ভারতের আত্মা অন্বেষণ (The Discovery of India)
নমস্কার, সময়টা ১৯৪২ সাল। চারদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা। আর ভারতের বুকে জ্বলছে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের আগুন। ব্রিটিশ সরকার একে একে বন্দি করছে ভারতের জাতীয় নেতাদের। এমনই এক ঝড়ো মুহূর্তে, মহারাষ্ট্রের আহমাদনগর দুর্গ কারাগারে বন্দি করা হলো এক ব্যক্তিকে। টানা তিন বছর তিনি বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন।
বন্দিদশার সেই নিঃসঙ্গ দিনগুলোতে যখন চারদিকের দেয়াল মানুষকে দমিয়ে রাখতে চায় তখন সেই ব্যক্তিটি আশ্রয় নিলেন কলম আর কালির। তিনি আর কেউ নন স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু। আর সেই অন্ধকার কুঠুরিতে বসে তিনি রচনা করলেন এমন এক মহাকাব্যিক গ্রন্থ যা কেবল একটি দেশের ইতিহাস নয়, বরং একটি সভ্যতার আত্মআবিষ্কারের দলিল। বইটির নাম—'দ্য ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া' (The Discovery of India) বা 'ভারতের খোঁজ'।
আজকের ব্লগে আমরা নেহরুর চোখ দিয়ে দেখবো আমাদের এই ভারতবর্ষকে। জানবো কেন আজকেও এই আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে এই বইটি পড়া আমাদের প্রত্যেকের জন্য জরুরি।
বইটির শুরুতে নেহরু কোনো ঐতিহাসিকের মতো শুকনো তথ্য দিয়ে শুরু করেননি। তিনি শুরু করেছেন একজন দার্শনিকের মতো একজন প্রেমিকের মতো। নেহরু ছিলেন পাশ্চাত্যের শিক্ষায় শিক্ষিত একজন আধুনিক যুক্তিবাদী মানুষ। তিনি নিজেই বইটিতে প্রশ্ন করেছেন—“ভারত কী? এর অতীত রূপটা কেমন ছিল? এটি কীভাবে তার প্রাচীন শক্তি হারিয়ে ফেলল? আজ ভারতের বর্তমান রূপটাই বা কী?”
নেহরু যখন ভারতের দিকে তাকাতেন তিনি কেবল একটি ভূখণ্ড দেখতেন না। তিনি দেখতেন হাজার হাজার বছরের এক অবিনশ্বর ঐতিহ্যকে। তিনি সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ থেকে শুরু করে মহেঞ্জোদারো হরপ্পা—সব জায়গায় ঘুরে বেরিয়েছেন ভারতের শিকড় খুঁজতে।
তিনি উপলব্ধি করলেন ভারত কোনো মৃত জাদুঘর নয়। ভারত হলো একটি প্রবহমান নদী। গ্রিস, মিশর বা রোমের মতো প্রাচীন সভ্যতাগুলো যেখানে সময়ের নিয়মে হারিয়ে গেছে বা তাদের রূপ সম্পূর্ণ বদলে গেছে সেখানে ভারত তার হাজার বছরের প্রাচীন সংস্কৃতিকে আজও বাঁচিয়ে রেখেছে। উপনিষদের দর্শন, বুদ্ধের অহিংসা, আর গীতার কর্মযোগ—এসব কিছুই ভারতের রক্তে মিশে আছে। নেহরু আমাদের মনে করিয়ে দেন ভারতকে জানতে হলে আগে তার এই আত্মিক গভীরতাকে বুঝতে হবে।
আজ আমরা যে একটি বহুল প্রচলিত বাক্য শুনি—"বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য" —জানেন কি এই শব্দগুচ্ছটি প্রথম জনপ্রিয় করেছিলেন জওহরলাল নেহরু এই বইটির মাধ্যমেই?
নেহরু ভারতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তিনি উত্তর ভারতের কাশ্মীরি, দক্ষিণের তামিল, পূর্বের বাঙালি কিংবা পশ্চিমের মারাঠি—সবার মধ্যে এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পেয়েছিলেন। তিনি লক্ষ্য করেন, বাইরে থেকে দেখতে ভারতের একেকটি অঞ্চলের ভাষা, পোশাক, খাবার আলাদা হতে পারে, কিন্তু তাদের মানসিক গঠন, তাদের মূল্যবোধ এবং তাদের জীবনবোধের গভীরে একটা সুদৃঢ় অদৃশ্য সুতো রয়েছে, যা সবাইকে এক করে রেখেছে।
এই অধ্যায়ে নেহরু ভারতের ওপর বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাব নিয়ে চমৎকার আলোচনা করেছেন। ভারত কখনো বাইরের সংস্কৃতিকে ভয় পায়নি। শক, হুন, পাঠান, মোঘল—যারাই এই দেশে এসেছে, ভারত তাদের তাড়িয়ে দেয়নি। বরং মহাসমুদ্রের মতো সবাইকে নিজের মধ্যে বিলীন করে নিয়েছে। মোঘল আমল এবং সুফি-ভক্তি আন্দোলনের মাধ্যমে যেভাবে হিন্দু ও মুসলিম সংস্কৃতির মিলন ঘটেছিল, নেহরু তাকে ভারতের সংস্কৃতির অন্যতম সেরা অধ্যায় বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, ভারতের শক্তি তার সংকীর্ণতায় নয় তার উদারতায়।
কিন্তু প্রশ্ন জাগে, যে ভারত একসময় জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন আর সম্পদে পৃথিবীর শীর্ষে ছিল, সেই ভারত কীভাবে পরাধীন হলো? কীভাবে সে তার তেজ হারিয়ে ফেলল? নেহরু এই বইতে অত্যন্ত নির্মমভাবে সেই সত্যকে উন্মোচন করেছেন।
তিনি দেখিয়েছেন, ভারত যখন তার রক্ষণশীলতার খাঁচায় বন্দি হয়ে পড়ল, যখন আমরা সমুদ্রযাত্রা নিষিদ্ধ করলাম, জাতপাতের ভেদাভেদে সমাজকে টুকরো টুকরো করে ফেললাম, এবং নতুন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির খোঁজ করা বন্ধ করে দিলাম—ঠিক তখনই ভারতের পতন শুরু হলো। ইউরোপ যখন শিল্পবিপ্লব নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, ভারত তখন তার পুরনো গৌরব নিয়ে ঘুমিয়ে ছিল।
আর এই সুযোগেই ভারতে আগমন ঘটে ব্রিটিশদের। নেহরু পরিষ্কার ভাষায় লিখেছেন, ব্রিটিশ শাসন ভারতকে কেবল অর্থনৈতিকভাবে কাঙাল করেনি, বরং মানসিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছিল। তারা ভারতের কুটির শিল্প ধ্বংস করেছে, কৃষকদের ওপর অত্যাচার করেছে এবং ভারতের নিজস্ব শিক্ষাব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলেছে। তবে নেহরু ব্রিটিশদের প্রতি ব্যক্তিগত কোনো ক্ষোভ দেখাননি তিনি ব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে একটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি একটি মহান সভ্যতাকে শোষণের চারণভূমিতে পরিণত করে।
তবে অন্ধকার যত ঘনীভূত হয়, ভোরের আলো ততটাই নিশ্চিত হয়ে ওঠে। বইটির শেষের দিকে নেহরু লিখেছেন ভারতের পুনর্জাগরণের কথা। ১৯ শতকে রাজা রামমোহন রায়, স্বামী বিবেকানন্দ, এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো মনীষীরা ভারতকে আবার তার নিজের শক্তির কথা মনে করিয়ে দেন।
আর তারপর এলেন মহাত্মা গান্ধী। নেহরু গান্ধিজির আগমনকে তুলনা করেছেন এক তীব্র আলো ও দমকা হাওয়ার সাথে। গান্ধীজি এসে ভারতের কোটি কোটি সাধারণ মানুষকে—কৃষক, শ্রমিক, মজুরদের—ভয়ের অন্ধকার থেকে টেনে বের করলেন।
নেহরু লিখেছেন, ভারতের আসল আবিষ্কার কোনো রাজপ্রাসাদে বা বইয়ের পাতায় হয়নি। ভারতের আসল আবিষ্কার হলো তার সাধারণ মানুষের মধ্যে, যারা শত বছরের দারিদ্র্য আর কষ্টের পরেও তাদের মুখের হাসি, তাদের আতিথেয়তা এবং তাদের সততা হারিয়ে ফেলেনি। নেহরু যখন দেশের কোণে কোণে নির্বাচনী প্রচারে যেতেন, তখন লাখ লাখ মানুষের ভিড় দেখে তিনি ভাবতেন—এরাই তো আসল ভারত। এদের সেবাই হলো দেশের সেবা।
বন্ধুরা, ১৯৪৬ সালে যখন 'দ্য ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া' প্রকাশিত হয় তখন তা রাতারাতি একটি ক্লাসিকে পরিণত হয়। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে, বইটির বয়স প্রায় ৮০ বছর হতে চলল। কিন্তু এর প্রাসঙ্গিকতা কি বিন্দুমাত্র কমেছে।
না, কমেনি। আজ যখন আমরা আধুনিক ভারতের নাগরিক হিসেবে নিজেদের বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করছি, তখনো আমাদের এই বইটি পড়া দরকার। কেন দরকার?
প্রথমত, আমাদের শিকড়কে জানার জন্য। আমরা কোথা থেকে এসেছি, তা না জানলে আমরা কোথায় যাব, তা ঠিক করতে পারব না।
দ্বিতীয়ত পরমতসহিষ্ণুতা শেখার জন্য। আজ যখন সারা বিশ্বে ধর্মের নামে, জাতের নামে বিভেদ বাড়ছে, তখন নেহরুর এই বই আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ভারতের আসল সৌন্দর্যই হলো তার বহুত্ববাদ বা ‘Pluralism’।
এবং তৃতীয়ত একটি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি বা 'Scientific Temper' গড়ে তোলার জন্য যার ওপর নেহরু সবসময় জোর দিতেন। অন্ধবিশ্বাস নয় যুক্তি দিয়ে ভারতকে ভালোবাসতে শিখিয়েছিলেন তিনি।
'দ্য ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া' কেবল একটি ইতিহাসের বই নয় এটি একটি প্রেমের চিঠি—একজন দেশপ্রেমিকের তাঁর মাতৃভূমির প্রতি লেখা এক অনন্ত প্রেমের চিঠি।
আজকের ব্লগটি শেষ করব নেহরুরই একটি ভাবনা দিয়ে—ভারত কোনো সুনির্দিষ্ট জ্যামিতিক রেখা নয়, ভারত হলো একটি জীবন্ত চেতনা। আসুন, আমরাও আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সেই মহান, উদার এবং প্রগতিশীল ভারতকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করি।
ব্লগটি কেমন লাগল কমেন্ট করে জানাবেন। ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। দেখা হবে পরের পোস্টে। নমস্কার, জয় হিন্দ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Your valuable feedback or questions below comment Please let me know. Thank you.