তিহার জেল থেকে চার্লস শোভরাজের পলায়ন ইতিহাসের সবচেয়ে চতুর জেলব্রেক।

নমস্কার বন্ধুরা। আজ আপনাদের এমন এক অবিশ্বাস্য সত্য ঘটনা শোনাব যা শুনলে কোনো হলিউড বা বলিউড ক্রাইম থ্রিলারের চিত্রনাট্যও নস্যি মনে হবে।
কল্পনা করুন একটি দেশের সবচেয়ে সুরক্ষিত জেল—যেখানে রয়েছে সিসিটিভি, সশস্ত্র প্রহরী, আর একের পর এক লোহার দরজা। আর সেই জেলের ভেতর বসেই একজন কয়েদি জেলের সমস্ত রক্ষী এমনকি খোদ জেলারকেও মাদক খাইয়ে অচেতন করে দিল তারপর প্রধান ফটক দিয়ে হেঁটে রাজকীয় কায়দায় পালিয়ে গেল। কোনো দেয়াল টপকানো নয় কোনো সুড়ঙ্গ খোঁড়া নয়—সরাসরি সদর দরজা দিয়ে।
হ্যাঁ, আমি কথা বলছি ১৯৮৬ সালের ১৬ই মার্চের সেই কুখ্যাত ঘটনার। স্থান দিল্লির তিহার জেল। আর মূল খলনায়ক। আন্তর্জাতিক অপরাধ দুনিয়ার অন্যতম চতুর, সম্মোহনী শক্তির অধিকারী এবং নিষ্ঠুর সিরিয়াল কিলার—চার্লস শোভরাজ যাকে দুনিয়া চেনে 'দ্য সার্পেন্ট' বা 'সাপ' নামে। আজ আমরা জানবো কীভাবে চার্লস শোভরাজ তিহার জেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইতিহাসের অন্যতম দুঃসাহসিক জেলব্রেক ঘটিয়েছিল।

ঘটনার গভীরে যাওয়ার আগে আমাদের একটু জেনে নেওয়া দরকার  এই চার্লস শোভরাজ আসলে কে ছিল। কেন তাকে 'দ্য সার্পেন্ট' বলা হতো।
চার্লসের জন্ম ভিয়েতনামে, কিন্তু সে ছিল ফরাসি নাগরিক। ৭০-এর দশকে থাইল্যান্ড, নেপাল, ভারতসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সে চারজন বিদেশি পর্যটককে নৃশংসভাবে খুন করে। তার খুনের ধরন ছিল অদ্ভুত—সে প্রথমে পর্যটকদের সাথে বন্ধুত্ব করতো তাদের মাদক খাইয়ে অচেতন করতো এবং তারপর তাদের হত্যা করে পাসপোর্ট ও টাকা চুরি করতো। সে এতটাই চতুর ছিল যে বারবার পুলিশের হাত থেকে পিছলে বেরিয়ে যেত ঠিক যেমন একটা সাপ হাত থেকে ফস্কে যায়। আর এই কারণেই তার নাম হয় 'দ্য সার্পেন্ট'।
১৯৭৬ সালে ভারতে কয়েকজন ফরাসি পর্যটককে বিষ খাইয়ে মারার চেষ্টার অপরাধে সে ধরা পড়ে এবং তাকে দিল্লির তিহার জেলে পাঠানো হয়। আদালত তাকে ১২ বছরের কারাদণ্ড দেয়। কিন্তু জেলের ভেতরে গিয়েও চার্লস তার চতুর খেলা বন্ধ করেনি।

তিহার জেল ভারতের অন্যতম হাই-সিকিউরিটি জেল। কিন্তু চার্লস শোভরাজ সেখানে কয়েদি হিসেবে নয় যেন জামাই আদরে থাকতে শুরু করল।কীভাবে? তার আসল অস্ত্র ছিল টাকা এবং তার সম্মোহনী ব্যক্তিত্ব।
জেলে ঢোকার পর থেকেই সে জেলের রক্ষী ডাক্তার এবং বড় কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়া শুরু করে। দামি ব্র্যান্ডের সিগারেট মদ আর কাড়ি কাড়ি টাকার লোভে জেলের রক্ষীরা চার্লসের গোলামে পরিণত হয়েছিল।
আপনারা শুনলে অবাক হবেন, তিহার জেলের ভেতর চার্লসের জন্য আলাদা একটি রুমের ব্যবস্থা ছিল। সেখানে ছিল টেলিভিশন, টাইপরাইটার, আর দেশ-বিদেশের দামি বইয়ের লাইব্রেরি। এমনকি সে জেলের ভেতর থেকেই ইন্টারন্যাশনাল কল করতে পারতো। রক্ষীরা তাকে ডিউটি অফিসারদের ঘরে এসে বসার অনুমতি দিত। সংক্ষেপে বলতে গেলে, জেলের চাবি রক্ষীদের কাছে থাকলেও এই জেলটা আসলে চালাতো চার্লস শোভরাজ নিজে।

এবার আসি ১৯৮৬ সালের সেই ঐতিহাসিক ১৬ই মার্চ, রবিবারের কথায়। সেদিন ছিল চার্লসের জন্মদিনের পার্টি। হ্যাঁ, জেলের ভেতরেই সে জন্মদিনের পার্টির আয়োজন করেছিল।
চার্লস জেলের রক্ষী এবং কর্মকর্তাদের জানাল যে, তার শুভাকাঙ্ক্ষীরা বাইরে থেকে প্রচুর মিষ্টি আর ফল পাঠিয়েছে। সে জেলের সবাইকে সেই মিষ্টি খাওয়াতে চায়। কিন্তু এই মিষ্টির আড়ালেই লুকিয়ে ছিল এক ভয়ঙ্কর নীল নকশা।
চার্লস আগে থেকেই জেলের বাইরে থাকা তার সহযোগী ডেভিড হলের মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে ঘুমের ওষুধ আনিয়ে রেখেছিল। সে ওই আঙুর, বরফি আর পেঁড়ার ভেতরে অত্যন্ত চতুরতার সাথে কড়া ডোজের ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেয়।
বিকেলের দিকে চার্লস তিহার জেলের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে রক্ষীদের মিষ্টি ও ফল বিতরণ শুরু করে। ডিউটিতে থাকা রক্ষী, সেন্ট্রি এবং গেট-কিপাররা সানন্দে সেই মিষ্টি আর আঙুর খেতে শুরু করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওষুধের খেল শুরু হয়। একের পর এক রক্ষী ঢলে পড়তে থাকে গভীর ঘুমে। জেলের প্রধান ফটকের রক্ষী যার কাছে চাবি ছিল সেও অজ্ঞান হয়ে মেঝের ওপর পড়ে যায়।
পুরো জেল তখন নীরব, যেন একটা শ্মশান। চার্লস ঠান্ডা মাথায় অজ্ঞান রক্ষীর পকেট থেকে চাবি নেয়। এরপর সে নিজের সাথে আরও চারজন বন্দিকে নিয়ে প্রধান ফটক খোলে। জেলের বাইরে একটি মারুতি গাড়ি আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল। চার্লস এবং তার সঙ্গীরা সেই গাড়িতে চড়ে অত্যন্ত শান্তভাবে তিহার জেল থেকে হাওয়া হয়ে যায়।

বিকেল গড়িয়ে যখন সন্ধ্যা হলো, তখন জেলের অন্যান্য বন্দি এবং বাইরের অফিসাররা বুঝতে পারলেন যে কিছু একটা মারাত্মক গড়বড় হয়েছে। জেলের ভেতরে গিয়ে তারা দেখেন—চারিদিকে রক্ষীরা অচেতন হয়ে পড়ে আছে, আর চার্লস শোভরাজের সেল ফাঁকা।
এই খবর যখন বাইরে এল তখন পুরো ভারতের রাজনীতি ও প্রশাসন কেঁপে উঠেছিল। দেশের সংসদ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। ভারতের সবচেয়ে সুরক্ষিত জেল থেকে একজন আন্তর্জাতিক সিরিয়াল কিলার এভাবে মিষ্টি খাইয়ে পালিয়ে গেল—এটা ছিল ভারতীয় পুলিশ ও প্রশাসনের গালে একটা বিরাট চপেটাঘাত।
পুরো দেশে হাই অ্যালার্ট জারি করা হলো। বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, সীমান্ত—সব জায়গায় চার্লসের ছবি সেঁটে দেওয়া হলো। কিন্তু চার্লস তখন দিল্লির সীমানা পেরিয়ে অনেক দূরে চলে গেছে।

বন্ধুরা, এই গল্পের সবচেয়ে বড় টুইস্ট কিন্তু এখানেই। আপনারা হয়তো ভাবছেন, চার্লস ভারত থেকে পালিয়ে অন্য কোনো দেশে চলে যাওয়ার জন্য জেল ভেঙেছিল।
উত্তরটা হলো—না! এখানেই চার্লসের শয়তানি বুদ্ধির চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল।
আসলে ১৯৮৬ সালে চার্লসের ভারতে ১২ বছরের জেলের মেয়াদ শেষ হতে চলেছিল। ভারত সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে জেল থেকে খালাস পাওয়া মাত্রই চার্লসকে থাইল্যান্ডের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হবে। আর থাইল্যান্ডে চার্লসের বিরুদ্ধে একাধিক খুনের মামলা ছিল যার শাস্তি ছিল সরাসরি মৃত্যুদণ্ড। চার্লস জানত, থাইল্যান্ডে গেলেই তার ফাঁসি নিশ্চিত।
তাই সে এক অদ্ভুত চাল চালল। সে ভাবল যদি সে ভারতের জেল থেকে পালায় এবং আবার ধরা পড়ে  তবে জেল ভাঙার অপরাধে ভারতের আদালতেই তার আরও কয়েক বছরের জেল হবে। ফলে তাকে আর থাইল্যান্ডে পাঠানো যাবে না! অর্থাৎ, থাইল্যান্ডের ফাঁসির দড়ি থেকে বাঁচতে সে ভারতের জেলেই আরও কিছুদিন বেশি থাকতে চেয়েছিল।
পলায়নের ঠিক ২১ দিন পর গোয়ার এক বিলাসবহুল রেস্তোরাঁয় বসে যখন চার্লস মদ খাচ্ছিল, তখন মুম্বাই পুলিশের ইন্সপেক্টর মধুসূদন জেনেন্দ্রে তাকে চিনে ফেলেন এবং গ্রেপ্তার করেন। চার্লস কোনো প্রতিরোধ করেনি। সে হাসিমুখে ধরা দিয়েছিল, কারণ তার পরিকল্পনা সফল হয়েছিল। ভারতের আদালত জেল ভাঙার অপরাধে তাকে আরও ৭ বছরের কারাদণ্ড দেয়। ফলে সে থাইল্যান্ডের প্রত্যর্পণ থেকে বেঁচে যায়।"

১৯৯৭ সালে যখন চার্লস ভারতের জেল থেকে পুরোপুরি মুক্তি পায়, ততদিনে থাইল্যান্ডে তার বিরুদ্ধে থাকা সমস্ত মামলার মেয়াদের সময়সীমা পার হয়ে গিয়েছিল। আইনি ফাঁকফোকর গলে সে ফ্রান্সে ফিরে যায় এক মুক্ত মানুষ হিসেবে।
তবে পাপ কখনো বাপকে ছাড়ে না। ২০০৩ সালে চার্লস এক অজ্ঞাত কারণে নেপালে বেড়াতে যায়। নেপাল পুলিশ তাকে পুরনো একটি খুনের মামলায় গ্রেপ্তার করে এবং নেপালের আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। দীর্ঘ ১৯ বছর নেপালের জেলে কাটানোর পর, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে, বৃদ্ধ ও অসুস্থ চার্লস শোভরাজকে ফরাসি নাগরিকত্বের কারণে মুক্তি দিয়ে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো হয়।
চার্লস শোভরাজের তিহার জেলব্রেকের এই ঘটনা আমাদের দেখায় যে অপরাধী যত চতুরই হোক না কেন আইনের জাল থেকে সে সাময়িকভাবে পালাতে পারে কিন্তু চিরকালের জন্য নয়। তবে ১৯৮৬ সালের সেই মিষ্টি খাইয়ে তিহার জেল থেকে পালানোর ঘটনাটি অপরাধ জগতের ইতিহাসে আজীবন এক নজিরবিহীন ও রোমাঞ্চকর অধ্যায় হিসেবে থেকে যাবে।
আজকের এই ঘটনাটি আপনাদের কেমন লাগল, কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। ব্লগ টি ভালো লাগলে শেয়ার করতে ভুলবেন না। দেখা হবে পরের পোস্টে নতুন কোনো রোমাঞ্চকর কাহিনীর সাথে। ধন্যবাদ।

মন্তব্যসমূহ