থুম্বা রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের অবিশ্বাস্য ইতিহাস।
নমস্কার বন্ধুরা, আজ আমরা এমন এক রোমাঞ্চকর যাত্রার গল্প শুনবো যা শুরু হয়েছিল একটি ছোট মাছ ধরার গ্রাম থেকে আর আজ তা পৌঁছে গেছে চাঁদের দক্ষিণ মেরু এবং মঙ্গলের কক্ষপথে। হ্যাঁ, আমি ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা 'ইসরো'-র সাফল্যের কথা বলছি। কিন্তু আপনারা কি জানেন ভারতের এই মহাজাগতিক স্বপ্নের ভিত কোথায় এবং কীভাবে পোতা হয়েছিল?
আজ থেকে প্রায় ৬০ বছর আগে কেরালার তিরুবনন্তপুরমের কাছে 'থুম্বা' নামের এক ছোট্ট নিভৃত গ্রামে ভারতের প্রথম রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্র গড়ে ওঠে। যার পোশাকি নাম— "থুম্বা ইকুয়েটোরিয়াল রকেট লঞ্চিং স্টেশন" বা সংক্ষেপে TERLS । কোনো অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি নয় একটা সেন্ট মেরি ম্যাগডালিন চার্চের ভেতরে বসে বিজ্ঞানীরা টেবিল-চেয়ার পেতে কাজ শুরু করেছিলেন। রকেটের অংশ আনা হতো সাইকেলে আর গরুর গাড়িতে করে । আজকের ব্লগে আমরা থুম্বা রকেট উৎক্ষেপণ প্রজেক্টের সেই অবিশ্বাস্য ইতিহাস বিজ্ঞানীদের ত্যাগ এবং ভারতের মহাকাশ গবেষণার আঁতুড়ঘরের সম্পূর্ণ কাহিনী বিস্তারিত জানবো। শেষ পর্যন্ত পড়ুন ।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ভারতের এত বড় জায়গা থাকতে হঠাৎ কেরালার এক প্রান্তের মাছ ধরার গ্রাম থুম্বাকে কেন বেছে নেওয়া হলো।এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক কারণ ছিল না ছিল সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক কারণ।
পৃথিবীর ভূ-চৌম্বকীয় ক্ষেত্র বা Magnetic Field-এর একটি বিশেষ রেখা রয়েছে যাকে বলা হয় 'ম্যাগনেটিক ইকুয়েটর' বা চৌম্বকীয় বিষুবরেখা। এই রেখাটি ঠিক থুম্বা গ্রামের ওপর দিয়ে গেছে। এই চৌম্বকীয় বিষুবরেখার ঠিক ওপরে, বায়ুমণ্ডলের প্রায় ১১০ কিলোমিটার উঁচুতে একটি তীব্র বিদ্যুৎ প্রবাহের সৃষ্টি হয়, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় 'ইকুয়েটোরিয়াল ইলেকট্রোজেট' ।
মহাকাশ বিজ্ঞানী এবং বিশেষ করে ভারতের মহাকাশ গবেষণার জনক ডক্টর বিক্রম সারাভাই বুঝতে পেরেছিলেন যে, বায়ুমণ্ডলের এই বিশেষ স্তর এবং পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র নিয়ে গবেষণা করার জন্য থুম্বাই হলো পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে আদর্শ স্থান। তাছাড়া, থুম্বার পশ্চিম দিকে ছিল বিশাল আরব সাগর যা রকেট উৎক্ষেপণের পর কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। এই বৈজ্ঞানিক সুবিধাজনক অবস্থানের কারণেই থুম্বাকে ভারতের প্রথম রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্র হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।
জায়গা তো নির্বাচন করা হলো, কিন্তু কাজটা এত সহজ ছিল না। থুম্বা তখন ছিল হাজার হাজার মৎস্যজীবীদের বাসস্থান। সেখানে ছিল তাদের ঘরবাড়ি, রুটি-রুজি এবং একটি ঐতিহাসিক চার্চ— সেন্ট মেরি ম্যাগডালিন চার্চ। সরকারের পক্ষে রাতারাতি এই জমি অধিগ্রহণ করা প্রায় অসম্ভব ছিল।
ঠিক এই সময়ে ডক্টর বিক্রম সারাভাই এবং তৎকালীন কেরালার জেলা শাসক একটি দারুণ পদক্ষেপ নেন। তারা দেখা করেন চার্চের প্রধান রেভারেন্ড ফাদার পিটার বার্নার্ড পেরেরার সাথে। ডক্টর সারাভাই ফাদারকে বোঝান যে, এই প্রজেক্টের উদ্দেশ্য কোনো যুদ্ধ বা ধ্বংস নয়, বরং বিজ্ঞানের আলোয় মানুষের কল্যাণ করা।
ফাদার পেরেরা বিজ্ঞানীদের উদ্দেশ্য বুঝতে পারেন। পরের দিন রবিবার, চার্চের প্রার্থনায় তিনি সমস্ত গ্রামবাসীকে ডেকে বলেন, "আমার সন্তানেরা, আমরা ঈশ্বরের উপাসনা করি। বিজ্ঞানও সত্যের সন্ধান করে, যা ঈশ্বরেরই রূপ। এই বিজ্ঞানীরা আমাদের জমি চাইছেন মানবজাতির কল্যাণের জন্য। আমরা কি আমাদের এই চার্চ এবং জমি তাদের দিতে পারি না?"
ফাদারের এক ডাকে সমস্ত মৎস্যজীবী পরিবার নিজেদের ভিটেমাটি ত্যাগ করতে রাজি হয়ে যান। চার্চের ভেতরের যিশুর মূর্তি এবং পবিত্র জিনিসপত্র অন্য জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। আর সেই চার্চের ঘরটিই হয়ে ওঠে ভারতের প্রথম মহাকাশ বিজ্ঞানীদের ল্যাবরেটরি। বিশপ হাউজটি রূপান্তরিত হয় বিজ্ঞানীদের কার্যালয়ে। এই ত্যাগ ছাড়া আজকের ইসরো হয়তো কোনোদিনই তৈরি হতো না।
জমি পাওয়ার পর শুরু হলো আসল কাজ। ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে ভারতের কাছে রকেট তৈরির মতো পর্যাপ্ত বাজেট বা প্রযুক্তি— কোনোটিই ছিল না। ডক্টর বিক্রম সারাভাইয়ের নেতৃত্বে একদল তরুণ ও প্রতিভাবান বিজ্ঞানী সেখানে দিনরাত এক করে কাজ শুরু করেন। এই দলেই ছিলেন ভারতের হবু রাষ্ট্রপতি এবং 'মিসাইল ম্যান' ডক্টর এ পি জে আব্দুল কালাম।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা যা ভাবতেও পারি না, সেই সময়ে বিজ্ঞানীরা তা করে দেখিয়েছেন। রকেটের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি এবং তরল জ্বালানি বহন করার জন্য কোনো বড় ট্রাক বা বিশেষ যান ছিল না। বিজ্ঞানীরা সাইকেলের ক্যারিয়ারে রকেটের নাক বা নোস কোণ বেঁধে নিয়ে যেতেন। রকেটের মূল অংশ বা বুস্টার টেনে নিয়ে যাওয়া হতো গরুর গাড়িতে করে।
ল্যাবরেটরির ভেতরে ছাদ থেকে জল পড়ত আধুনিক কোনো কম্পিউটার ছিল না সমস্ত হিসেব-নিকেশ হাতে করতে হতো। কিন্তু বিজ্ঞানীদের চোখে ছিল ভারতের নিজস্ব মহাকাশ শক্তির স্বপ্ন। তারা চার্চের চারপাশের নারকেল গাছের মাঝেই তৈরি করে ফেলেন প্রথম রকেট লঞ্চ প্যাড।
অবশেষে এলো সেই ঐতিহাসিক দিন— ২১ নভেম্বর, ১৯৬৩ সাল। থুম্বার সমুদ্রসৈকত থেকে ভারতের প্রথম সাউন্ডিং রকেট উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত করা হলো। রকেটটি অবশ্য ভারতের তৈরি ছিল না সেটি ছিল আমেরিকার তৈরি একটি 'নাইকি-অ্যাপাচি' রকেট।
উৎক্ষেপণের ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে একটি বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। রকেটটি যখন ক্রেনে করে লঞ্চিং প্যাডে তোলা হচ্ছিল তখন হাইড্রোলিক ক্রেন থেকে তেল লিক করতে শুরু করে। রকেটটি মাঝপথেই আটকে যায়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা দমে যাননি। ডক্টর কালাম এবং তাঁর সহকর্মীরা নিজেদের হাতে করে সেই ভারী রকেটটিকে তুলে সঠিক স্থানে বসান।
বিকেল ঠিক ৬টা ২৫ মিনিটে, আরব সাগরের তীরে আকাশ কাঁপিয়ে ভারতের প্রথম রকেট মহাকাশের উদ্দেশ্যে উড়ে যায়। রকেটটি বায়ুমণ্ডলে সোডিয়াম বাষ্প ছেড়ে দেয়, যা গোধূলির আকাশে এক অপূর্ব আলোর সৃষ্টি করেছিল। উৎক্ষেপণটি ১০০ ভাগ সফল হয়েছিল। আমেরিকার নাসার বিজ্ঞানীরা এবং সারা বিশ্বের মহাকাশ গবেষকরা ভারতের এই সাফল্যে স্তম্ভিত হয়ে যান। সেদিন থেকেই বিশ্বমঞ্চে ভারতের মহাকাশ যাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে।
থুম্বার সেই ছোট্ট প্রজেক্টটি পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালের ১৫ আগস্ট একটি পূর্ণাঙ্গ সংস্থায় রূপ নেয়, যার নাম দেওয়া হয় 'ইসরো' । ১৯৭১ সালে এই কেন্দ্রের নামকরণ করা হয় ভারতের মহাকাশ বিজ্ঞানের অগ্রদূত ডক্টর বিক্রম সারাভাইয়ের স্মরণে— "বিক্রম সারাভাই স্পেস সেন্টার"।
থুম্বা মূলত সাউন্ডিং রকেট বা বায়ুমণ্ডলীয় গবেষণার জন্য ব্যবহৃত হতো। পরবর্তীতে বড় উপগ্রহ ও রকেট উৎক্ষেপণের জন্য অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটায় "সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টার" গড়ে তোলা হয়। কিন্তু ভারতের মহাকাশ গবেষণার আসল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল এই থুম্বাই।
যে দেশ একদিন সাইকেল এবং গরুর গাড়িতে করে রকেটের পার্টস বহন করেছিল, সেই দেশই আজ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ মহাকাশ শক্তি। আজ ভারত একসাথে ১০৪টি উপগ্রহ মহাকাশে পাঠাতে পারে, নিজস্ব প্রযুক্তিতে ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিন তৈরি করে এবং অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে চন্দ্র ও মঙ্গল অভিযান সফল করে।
বন্ধুরা, থুম্বা প্রজেক্ট আমাদের শেখায় যে, বড় কিছু করার জন্য শুরুতে কোটি কোটি টাকার বাজেট বা আধুনিক প্রযুক্তির চেয়েও বেশি প্রয়োজন হয় লক্ষ্য, আত্মবিশ্বাস এবং কঠোর পরিশ্রম। থুম্বার সেই মৎস্যজীবী মানুষগুলো, ফাদার পেরেরা এবং ডক্টর বিক্রম সারাভাই ও কালাম সাহেবের মতো দূরদর্শী বিজ্ঞানীদের প্রতি আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণাম।
আপনাদের এই গল্পটি কেমন লাগলো। কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। ব্লগ টি ভালো লাগলে লাইক করুন, বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন এবং এই রকম আরো পোস্ট পড়তে আমাদের ফলো করতে ভুলবেন না। দেখা হবে পরের ব্লগে, ধন্যবাদ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Your valuable feedback or questions below comment Please let me know. Thank you.