১৯ শতকে ভারতে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো কেমন ছিল ?
নমস্কার। আজ আমরা ফিরে যাবো ইতিহাসের এমন এক শতাব্দীতে যা আধুনিক ভারতের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল। ১৯ শতক—অর্থাৎ ১৮০১ থেকে ১৯০০ সাল। এই সময়কালটি ভারতের ইতিহাসে কেবল রাজনৈতিক দাসত্ব বা অর্থনৈতিক শোষণের গল্প নয় এটি ছিল এক অদ্ভুত বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত রূপান্তরের যুগ।
একদিকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং পরবর্তীতে ব্রিটিশ ক্রাউন তাদের ঔপনিবেশিক স্বার্থে ভারতকে ব্যবহার করছিল। অন্যদিকে এই প্রয়োজনেই ভারতে প্রবেশ করছিল আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নানা উপাদান। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই পরিকাঠামো কি কেবলই ব্রিটিশদের উপকারের জন্য ছিল? নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে ছিল আধুনিক ভারতের বৈজ্ঞানিক পুনর্জাগরণের বীজ? আজ আমরা আলোচনা করব কীভাবে ১৯ শতকে ভারতে গড়ে উঠেছিল বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো।
যেকোনো দেশ শাসন বা পরিচালনা করতে গেলে সবার আগে প্রয়োজন সেই দেশের ভূগোলকে জানা। ব্রিটিশরা এই কাজটি শুরু করেছিল অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক উপায়ে। ১৯ শতকের শুরুতে ১৮০২ সালে উইলিয়াম ল্যাম্বটন এবং পরবর্তীতে জর্জ এভারেস্টের নেতৃত্বে শুরু হয় 'গ্রেট ট্রিগোনোমেট্রিক্যাল সার্ভে' (Great Trigonometrical Survey)।
এটি কেবল একটি মানচিত্র তৈরির কাজ ছিল না এটি ছিল তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এবং নিখুঁত বৈজ্ঞানিক প্রয়াস।
এর মাধ্যমে ভারতের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে হিমালয় পর্যন্ত প্রতি ইঞ্চি জমি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাপা হয়।
এই সার্ভের হাত ধরেই মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা প্রথমবার সঠিকভাবে পরিমাপ করা হয়েছিল।
একই সাথে ভারতের খনিজ সম্পদের খোঁজে ১৮৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় 'জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া' (Geological Survey of India)। কয়লা, লোহা এবং অন্যান্য খনিজ সম্পদের সন্ধান পেতে এই পরিকাঠামোটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রযুক্তিগতভাবে, এই জরিপগুলো ভারতকে এক সূত্রে বাঁধার প্রথম বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ ছিল।
১৮৫০-এর দশক। ভারতের পরিকাঠামোয় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এলো। লর্ড ডালহৌসির হাত ধরে ভারতে এলো রেলওয়ে এবং টেলিগ্রাফ।
"রেলওয়ে হলো আধুনিক শিল্পের অগ্রদূত।" — কার্ল মার্ক্স ভারতের রেলওয়ে দেখে এই মন্তব্য করেছিলেন।
১৮৫৩ সালের ১৬ই এপ্রিল বোম্বে থেকে থানে পর্যন্ত প্রথম যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল শুরু করে। ব্রিটিশদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে কাঁচামাল বন্দরে নিয়ে যাওয়া এবং বিদ্রোহ দমনের জন্য দ্রুত সেনা পাঠানো। কিন্তু অজান্তেই এই রেলওয়ে ভারতের অর্থনীতি এবং সমাজকে বদলে দিল। বিশাল ভারতের দূরত্ব এক ধাক্কায় কমে গেল। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দিক থেকে এটি ছিল এক বিশাল যজ্ঞ। পাহাড় কেটে টানেল তৈরি করা নদীর ওপর বড় বড় সেতু নির্মাণ—ভারতের মাটিতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক নতুন দিগন্ত খুলে দিল।
একই সময়ে চালু হলো টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা। ১৮৫১ সালে কলকাতা থেকে ডায়মন্ড হারবার পর্যন্ত প্রথম পরীক্ষামূলক টেলিগ্রাফ লাইন বসানো হয়। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের সময় এই টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা ব্রিটিশদের দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানে সাহায্য করেছিল। প্রযুক্তি কীভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে, টেলিগ্রাফ ছিল তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
রেললাইন বসানো সেতু তৈরি বা জরিপ করার জন্য প্রচুর পরিমাণে দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার এবং ওভারসিয়ারের প্রয়োজন ছিল। ইংল্যান্ড থেকে এত কর্মী আনা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ফলে ব্রিটিশরা বাধ্য হয়েই ভারতে কারিগরি শিক্ষার পরিকাঠামো তৈরি করতে শুরু করে।
১৮৪৭ সালে উত্তরপ্রদেশে প্রতিষ্ঠিত হয় টমাসন কলেজ অফ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং (যা আজ আমাদের কাছে IIT Roorkee নামে পরিচিত)। এটি ছিল ভারতের তথা এশিয়ার প্রথম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ।
১৮৫৬ সালে বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হয় বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (যা বর্তমানে শিবপুর IIEST)।
১৮৫৪ সালে পুনেতে গড়ে ওঠে আরেকটি ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল।
১৮৫৭ সালে কলকাতা, বোম্বে এবং মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ভারতে আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ তৈরি হয়। তবে মনে রাখা প্রয়োজন এই শিক্ষা ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল উচ্চমানের গবেষক তৈরি করা নয় বরং ঔপনিবেশিক প্রশাসনের জন্য প্রযুক্তিগত 'শ্রমিক' বা অ্যাসিস্ট্যান্ট তৈরি করা। তা সত্ত্বেও এই প্রতিষ্ঠানগুলোই ভারতের তরুণ প্রজন্মের মনে বিজ্ঞানের চেতনা জাগিয়ে তুলেছিল।
১৯ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এসে ভারতীয় মণীষীরা বুঝতে পারলেন যে ব্রিটিশরা যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এ দেশে আনছে তার নিয়ন্ত্রণ ভারতীয়দের হাতে নেই। ভারতবাসীকে যদি প্রকৃত অর্থেই আধুনিক হতে হয় তবে বিজ্ঞানের চর্চা নিজেদের করতে হবে।
এই ভাবনারই এক ঐতিহাসিক ফসল হলো ১৮৭৬ সালে ড. মহেন্দ্রলাল সরকারের চেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত 'ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স' (IACS)। এটি ছিল সম্পূর্ণ ভারতীয়দের দ্বারা পরিচালিত ভারতের প্রথম নিজস্ব বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র। এই প্রতিষ্ঠানে বসেই পরবর্তীতে সি. ভি. রমন তাঁর নোবেলজয়ী আবিষ্কার করেছিলেন।
এই শতকের শেষের দিকেই আমরা দেখতে পাই স্যার জগদীশচন্দ্র বসু এবং আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের মতো বিজ্ঞানীদের উত্থান। জগদীশচন্দ্র বসু প্রেসিডেন্সি কলেজের ল্যাবরেটরিতে বসে কোনো উন্নত পরিকাঠামো ছাড়াই আবিষ্কার করলেন বেতার তরঙ্গ বা মাইক্রোওয়েভ এবং উদ্ভিদের প্রাণ। অন্যদিকে প্রফুল্লচন্দ্র রায় তৈরি করলেন 'বেঙ্গল কেমিক্যালস', যা ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে গড়ে ওঠা প্রথম রাসায়নিক ও ওষুধ তৈরির শিল্প।
এটি কেবল বিজ্ঞান চর্চা ছিল না এটি ছিল বিজ্ঞানের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিরোধ।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আরেকটি বড় ক্ষেত্র ছিল চিকিৎসা বিজ্ঞান। ১৮৩৫ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতে আধুনিক বা পশ্চিমা চিকিৎসা শাস্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল। ১৯ শতকে ভারতে কলেরা প্লেগ এবং ম্যালেরিয়ার মতো মহামারি ছিল নিত্যসঙ্গী।
এই মহামারিগুলোর মোকাবিলা করার জন্য ব্রিটিশরা কিছু গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলে। যেমন ১৮৯৯ সালে পুনেতে প্লেগ গবেষণার জন্য ল্যাবরেটরি তৈরি হয়। আর এই ১৯ শতকের শেষভাগেই ১৮৯৭ সালে কলকাতায় বসে ব্রিটিশ ডাক্তার রোনাল্ড রস আবিষ্কার করেন যে অ্যানোফিলিস মশা ম্যালেরিয়ার জীবাণু বহন করে যার জন্য তিনি পরবর্তীতে নোবেল পুরস্কার পান। চিকিৎসা ক্ষেত্রে এই পরিকাঠামো মূলত ব্রিটিশ সেনা ও ভারতীয় শহরের সুরক্ষার জন্য তৈরি হলেও এটি ভারতের আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল।
১৯ শতকে ভারতের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত পরিকাঠামোকে আমরা কীভাবে মূল্যায়ন করব? এটি কি কেবলই শোষণের হাতিয়ার ছিল নাকি প্রগতির চাবিকাঠি?
সত্যি বলতে, এর উত্তর দুটোই। ব্রিটিশরা এই পরিকাঠামো তৈরি করেছিল তাদের সাম্রাজ্যকে টিকিয়ে রাখতে ভারতের সম্পদ সহজে লুণ্ঠন করতে। কিন্তু ইতিহাস সবসময় শাসকের ইচ্ছা মেনে চলে না। টেলিগ্রাফের তার রেলের চাকা আর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ক্লাসরুম থেকে যে বৈজ্ঞানিক চেতনার জন্ম হয়েছিল তা ভারতীয়দের মনে এক নতুন আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেয়।
১৯ শতকের এই পরিকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়েই ২০ শতকে ভারত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে স্বাবলম্বী হওয়ার লড়াই শুরু করে। আজ আমরা যে পারমাণবিক শক্তি মহাকাশ গবেষণা বা তথ্যপ্রযুক্তিতে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছি তার শিকড় কিন্তু লুকিয়ে ছিল ১৯ শতকের সেই ধুলোবালি মাখা ল্যাবরেটরি সার্ভে ক্যাম্প আর রেললাইনের ভেতরেই।
আজকের আলোচনা আপনাদের কেমন লাগলো কমেন্ট করে জানাবেন। ইতিহাস ও বিজ্ঞানের এমন আরও অনেক অজানা গল্প জানতে আমাদের ফলো করুন। দেখা হবে পরের ব্লগে। ধন্যবাদ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Your valuable feedback or questions below comment Please let me know. Thank you.