বহুমুখী নদী ও বাঁধ প্রকল্প।
নমস্কার বন্ধুরা! মানব সভ্যতার ইতিহাস যদি আমরা দেখি, তবে দেখব সমস্ত বড় বড় সভ্যতা গড়ে উঠেছিল কোনো না কোনো নদীর তীরে। নদী আমাদের জীবন, নদী আমাদের অর্থনীতি। কিন্তু এই নদীই যখন বর্ষাকালে ভয়াবহ বন্যার রূপ নেয়, তখন সবকিছু ধ্বংস করে দেয়। আবার খরা মরসুমে সেই নদীই শুকিয়ে হাহাকার তৈরি করে।
নদীর এই রূপকে নিয়ন্ত্রণ করে কীভাবে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা যায়, সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নিয়েছে 'বহুমুখী নদী উপত্যকা প্রকল্প' বা Multipurpose River Valley Project। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু এই বাঁধগুলোকে বলেছিলেন 'আধুনিক ভারতের মন্দির' । কিন্তু কেন একে 'বহুমুখী' বলা হয়? একটা বাঁধ কি শুধুই জল আটকে রাখে, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও অনেক রহস্য? আজকের এই ব্লগে আমরা অত্যন্ত সহজ ভাষায় জানব এই বহুমুখী নদী প্রকল্পের খুঁটিনাটি, এর সুবিধা, অসুবিধা এবং ভারতের কিছু বিখ্যাত বাঁধের গল্প। চলুন শুরু করা যাক
সবার আগে বোঝা দরকার, একে আমরা 'বহুমুখী' কেন বলছি। সাধারণ একটি বাঁধ হয়তো শুধু বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য তৈরি হতে পারে। কিন্তু যখন কোনো একটি নির্দিষ্ট নদীকে কেন্দ্র করে, একটি মাত্র বাঁধ বা জলাধার নির্মাণের মাধ্যমে একই সাথে অনেকগুলো উদ্দেশ্য সাধন করা হয়, তখন তাকে বহুমুখী নদী প্রকল্প বলে।
সহজ কথায়, এক ঢিলে অনেক পাখি মারা ।আমরা নদীকে নিয়ন্ত্রণ করছি একটি উদ্দেশ্যে নয়, বরং বহু উদ্দেশ্যে। এটি আধুনিক প্রকৌশল বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক অসাধারণ নিদর্শন।"
এবার আসুন জেনে নেওয়া যাক, এই প্রকল্পগুলোর প্রধান কাজ বা উদ্দেশ্যগুলো কী কী:
বন্যা নিয়ন্ত্রণ : বর্ষাকালে নদীতে যখন অতিরিক্ত জল আসে তখন এই বাঁধগুলো সেই জলকে আটকে দেয়। ফলে নদীর নিচের দিকের এলাকাগুলো প্লাবিত হওয়া থেকে বেঁচে যায়। যেমন— দামোদর নদকে একসময় 'বাংলার দুঃখ' বলা হতো। দামোদর উপত্যকা প্রকল্প (DVC) তৈরি হওয়ার পর সেই বন্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
জলসেচ : আমাদের দেশ কৃষিপ্রধান। কিন্তু সব সময় তো আর বৃষ্টি হয় না। বাঁধের পেছনে যে বিশাল কৃত্রিম হ্রদ বা জলাধার তৈরি হয়, সেখান থেকে ক্যানেল বা খালের মাধ্যমে মাইলের পর মাইল দূরের শুকনো চাষের জমিতে জল পৌঁছে দেওয়া হয়। ফলে বছরে দুবার বা তিনবার ফসল ফলানো সম্ভব হয়।
জলবিদ্যুৎ উৎপাদন : এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাঁধের ওপর থেকে যখন তীব্র গতিতে জল নিচে ফেলা হয়, তখন সেই জলের শক্তিতে বিশাল টারবাইন ঘোরে এবং পরিবেশবান্ধব, দূষণহীন বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।
পানীয় জল সরবরাহ : আশেপাশের বড় বড় শহর এবং গ্রামগুলোতে পাইপলাইনের মাধ্যমে এই বিশুদ্ধ জল পানের জন্য সরবরাহ করা হয়।
মাছ চাষ : বাঁধের কৃত্রিম হ্রদ বা জলাধারগুলো মাছ চাষের জন্য আদর্শ জায়গা। এটি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে দারুণ ভূমিকা রাখে।
জলপথ পরিবহন ও পর্যটন : এই বিশাল জলাধারগুলোকে কেন্দ্র করে সুন্দর পর্যটন কেন্দ্র গড়ে ওঠে। বোটিং, ওয়াটার স্পোর্টস ইত্যাদির মাধ্যমে সরকারের যেমন আয় হয়, তেমনি সাধারণ মানুষের বিনোদনের জায়গাও তৈরি হয়।
বন্ধুরা, বিজ্ঞানের প্রতিটি আবিষ্কারের যেমন ভালো দিক আছে, তেমনই কিছু খারাপ দিকও থাকে। বহুমুখী নদী প্রকল্পগুলোরও কিছু অন্ধকার দিক বা সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা আমাদের এড়িয়ে গেলে চলবে না। একে বলা চলে মুদ্রার ওপিঠ।
প্রথমত, বাস্তুচ্যুতি: একটি বিশাল বাঁধ তৈরি করতে গেলে হাজার হাজার একর জমি জলের তলায় চলে যায়। ফলে সেখানকার আদিবাসী ও গ্রামবাসীদের নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যেতে হয়। পুনর্বাসনের সমস্যাটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের কথা আপনারা নিশ্চয়ই শুনেছেন।
দ্বিতীয়ত, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি : নদীকে এভাবে আটকে দিলে নদীর স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেম নষ্ট হয়। মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর অবাধ যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়। বিশাল বনাঞ্চল জলের নিচে তলিয়ে যাওয়ার কারণে প্রচুর গাছপালা ধ্বংস হয়।
তৃতীয়ত, পলি জমা : বাঁধের পেছনে বছরের পর বছর ধরে পলি জমতে জমতে জলাধারের গভীরতা কমে যায়। এর ফলে বর্ষাকালে হঠাৎ জল ছাড়লে কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি হতে পারে।
চতুর্থত, ভূমিকম্পের ঝুঁকি : কোনো কোনো ভূবিজ্ঞানীর মতে, বিশাল পরিমাণ জলের এই কৃত্রিম চাপ ভূগর্ভস্থ টেকটনিক প্লেটের ওপর প্রভাব ফেলে, যা ভূমিকম্পের কারণ হতে পারে।
তাহলে শেষ পর্যন্ত আমরা কী বুঝলাম? বহুমুখী নদী প্রকল্প কি আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ?
উত্তরটা হলো— এটি আমাদের আধুনিক জীবনের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, কিন্তু তা করতে হবে প্রকৃতির সাথে ভারসাম্য বজায় রেখে। বর্তমানে পরিবেশবিজ্ঞানীরা বড় বড় বাঁধ তৈরির চেয়ে 'ছোট ছোট চেক ড্যাম' তৈরির ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন যাতে প্রকৃতির ক্ষতি কম হয় অথচ মানুষের জলের চাহিদাও পূরণ হয়।
উন্নয়ন যেমন দরকার, তেমনই দরকার আমাদের পৃথিবী মাকে বাঁচিয়ে রাখা। টেকসই উন্নয়ন বা Sustainable Development-এর মাধ্যমেই আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর পৃথিবী রেখে যেতে পারি।
আজকের ব্লগটি আপনাদের কেমন লাগলো, বহুমুখী নদী প্রকল্প নিয়ে আপনাদের মতামত কী তা নিচে কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন আর এই ধরনের তথ্যমূলক ব্লগপোস্ট আরও দেখতে ফলো করতে ভুলবেন না। দেখা হচ্ছে পরের ব্লগে। ধন্যবাদ জয় হিন্দ!
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Your valuable feedback or questions below comment Please let me know. Thank you.