রড্ডা কোম্পানির অস্ত্র চুরি (১৯১৪)

নমস্কার বন্ধুরা। আজ থেকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে, ১৯১৪ সালের ২৬শে আগস্ট। কলকাতার ডালহৌসি স্কোয়ারের দুপুর। চারপাশ আপাতশান্ত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ফুটছে এক চরম অশান্তি। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল, যাকে ব্রিটিশ পুলিশ পরবর্তীতে বলেছিল "The greatest event in the history of revolutionary movement" বা বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘটনা।
আমরা আজ কথা বলছি রড্ডা কোম্পানির অস্ত্র চুরি নিয়ে। এটি কোনো সাধারণ চুরি ছিল না। এটি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের গালে এক সপাটে চড়, এবং সশস্ত্র বিপ্লবের ইতিহাসে এক মাস্টারস্ট্রোক।
একটু পেছনের গল্পে যাওয়া যাক। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পর বাংলার যুবসমাজ বুঝে গিয়েছিল, শুধু আবেদন-নিবেদনে স্বাধীনতা আসবে না। লাঠির বদলে চাই বুলেট, আর কথার বদলে চাই বারুদ। যুগান্তর দল, অনুশীলন সমিতির বিপ্লবীরা মরিয়া হয়ে অস্ত্র খুঁজছিলেন। কিন্তু অস্ত্র আসবে কোথা থেকে? ঠিক তখনই বিপ্লবীদের নজরে পড়ল কলকাতার বিখ্যাত বন্দুক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান— 'রড্ডা অ্যান্ড কোম্পানি'।
রড্ডা কোম্পানি বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র আমদানি করত। আর এই কোম্পানিতেই কাস্টমস ক্লিয়ারিং ক্লার্ক বা বড়বাবু হিসেবে চাকরি করতেন এক বাঙালি যুবক— শ্রীশচন্দ্র মিত্র। বিপ্লবীদের কাছে যিনি 'হাবিলদার' নামে পরিচিত ছিলেন। শ্রীশচন্দ্র মিত্র ছিলেন যুগান্তর দলের বিপ্লবী অনুকূল মুখোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
১৯১৪ সালের আগস্ট মাস। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সবে শুরু হয়েছে। ব্রিটিশ সরকার ব্যস্ত। ঠিক এই সময়ে শ্রীশচন্দ্র অনুকূলবাবুকে একটি বিস্ফোরক খবর দিলেন। তিনি জানালেন, জার্মানি থেকে রড্ডা কোম্পানির নামে ২০২টি বাক্স ভর্তি অস্ত্র আসছে। যার মধ্যে রয়েছে ২০৫টি অত্যাধুনিক মাউজার পিস্তল এবং ৫০,০০০ রাউন্ড গুলি!
আপনারা হয়তো ভাবছেন, একটা পিস্তল চুরি করা এমন কী বড় ব্যাপার? কিন্তু মনে রাখবেন, এই মাউজার পিস্তলগুলো ছিল তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে আধুনিক অস্ত্র। এগুলোকে কাঠের কুঁদো বা বাট জুড়ে দিলে অনায়াসেই ছোটখাটো রাইফেলের মতো ব্যবহার করা যেত, যার রেঞ্জ ছিল অনেক বেশি।
বিপ্লবীরা বুঝলেন, এই অস্ত্র যদি তাদের হাতে আসে, তবে বাংলার বুকে ব্রিটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া যাবে। তৈরি হলো এক দুঃসাহসিক ব্লুপ্রিন্ট। চুরির মূল দায়িত্ব নিলেন অনুকূল মুখোপাধ্যায়। তাঁর সাথে যোগ দিলেন মুক্তি সঙ্ঘের বিপিনবিহারী গাঙ্গুলী, হরিদাস দত্ত, সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী এবং ভুজঙ্গধর ধর-এর মতো অসমসাহসী তরুণরা।

দিনটি ছিল ১৯১৪ সালের ২৬শে আগস্ট, বুধবার। দুপুরবেলা।
কাস্টমস হাউজ থেকে অস্ত্র খালাস করতে গেছেন রড্ডা কোম্পানির বড়বাবু শ্রীশচন্দ্র মিত্র। অস্ত্রগুলো নিয়ে যাওয়ার জন্য কাস্টমস হাউজের বাইরে অপেক্ষা করছে রড্ডা কোম্পানির নিজস্ব ৬টি গরুর গাড়ি। কিন্তু অনুকূল মুখোপাধ্যায় সেখানে খেললেন এক মাস্টার স্ট্রোক। তিনি আগে থেকেই ৭ নম্বর গাড়ি হিসেবে আরও একটি গরুর গাড়ি সেখানে জুড়ে দিলেন।
এই ৭ নম্বর গাড়ির গাড়োয়ান সেজেছিলেন স্বয়ং বিপ্লবী হরিদাস দত্ত। তাঁর পরনে ছিল নোংরা ধুতি, গায়ে চাদর, মুখে খৈনি— চেনার উপায় নেই যে তিনি একজন শিক্ষিত বিপ্লবী যুবনেতা। আর তাঁর সাথে কুলি সেজেছিলেন আরও দুই বিপ্লবী— শ্রীশ পাল এবং খগেন্দ্রনাথ দাস।
কাস্টমস থেকে একে একে বাক্সগুলো বের হতে লাগল। শ্রীশচন্দ্র মিত্রের চাতুরিতে মোট ২০২টি বাক্সের মধ্যে ১৯২টি বাক্স আসল ৬টি গাড়িতে তোলা হলো। আর বাকি ১০টি বাক্স— যার মধ্যে ছিল ৫০টি মাউজার পিস্তল এবং ৪৬,০০০ রাউন্ড গুলি— সটান তুলে দেওয়া হলো হরিদাস দত্তর সেই ৭ নম্বর 'বেনামী' গরুর গাড়িতে!
বেলা একটা বেজে গেল। ৭টি গাড়ির convoy বা মিছিল রওনা দিল রড্ডা কোম্পানির গোডাউনের দিকে। কিন্তু মিশন তো সবে শুরু! আসল টুইস্ট এল সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ আর মিশন রোর মোড়ে এসে।
বাকি ৬টি গাড়ি যখন ডানদিকে মোড় নিয়ে রড্ডা কোম্পানির অফিসের দিকে চলে গেল, হরিডার দত্তর ৭ নম্বর গাড়িটি তখন ভিড়ের সুযোগ নিয়ে সোজা চলতে শুরু করল মলঙ্গা লেনের দিকে! ভরা দুপুরে, ব্রিটিশ পুলিশের নাকের ডগা দিয়ে, একটা আস্ত গরুর গাড়ি ভর্তি আধুনিক অস্ত্র গায়েব হয়ে গেল!
মলঙ্গা লেনে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন অনুকূল মুখোপাধ্যায় এবং সুরেশ চক্রবর্তী। লোহার বাক্সগুলো দ্রুত নামিয়ে লোহার হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে ফেলা হলো। সেখান থেকে পিস্তল আর গুলির প্যাকেটগুলো বের করে বস্তাবন্দী করা হলো।
কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ অস্ত্র লুকিয়ে রাখা তো সহজ নয়! কলকাতা তখন ব্রিটিশ পুলিশের কড়া নজরদারিতে। বিপ্লবীরা অত্যন্ত চতুরতার সাথে সেই অস্ত্রগুলো ভাগ করে দিলেন। কিছু অস্ত্র গেল খালাসীটোলার এক মদের দোকানে, কিছু গেল মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী কানু পালের গুদামে, আর একটা বড় অংশ চলে গেল ময়মনসিংহের বিপ্লবী হেমেন্দ্রকিশোর আচার্য চৌধুরীর কাছে। রাতের অন্ধকারের মধ্যেই অস্ত্রগুলো কলকাতা থেকে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়া হলো।
এদিকে তিনদিন কেটে গেছে। রড্ডা কোম্পানির কর্তারা তখনও বোঝেননি কী ঘটেছে। ২৯শে আগস্ট যখন তারা হিসাব মেলাতে বসলেন, তখন তাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। ১০টি বাক্স গায়েব! খোঁজ নিয়ে দেখা গেল বড়বাবু শ্রীশচন্দ্র মিত্রও নিখোঁজ!
ব্রিটিশ প্রশাসনের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্ট নিজে তদন্তে নামলেন। একের পর এক বিপ্লবী ডেরায় তল্লাশি শুরু হলো। কিন্তু ততক্ষণে পাখি খাঁচা ছাড়া, আর অস্ত্র বিপ্লবীদের হাতে!

বন্ধুরা, এই রড্ডা কোম্পানির অস্ত্র চুরি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। এই চুরির সুদূরপ্রসারী প্রভাব ছিল অবিশ্বাস্য।
১. বাঘা যতীনের বুড়িবালামের যুদ্ধ: ১৯১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ওড়িশার বুড়িবালামের তীরে মহান বিপ্লবী বাঘা যতীন এবং তাঁর সঙ্গীরা ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে যে ঐতিহাসিক সম্মুখ সমরে লড়েছিলেন, সেখানে তাঁদের হাতে যে মাউজার পিস্তলগুলো গর্জে উঠেছিল, সেগুলো ছিল এই রড্ডা কোম্পানি থেকে চুরি হওয়া পিস্তল।
২. রাসবিহারী বসুর সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা: ১৯১৫ সালে রাসবিহারী বসু সমগ্র উত্তর ভারত জুড়ে যে সেনা-অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেছিলেন, তার মূল ভরসাই ছিল রড্ডা কোম্পানির এই মাউজার পিস্তলগুলো।
৩. অনুশীলন ও যুগান্তরের শক্তি বৃদ্ধি: পরবর্তী প্রায় এক দশক ধরে বাংলার যত বড় বড় বিপ্লবী অ্যাকশন হয়েছে— তা সে কোনো অত্যাচারী পুলিশ অফিসারকে খতম করাই হোক বা ডেকোয়েটি— প্রায় সব জায়গাতেই এই মাউজার পিস্তল ব্যবহার করা হয়েছিল।
পুলিশ পরবর্তীতে প্রায় সব বিপ্লবীকে গ্রেপ্তার করতে পারলেও, বেশির ভাগ অস্ত্রই উদ্ধার করতে পারেনি। আর সেই বীর দেশপ্রেমিক শ্রীশচন্দ্র মিত্র, যিনি নিজের কেরিয়ার, পরিবার, জীবন বাজি রেখে এই কাজ করেছিলেন, তিনি চিরকালের জন্য হারিয়ে গেলেন। ধারণা করা হয়, পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে আসামের জঙ্গল পার হয়ে চীন যাওয়ার পথে তিনি শহীদ হন। তাঁর কোনো মৃতদেহ বা খোঁজ আর কোনোদিন পাওয়া যায়নি। তিনি রয়ে গেলেন ইতিহাসের এক মহান 'অনামা' নায়ক।
আজ আমরা স্বাধীন ভারতে বাস করছি। কিন্তু এই স্বাধীনতার পেছনে লুকিয়ে আছে এমন কত শত রোমাঞ্চকর, দুঃসাহসিক এবং আত্মত্যাগের গল্প। রড্ডা কোম্পানির অস্ত্র চুরি কোনো সাধারণ অপরাধ ছিল না, এটি ছিল দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙার জন্য যুবশক্তির এক বজ্রনির্ঘোষ। হরিদাস দত্ত, শ্রীশচন্দ্র মিত্র, অনুকূল মুখোপাধ্যায়দের মতো বীরেরা আমাদের শিখিয়েছেন যে, শত্রুর শক্তি যত বড়ই হোক না কেন, বুদ্ধি, সাহস আর একতাবদ্ধ লক্ষ্য থাকলে তাকে পরাস্ত করা সম্ভব।
আজকের এই ব্লগের মাধ্যমে আমরা সেই সমস্ত বিস্মৃতপ্রায় বিপ্লবীদের জানাই শতকোটি প্রণাম।

আপনাদের এই ঘটনাটি কেমন লাগল? আমাদের বিপ্লবীদের এই বুদ্ধিমত্তা ও সাহস কি আপনাদের অনুপ্রাণিত করে? কমেন্ট সেক্সে অবশ্যই জানান। ব্লগটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন, আর এমন ঐতিহাসিক রোমাঞ্চকর কাহিনী আরও জানতে ফলো করতে ভুলবেন না।
দেখা হবে পরের পোস্টে। ভালো থাকবেন, জয় হিন্দ!

মন্তব্যসমূহ