কঙ্গালী বিহু ভক্তি, সংযম এবং আশার আলো।

নমস্কার। অসমের সংস্কৃতি মানেই ত্রিবেনী সংগম— বোহাগ, মাঘ আর কাতি। যখনই আমরা 'বিহু' শব্দটা শুনি আমাদের চোখে ভেসে ওঠে ঢোলের আওয়াজ, পেঁপার সুর আর নাচ-গানের এক রঙিন উৎসব। কিন্তু এই তিন বিহুর মধ্যে এমন একটি বিহু আছে যেখানে কোনো ঢোলের আওয়াজ নেই নেই কোনো নাচ-গান। সেখানে আছে শুধু এক বুক আশা মাটির প্রদীপের শান্ত আলো আর এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক নীরবতা।
হ্যাঁ, আমি কথা বলছি কাতি বিহু বা কঙ্গালী বিহু সম্পর্কে। আস্বিন এবং কার্তিক মাসের সংক্রান্তিতে অর্থাৎ সাধারণত অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে এই উৎসব উদযাপিত হয়। আজ আমরা এই ব্লগের গভীরে গিয়ে জানবো, কেন এই বিহু অসমীয়া সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণস্পন্দন কেন একে 'কঙ্গালী' বলা হয় এবং এর পেছনে লুকিয়ে থাকা আসল তাৎপর্য কী।

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে 'কঙ্গালী' শব্দের অর্থ তো দরিদ্র বা অভাবগ্রস্ত। তাহলে একটা উৎসবের নাম কেন এমন হলো?
এর পেছনে রয়েছে অসমের কৃষিভিত্তিক জীবনযাত্রার এক বাস্তব চিত্র। এই সময়ে (আশ্বিন-কার্তিক মাসে) কৃষকদের খেতের ধান কেবল পাকতে শুরু করে কিন্তু তা কাটার উপযোগী হয় না। অন্যদিকে, আগের বছরের জমানো ধান বা চালের ভাণ্ডার বা 'ভঁরাল ঘর' এই সময়ে প্রায় শূন্য হয়ে আসে। কৃষকের ঘরে তখন অন্নকষ্ট বা অভাব দেখা দেয়। এই অভাব বা 'কঙ্গাল' অবস্থা থেকে এই বিহুর নাম হয়েছে কঙ্গালী বিহু। আর কার্তিক মাসে উদযাপিত হয় বলে একে বলা হয় কাতি বিহু।
তবে মনে রাখবেন এই অভাব কিন্তু হতাশার নয়। এই অভাব হলো ধৈর্যের এবং প্রতীক্ষার। কারণ আর মাত্র কয়েকটা দিন, তারপরই মাঠজুড়ে সোনালী ধানের সম্ভার কৃষকের ঘরে উঠবে।

কাতি বিহুর মূল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর সরলতার মধ্যে। এই দিন মূলত তিনটি জায়গায় প্রদীপ জ্বালানো হয় এবং প্রার্থনা করা হয়। আসুন এই আচারগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই তুলসী ভেটি
কাতি বিহুর প্রধান আকর্ষণ হলো তুলসী পূজো। অসমীয়া সংস্কৃতির প্রতিটি উঠোনে তুলসী গাছের একটি বিশেষ স্থান বা 'তুলসী ভেটি' থাকে। এই দিন তুলসী তলা খুব সুন্দর করে পরিষ্কার করে মাটি লেপে দেওয়া হয়। সন্ধ্যায় সেখানে মাটির প্রদীপ বা 'চাকি' জ্বালানো হয়। বাড়ির মহিলারা এবং শিশুরা সেখানে সমবেত হয়ে প্রার্থনা করেন। তুলসীকে 'লক্ষণী' বা লক্ষ্মী দেবী হিসেবে জ্ঞান করা হয় যাতে তিনি ঘরের অভাব দূর করে সুখ-সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনেন।
 আকাশবন্তি 
এই বিহুর আরেকটি অত্যন্ত চমৎকার এবং বিজ্ঞানসম্মত ঐতিহ্য হলো 'আকাশবন্তি'। কৃষকেরা তাদের ধানখেতে বাঁশের এক লম্বা খুঁটি তৈরি করে যার মাথায় একটি মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। একেই বলা হয় আকাশবন্তি।
 মনে করা হয়, এই আলো পূর্বপুরুষদের আত্মার স্বর্গযাত্রার পথকে আলোকিত করে।
বিজ্ঞানসম্মত কারণ কার্তিক মাসে ধানখেতে ক্ষতিকারক পোকামাকড়ের উপদ্রব বাড়ে। এই আকাশবন্তির আলো দেখে পোকাগুলো আগুনের দিকে আকৃষ্ট হয় এবং মারা পড়ে। ফলে কোনো কীটনাশক ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে ধানখেত রক্ষা পায়। আমাদের পূর্বপুরুষদের বুদ্ধিমত্তা সত্যিই প্রশংসনীয়, তাই না?
ভঁরাল ঘর এবং খেতের প্রদীপ
কৃষকেরা তাদের শূন্য 'ভঁরাল ঘর' বা শস্যাগারেও প্রদীপ জ্বালান। তারা প্রার্থনা করেন যেন খুব দ্রুত এই শূন্য ঘর ধানে ধানে ভরে ওঠে। এছাড়া পুরো ধানখেতের মাঝে মাঝে প্রদীপ জ্বালিয়ে ধানের ফলন ভালো হওয়ার প্রার্থনা করা হয়।
যেহেতু এই সময়ে ঘরে চালের অভাব থাকে, তাই বোহাগ বা মাঘ বিহুর মতো এখানে পিঠে-পলির ধুম থাকে না। কাতি বিহু অত্যন্ত সাধারণ। এই দিন সাধারণত তুলসী তলায় পূজো শেষে কাঁচা বুট (ছোলা), মুগ ডাল এবং আদা-আখের প্রসাদ বিতরণ করা হয়।
নাচ-গান নিষিদ্ধ হলেও, কাতি বিহুর নিজস্ব এক সুর আছে। তুলসী তলায় প্রদীপ জ্বালানোর সময় অসমীয়া নারীরা অত্যন্ত আবেগভরা কণ্ঠে গেয়ে ওঠেন
"তুলসী ঐ তুলসী, তোমাক মই পূজোঁ গোবিন্দর চরণে..."
এই সুরের মধ্যে কোনো চপলতা নেই আছে শুধু এক পরমাত্মার কাছে নিজেকে সমর্পণ করার আকুলতা।
আজকের যান্ত্রিক যুগে, যেখানে আমরা সুপারমার্কেট থেকে প্লাস্টিকের প্যাকেটে চাল কিনি, সেখানে কাতি বিহু আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের শিকড়ের কথা। এটি আমাদের শেখায় যে, প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্ক কতটা গভীর।
কাতি বিহু আমাদের দুটি বড় শিক্ষা দেয়
ধৈর্য ও সংযম জীবনে যখন অভাব বা কঠিন সময় আসে, তখন ভেঙে না পড়ে ঈশ্বরের ওপর ভরসা রেখে আলোর অপেক্ষা করতে হয়।
প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা আমরা যা খাচ্ছি তা কোনো ফ্যাক্টরিতে তৈরি হচ্ছে না, তা কৃষকের হাড়ভাঙা খাটুনি আর প্রকৃতির আশীর্বাদে খেত থেকে আসছে। তাই প্রকৃতির যত্ন নেওয়া আমাদের দায়িত্ব।
আজকের দিনে দাঁড়িয়েও যখন গ্রামীণ অসমে মাইলের পর মাইল ধানখেতে হাজার হাজার মাটির প্রদীপ একসঙ্গে জ্বলে ওঠে, সেই দৃশ্য দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকার যেন সেই আলোর কাছে হার মেনে নিচ্ছে।

পরিশেষে বলা যায়, কঙ্গালী বিহু কেবল একটি উৎসব নয়, এটি অসমীয়া জাতির জীবনের এক দর্শন। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে অভাবের মধ্যেও আশার আলো জ্বালিয়ে রাখতে হয়। অন্ধকার যত ঘনই হোক না কেন, ভোরের সূর্য উঠবেই— ঠিক তেমনি কাতি বিহুর এই মাটির প্রদীপের আলোই আগামী দিনে মাঘ বিহুর উরুকা আর আলোর উৎসবের পথ দেখায়।
আসুন, আমরা আমাদের এই সুন্দর ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখি, প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই এবং প্রতিটি কৃষকের মুখের হাসির জন্য প্রার্থনা করি।
আপনাদের সবাইকে কাতি বিহু বা কঙ্গালী বিহুর আন্তরিক শুভেচ্ছা। সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।
ধন্যবাদ। জয় আই অসম।

মন্তব্যসমূহ