বোহাগ বিহু অসমীয়া সংস্কৃতির প্রাণস্পন্দন।
নমস্কার। সবাইকে জানাই বোহাগ বিহু এবং অসমীয়া নববর্ষের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। "অ’ হেপাহর বোহাগ, অ’ চেনেহর বোহাগ..." অর্থাৎ, বোহাগ হলো আমাদের আকাঙ্ক্ষার, বোহাগ আমাদের ভালোবাসার।
যখন বসন্তের মাতাল হাওয়া এসে ধরণীকে ছুঁয়ে যায় যখন গাছে গাছে নতুন পাতা গজায় আর কপৌ ফুল (অর্কিড) ফুটে ওঠে, ঠিক তখনই অসমীয়া জাতির জীবনে নেমে আসে এক মহা আনন্দের জোয়ার। সেই আনন্দের নাম— বোহাগ বিহু বা রঙালি বিহু।
বিহু শুধু একটি উৎসব নয়। বিহু হলো অসমীয়া মানুষের হৃদস্পন্দন তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মেরুদণ্ড। ব্রহ্মপুত্রের পলিমাটিতে বেড়ে ওঠা এই জাতির সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং আত্মপরিচয়ের অপর নাম বিহু। আজ এই ব্লগে আমরা পড়ে দেখব সেই সবুজ প্রান্তরে, যেখানে ঢোলের আওয়াজ আর পেঁপার সুরে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে। আমরা জানব এই বোহাগ বিহুর ইতিহাস, এর সাতটি বিশেষ দিন এবং এর পেছনের গভীর সামাজিক তাৎপর্য।
বোহাগ বিহু মূলত একটি কৃষিভিত্তিক উৎসব। আসামের প্রধান জীবিকা কৃষি, আর এই কৃষিচক্রের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে বিহুর তিনটি রূপ— বোহাগ বিহু, কাতি বিহু এবং মাঘ বিহু। এর মধ্যে বোহাগ বা রঙালি বিহু হলো সবচেয়ে দীর্ঘ এবং জাঁকজমকপূর্ণ। এটি সাধারণত ইংরেজি এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে হিন্দু সৌর নববর্ষ বা 'বহাগ' মাসের পয়লা তারিখ থেকে শুরু হয়।
রঙালি শব্দের অর্থ ‘রঙ’ বা ‘আনন্দ’। শীতের জড়তা কাটিয়ে প্রকৃতি যখন নতুন রূপে সেজে ওঠে ঠিক তখনই কৃষকরা মাঠে নতুন ধান বোনার প্রস্তুতি নেয়। আর এই নতুন ফসলের আগমনী বার্তা এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানাতেই বোহাগ বিহুর আয়োজন।
এই উৎসবের কোনো ধর্মীয় গোঁড়ামি নেই। এটি কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষের নয়। হিন্দু, মুসলিম, আদিবাসী, উপজাতি— আসামের বুকে বসবাসকারী প্রতিটি মানুষ একসঙ্গে এই উৎসবে মেতে ওঠে। বিহু হলো আসামের সম্প্রীতি আর ঐক্যের সবচেয়ে বড় প্রতীক।
বোহাগ বিহু মূলত সাত দিন ধরে পালন করা হয়, যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় 'সাত বিহু'। আসুন জেনে নিই এই সাতটি দিনের বৈচিত্র্যময় রীতি নীতি সম্পর্কে
প্রথম দিন: গোরু বিহু
বোহাগ মাসের সংক্রান্তির দিনটি উৎসর্গ করা হয় ঘরের গোরু বা গবাদি পশুদের প্রতি। কৃষিজীবী সমাজে গোরু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দিন সকালে গোরুগুলোকে নদীর ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। হলুদ ও কাঁচা মেথি বাটা গায়ে মাখিয়ে তাদের স্নান করানো হয়। তারপর দীঘলতি এবং মাখলতি গাছের পাতা দিয়ে তাদের গায়ে আলতো করে আঘাত করে বলা হয়— "লাউ খা, বেগেনা খা, বছরে বছরে বাঢ়ি যা..." অর্থাৎ লাউ খাও, বেগুন খাও এবং প্রতি বছর সুস্থ-সবল হয়ে বেড়ে ওঠো। সন্ধ্যায় তাদের গোয়ালঘরে নতুন দড়ি বা 'পঘা' বাঁধা হয় এবং মশা তাড়ানোর জন্য বিশেষ ধূপ দেওয়া হয়।
বোহাগের পয়লা তারিখে হয় 'মানুহ বিহু' বা মানুষের বিহু। এই দিন সকালে সবাই স্নান করে নতুন পোশাক পরে। পরিবারের ছোটরা বড়দের আশীর্বাদ নেয়। আর এই দিনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো 'গামোছা'। অসমীয়া সংস্কৃতির প্রতীক এই হাতে বোনা কাপড়ের টুকরোটি পরিবারের তরফ থেকে প্রিয়জনদের উপহার দেওয়া হয় যাকে বলা হয় 'বিহুয়ান'। এই দিন ঘরে ঘরে তৈরি হয় পিঠে, লাড়ু, জলপান এবং দৈ-চিঁড়ে।
তৃতীয় দিন: গোসাই বিহু তৃতীয় দিনটি ঈশ্বরের প্রতি উৎসর্গীকৃত। এই দিন গ্রামের নামঘর বা উপাসনালয়গুলোতে বিশেষ প্রার্থনা ও কীর্তন করা হয়। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করা হয় যেন নতুন বছরটি সবার সুখে কাটে এবং মহামারী বা দুর্যোগ থেকে রাজ্য রক্ষা পায়।
চতুর্থ থেকে সপ্তম দিন: তাঁত বিহু, চেনেহী বিহু, রঙালি বিহু এবং চেরা বিহু
বাকি দিনগুলোতে গ্রামের মানুষ একে অপরের বাড়ি যায়, শুভেচ্ছা বিনিময় করে। গ্রামে গ্রামে বসে বিহুর আসর। কোথাও যুবকেরা দল বেঁধে 'হুচরি' গায়, আবার কোথাও মুক্ত মাঠে চলে নাচ-গান। শেষ দিনে অর্থাৎ 'চেরা বিহু'-র দিন অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বোহাগ বিহুকে বিদায় জানানো হয়, আবার এক বছরের জন্য অপেক্ষা শুরু হয়।
এবার আসা যাক বিহুর আসল আকর্ষণে— যার শব্দ শুনলেই যেকোনো অসমীয়ার পা নিজে থেকেই নাচতে শুরু করে। হ্যাঁ, আমি কথা বলছি বিহুর বাদ্যযন্ত্র এবং নাচের।
বিহু নাচ হলো অত্যন্ত গতিশীল, যৌবনদীপ্ত এবং ছন্দময় একটি নৃত্যশৈলী। যুবকেরা (যাদের 'ডেকাবোর' বলা হয়) এবং যুবতীরা ('গাভোরু') ঐতিহ্যবাহী সাজে এই নাচে অংশ নেয়। মেয়েদের পরনে থাকে সোনালী রঙের মুগা সিল্কের মেখেলা চাদর, হাতে গামখারু (এক ধরণের বালা), চুলে গোঁজা থাকে কপৌ ফুল এবং কপালে লাল টিপ।
আর এই নাচের প্রাণ হলো তার বাদ্যযন্ত্রসমূহ:
ঢোল বিহুর প্রধান বাদ্যযন্ত্র। এর তালের ওপরই পুরো নাচ নির্ভর করে।
পেঁপা মহিষের শিং দিয়ে তৈরি এই বাদ্যযন্ত্রের তীক্ষ্ণ ও মিষ্টি সুর শুনলে শরীরে এক অন্যরকম শিহরণ জাগে।
গগনা বাঁশ দিয়ে তৈরি একটি ছোট মুখের বাদ্যযন্ত্র।
তাল এবং টুকা যা গানের ছন্দ বজায় রাখতে সাহায্য করে।
বিহু গীতের কথাগুলো মূলত প্রেম, প্রকৃতি এবং গ্রামীণ জীবনের গল্প বলে। এই গানগুলোর মাধ্যমে তরুণ-তরুণীরা তাদের মনের ভালোবাসার কথা একে অপরকে প্রকাশ করে।
সময়ের সাথে সাথে বিহুর রূপ কিছুটা বদলেছে। আগে বিহু ছিল সম্পূর্ণ গ্রামীণ, যা খোলা মাঠে বা গাছের তলায় ('বহতলর বিহু') উদযাপিত হতো। আজ বিহু গ্রাম ছাড়িয়ে শহরের বড় বড় মঞ্চে বা 'বিহু মঞ্চে' এসে পৌঁছেছে। আধুনিক বাদ্যযন্ত্র, লাইট এবং হাজার হাজার দর্শকের সামনে এখন বিহুর পারফরম্যান্স হয়।
কিন্তু রূপ বদলালেও, বিহুর ভেতরের আত্মাটা কিন্তু একই রয়ে গেছে। একজন অসমীয়া পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক না কেন— সে গুয়াহাটিতে থাকুক, কলকাতায় থাকুক, বা লন্ডনে— বোহাগের ঢোলের আওয়াজ শুনলে তার মন ঠিকই আসামের মাটির দিকে ছুটে যায়। প্রযুক্তির যুগেও বিহু তরুণ প্রজন্মকে তাদের শিকড়ের সাথে জুড়ে রাখতে সাহায্য করছে। এটিই বিহুর সবচেয়ে বড় সার্থকতা।
বোহাগ বিহু কেবল একটি ঋতু পরিবর্তন বা বছরের শুরুর উৎসব নয়। এটি হলো জীবনকে ভালোবাসার উৎসব, প্রকৃতির সাথে মানুষের নিবিড় সম্পর্কের উৎসব এবং জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবাইকে বুকে টেনে নেওয়ার উৎসব। বোহাগ আমাদের শেখায় কীভাবে ভাঙন ভুলে নতুন করে জীবনকে গড়ে তুলতে হয়।
আসুন, এই বোহাগ বিহুর পবিত্র লগ্নে আমরা সবাই প্রতিজ্ঞা করি যে, আমরা আমাদের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখব, নিজেদের মধ্যে ভালোবাসা ও সম্প্রীতি বজায় রাখব এবং পৃথিবীকে আরও সুন্দর করে তুলব।
আজকের এই ব্লগটি যদি ভালো লেগে থাকে, তবে অবশ্যই বন্ধুদের সাথে শেয়ার করবেন এবং আসামের এই সুন্দর সংস্কৃতি সম্পর্কে আপনার মতামত কমেন্টে জানাবেন।
দেখা হবে পরবর্তী কোনো পোষ্টে। আরও একবার সবাইকে বোহাগ বিহুর অনেক অনেক শুভেচ্ছা।
"জয় আই অসম"
ধন্যবাদ, নমস্কার।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Your valuable feedback or questions below comment Please let me know. Thank you.