দ্য ডায়াটলভ পাস ট্র্যাজেডি: উরাল পর্বতের সেই রাতে আসলে কী ঘটেছিল?
দ্য ডায়াটলভ পাস ট্র্যাজেডি: উরাল পর্বতের সেই রাতে আসলে কী ঘটেছিল?
১৯৫৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। সোভিয়েত ইউনিয়নের উরাল পর্বতের এক দুর্গম বরফাবৃত চূড়া ‘খোলাত সিয়াখল’ (যার অর্থ 'মৃতদের পাহাড়')। সেখানে রাত কাটাতে তাঁবু খাটিয়েছিলেন ৯ জন অভিজ্ঞ রুশ পর্বতারোহী, যাদের নেতৃত্বে ছিলেন ইগর ডায়াটলভ। কিন্তু সেই রাতই তাদের জীবনের শেষ রাত হয়ে দাঁড়ায়। চার দশক পরও ‘ডায়াটলভ পাস ট্র্যাজেডি’ ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় ও গা ছমছমে অধ্যায় হিসেবে পরিচিত।
কী ঘটেছিল সেই রাতে?
নির্ধারিত সময়ে দলটি ফিরে না আসায় উদ্ধারকারী দল পাঠানো হয়। তারা গিয়ে যা দেখেন, তা ছিল কল্পনাতীত ও ভয়ানক।
পর্বতারোহীদের তাঁবুটি ভেতর থেকে ছুরি দিয়ে কেটে তারা তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে এসেছিলেন।
মাইনাস ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যেও তাদের মরদেহে পর্যাপ্ত পোশাক ছিল না; কারও পায়ে জুতো ছিল না, কেউ ছিলেন স্রেফ অন্তর্বাস পরা।
বেশ কয়েকজন মারা গিয়েছিলেন হাইপোথার্মিয়ায় (অতিরিক্ত ঠান্ডায়)। কিন্তু বাকিদের মৃত্যুর কারণ ছিল আরও ভয়ানক। তিনজনের শরীরে প্রচণ্ড অভ্যন্তরীণ আঘাত ছিল, যেন কোনো গাড়ি এসে তাদের ধাক্কা দিয়েছে, অথচ বাইরে কোনো ক্ষত ছিল না। একজনের জিব এবং চোখ উপড়ানো ছিল।
রহস্যের জাল এবং প্রচলিত তত্ত্ব
তৎকালীন সোভিয়েত প্রশাসন তদন্ত শেষ করে জানায়, কোনো এক "অজানা প্রাকৃতিক শক্তি"র কারণে এই মৃত্যু ঘটেছে। এরপরই ডালপালা মেলে নানা তত্ত্বের:
ভিনগ্রহের প্রাণী বা ইয়েতি:
অনেকের ধারণা, এলিয়েন বা স্থানীয়দের লোককথার ‘ইয়েতি’ তাদের আক্রমণ করেছিল।
গোপন সামরিক পরীক্ষা:
সোভিয়েত বাহিনীর কোনো গোপন ক্ষেপণাস্ত্র বা অস্ত্রের পরীক্ষার ধাক্কায় তারা মারা যান। ঘটনাস্থলের কাছাকাছি কিছু অদ্ভুত আলোকপিণ্ড দেখা যাওয়ার দাবি এই তত্ত্বকে জোরালো করে।
আধুনিক বিজ্ঞান কী বলে?
২০২১ সালে সুইজারল্যান্ডের একদল বিজ্ঞানী এবং গবেষক কম্পিউটেশনাল সিমুলেশনের মাধ্যমে এই রহস্যের একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন। তাদের মতে, এটি ছিল একটি 'স্ল্যাব অ্যাভালাঞ্চ' (Slab Avalanche) বা বরফ ধস।
পর্বতারোহীরা ঢালু জায়গায় তাঁবু গাড়ার জন্য বরফের যে অংশটি কেটেছিলেন, তার ওপর তীব্র বাতাসের কারণে অতিরিক্ত বরফ জমা হয়। মাঝরাতে হঠাৎ এক বিশাল বরফের চাঁই তাদের তাঁবুর ওপর ভেঙে পড়ে। এতে কয়েকজন মারাত্মকভাবে আহত হন। আকস্মিক এই বিপর্যয় এবং দ্বিতীয়বার ধসের ভয়ে তারা তাড়াহুড়ো করে তাঁবু কেটে বের হয়ে আসেন। তীব্র ঠান্ডা, ঝড় আর অন্ধকারের গোলকধাঁধায় পড়ে শেষ পর্যন্ত হাইপোথার্মিয়া ও গুরুতর আঘাতের কারণে তারা সবাই মারা যান। বন্য প্রাণীদের কারণে পরবর্তীতে মৃতদেহের নরম অংশ (যেমন জিব বা চোখ) নিখোঁজ হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়।
বিজ্ঞান হয়তো বরফ ধসের তত্ত্ব দিয়ে এর একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা দেয়, কিন্তু সেই কনকনে ঠাণ্ডা রাতে ৯ জন তরুণ পর্বতারোহীর মনের ভেতর যে চরম আতঙ্ক ভর করেছিল, তা আজও উরাল পর্বতের হিমেল বাতাসে এক পরম রহস্য হয়েই প্রতিধ্বনিত হয়।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Your valuable feedback or questions below comment Please let me know. Thank you.