহাসের পাতায় অনেকটাই আড়ালে রয়ে গেল।

প্রায় ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই 'Great Trigonometrical Survey' শুধু ভারতের মানচিত্রই তৈরি করেনি, এটি আধুনিক ভূগোলের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। ১৮৬০-এর দশকের শেষের দিকে যখন এই জরিপের মূল পর্ব শেষ হয়, ততদিনে বহু মানুষ ম্যালেরিয়া, বাঘের আক্রমণ, জঙ্গল ও পাহাড়ের প্রতিকূলতায় প্রাণ হারিয়েছেন।
এই জরিপের ফলেই মানুষ প্রথম জানতে পারে—
হিমালয়ই পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতমালা।
পৃথিবী পুরোপুরি গোল নয়, নিরক্ষীয় অঞ্চলে এটি কিছুটা স্ফীত বা চ্যাপ্টা।
এই জরিপের ডেটা ব্যবহার করেই পরবর্তীতে ভারতে রেলপথ, সড়কপথ এবং টেলিগ্রাফ লাইনের বিস্তার ঘটেছিল।
ব্রিটিশরা হয়তো এই জরিপটি শুরু করেছিল তাদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে, ভারতকে শাসন ও শোষণ করার জন্য। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় তাঁরা যে বৈজ্ঞানিক শৃঙ্খলা ও তথ্যের ভাণ্ডার তৈরি করে গেছেন, তা মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক অতুলনীয় সম্পদ।
আজ যখন আমরা আমাদের ফোনে এক ক্লিকে গুগল ম্যাপ খুলে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গার দূরত্ব দেখে নিই, তখন হয়তো আমরা ভাবতেও পারি না—এই নিখুঁত মানচিত্রের পেছনে লুকিয়ে আছে শত বছর আগের কিছু মানুষের রক্ত, ঘাম, জ্যামিতির জটিল সূত্র আর এক অবিশ্বাস্য আত্মত্যাগের ইতিহাস।
দ্য গ্রেট ত্রিকোণমিতিক জরিপ—কেবলমাত্র একটি মানচিত্র তৈরির গল্প নয়, এটি হলো মানুষের সীমাবদ্ধতাকে জয় করে প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনের এক অমর মহাকাব্য।
ধন্যবাদ।

মন্তব্যসমূহ