মুম্বাইয়ের অপেরা হাউস সেন্ট্রাল ব্যাংক স্ক্যাম!
নমস্কার বন্ধুরা। আপনারা তো অনেক ধরণের ব্যাংক ডাকাতির কথা শুনেছেন। হলিউড বা বলিউডের সিনেমায় দেখা যায়—একদল সশস্ত্র ডাকাত মুখে মুখোশ পরে হাতে বন্দুক নিয়ে ব্যাংকে ঢুকলো চিৎকার করে সবাইকে হাত ওপরে তুলতে বললো তারপর লকার ভেঙে কোটি কোটি টাকা নিয়ে চম্পট দিল। চারদিকে সাইরেন বাজছে পুলিশ তাড়া করছে দেখতে বেশ থ্রিলিং লাগে তাই না?
কিন্তু আজ আমি আপনাদের এমন এক ব্যাংক ডাকাতির গল্প শোনাবো যেখানে কোনো বন্দুক চলেনি কোনো মারামারি হয়নি এমনকি একটা চিৎকার পর্যন্ত কেউ করেনি অথচ ডাকাত দল ভরদুপুরে সবার চোখের সামনে দিয়ে কোটি কোটি টাকার সোনা আর নগদ টাকা নিয়ে হেঁটে বেরিয়ে গেল। আর সবচেয়ে মজার বিষয় কী জানেন?
ব্যাংক ম্যানেজার নিজে হেসিমুখে সেই ডাকাতদের গাড়ির দরজা খুলে দিয়েছিলেন এবং বিদায় জানানোর সময় বলেছিলেন—থ্যাংক ইউ স্যার, আবার আসবেন
হ্যাঁ আপনারা ঠিকই শুনছেন। আমি কথা বলছি ১৯৮৭ সালের ১৯শে মার্চের সেই বিখ্যাত অপেরা হাউস সেন্ট্রাল ব্যাংক ডাকাতি নিয়ে। ভারতের ক্রাইম হিস্ট্রিতে এটিকে বলা হয় সবচেয়ে সোফিস্টিকেটেড বা চতুর অপরাধ। যে ঘটনার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে বলিউডে অক্ষয় কুমারের বিখ্যাত সিনেমা স্পেশাল ২৬ তৈরি হয়েছিল। আজকের ভিডিওতে আমরা একদম গভীরে গিয়ে জানবো—কে ছিল এই মাস্টারমাইন্ড । কীভাবে সে পুলিশের নাকের ডগা দিয়ে এই অসম্ভবকে সম্ভব করলো।আর শেষ পর্যন্ত পুলিশ কি তাকে ধরতে পেরেছিল। পুরো ব্লগটি শেষ পর্যন্ত পড়ুন কারণ শেষের টুইস্টটা আপনার মন উড়িয়ে দেবে।
ঘটনার সূত্রপাত ১৯৮৭ সালের গোড়ার দিকে। মুম্বইয়ের আর্থাৎ তখনকার বোম্বে অপেরা হাউস এলাকাটি ছিল হীরা এবং গহনার ব্যবসার মূল কেন্দ্র। প্রতিদিন সেখানে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হতো। আর এই এলাকার ঠিক মাঝখানে অবস্থিত ছিল ট্রাইবেনী সেন্ট্রাল ব্যাংকের একটি শাখা। ব্যবসায়ীরা তাদের সারাদিনের উপার্জিত সোনা এবং ক্যাশ এই ব্যাংকের লকারেই রাখতেন।
এই ব্যাংকের ওপর নজর পড়ে এক ব্যক্তির। পুলিশ রেকর্ডে তার নাম দেওয়া হয়েছিল মোহন সিং। তবে এটা তার আসল নাম ছিল না। মোহন সিং ছিল এক চরম বুদ্ধিমান ঠান্ডা মাথার অপরাধী। সে জানতো, অস্ত্র নিয়ে ব্যাংকে ঢুকলে রিস্ক অনেক বেশি। ধরা পড়ার চান্স ১০০%। তাই সে এমন এক আইডিয়া বের করলো যা এর আগে ভারতে কেউ কখনো ভাবেনি। সে ঠিক করলো সে ব্যাংক ডাকাতি করবে না সে করবে একটি নকল ইনকাম ট্যাক্স বা সিবিআই রেইড।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৯৮৭ সালের ১৭ই মার্চ, মোহন সিং টাইমস অফ ইন্ডিয়া পত্রিকায় একটি ছোট ক্লাসিফাইড বিজ্ঞাপন দেয়। বিজ্ঞাপনে লেখা ছিল
কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার (CBI) জন্য ইন্টেলিজেন্স অফিসার এবং সিকিউরিটি অফিসার প্রয়োজন। আগ্রহী প্রার্থীরা ১৯শে মার্চ সকাল ব্যালার্ড এস্টেটের তাজ ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে এসে ইন্টারভিউ দিন।
চাকরির বাজার তখনো কঠিন ছিল আর সিবিআই-এর চাকরি ব্যস বিজ্ঞাপন দেখেই শয়ে শয়ে তরুণ বেকার যুবকেরা সেখানে এসে হাজির হলো। মোহন সিং নিজে একজন সিনিয়র সিবিআই অফিসারের বেশে সেখানে বসেছিল। তার ব্যক্তিত্ব কথা বলার ধরণ দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে সে কোনো সরকারি অফিসার নয়। সে সেখান থেকে অত্যন্ত চতুরতার সাথে ২৬ জন সৎ বলিষ্ঠ এবং উদ্যমী যুবককে বেছে নেয়।
তাদের বলা হয় তারা সরকারি চাকরিতে সাময়িকভাবে সিলেক্টেড হয়েছে এবং তাদের প্রথম পোস্টিং বা ট্রেনিং আজ দুপুরেই হবে। একটা লাইভ ‘মক রেইড’ (Mock Raid) বা ট্রায়াল রান দিয়ে তাদের ডিউটি শুরু হবে। এই ২৬ জন যুবক কিন্তু জানতোই না যে তারা কোনো আসল সরকারি মিশনে যাচ্ছে না বরং তারা একজন আন্তর্জাতিক মানের জালিয়াতের হাত শক্ত করতে চলেছে।
১৯শে মার্চ দুপুর ঠিক সোয়া দুটো। মোহন সিং সেই ২৬ জন নতুন রিক্রুট হওয়া ছেলেদের নিয়ে একটি লাক্সারি বাস ভাড়া করে রওনা দিল অপেরা হাউসের সেন্ট্রাল ব্যাংকের দিকে। যাওয়ার পথে বাসে বসেই মোহন সিং সবাইকে পরিচয়পত্র বা আইডি কার্ড বিলি করলো। বলা বাহুল্য সেই আইডি কার্ডগুলো ছিল সম্পূর্ণ ভুয়ো বা নকল। মোহন সিং ছেলেদের কড়া নির্দেশ দিল:
কেউ পকেট থেকে হাত বের করবে না কোনো স্টাফকে বাইরে যেতে দেওয়া হবে না এবং ফোন লাইন কেটে দেওয়া হবে যাতে বাইরে কেউ যোগাযোগ করতে না পারে।
দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে বাসটি ব্যাংকের সামনে এসে থামলো। মোহন সিং তার ২৬ জন অফিসারকে নিয়ে ব্যাংকে প্রবেশ করলো। সে সোজা চলে গেল ব্যাংক ম্যানেজারের ক্যাবিনে। অত্যন্ত গম্ভীর গলায় নিজের ভুয়ো সিবিআই পরিচয়পত্র দেখিয়ে বললো—আমি সেন্ট্রাল ব্যুরো থেকে আসছি। আমাদের কাছে খবর আছে এই ব্যাংকে প্রচুর কালো টাকা এবং অবৈধ সোনা লুকিয়ে রাখা হয়েছে। এখনই পুরো ব্যাংক সিল করা হোক।
ম্যানেজার তো ভয়ে কেঁচো সিবিআই রেইড বলে কথা। মোহন সিংয়ের নির্দেশে ব্যাংকের মেইন গেট বন্ধ করে দেওয়া হলো সমস্ত ফোন লাইন কেটে দেওয়া হলো। ব্যাংকের কাস্টমার এবং স্টাফ—সবাই এক কোনায় হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে রইলো। ওই ২৬ জন যুবক ভাবছিল তারা দেশের স্বার্থে কালো টাকার বিরুদ্ধে ডিউটি করছে তাই তারাও খুব কড়াভাবে পুরো ব্যাংক পাহারা দিচ্ছিল।
মোহন সিং ম্যানেজারকে নির্দেশ দিল ক্যাশ কাউন্টার এবং লকার রুম খোলার জন্য। ম্যানেজার নিজেই চাবি দিয়ে লকার খুলে দিল। মোহন সিং একের পর এক লকার থেকে সোনা হীরা এবং বান্ডিল বান্ডিল টাকা বের করে করে চামড়ার ব্যাগে ভরতে লাগলো।
ব্যাংক থেকে সমস্ত মূল্যবান জিনিসপত্র ব্যাগে ভরতে মোহন সিংয়ের সময় লেগেছিল মাত্র ৪৫ মিনিট। ততক্ষণে ব্যাংকের ক্যাশ এবং লকার থেকে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লক্ষ টাকা যা ১৯৮৭ সালের হিসেবে আজকের দিনে কয়েক কোটি টাকার সমান ব্যাগেভর্তি হয়ে গেছে।
এবার ছিল সবচেয়ে কঠিন পার্ট—সেখান থেকে নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়া। মোহন সিং কিন্তু তাড়াহুড়ো করলো না। সে অত্যন্ত শান্ত মাথায় ম্যানেজারকে বললো—আমাদের রেইডের প্রথম পর্ব শেষ। এই বাজেয়াপ্ত করা জিনিসগুলো আমাদের হেডকোয়ার্টারে নিয়ে যেতে হবে ভেরিফিকেশনের জন্য। আমি এগুলো নিয়ে আগে বেরোচ্ছি। আমার এই ২৬ জন অফিসার আরও আধঘণ্টা ব্যাংক পাহারা দেবে। কেউ যেন ব্যাংক থেকে বেরোনোর চেষ্টা না করে।
ম্যানেজার মাথা নেড়ে সায় দিল। মোহন সিং ব্যাগগুলো নিয়ে ব্যাংকের বাইরে অপেক্ষারত বাসে গিয়ে উঠলো এবং ড্রাইভারকে বললো তাকে লোকাল রেলওয়ে স্টেশনের কাছে নামিয়ে দিতে। সে বাসে করে চলে গেল।
এদিকে ব্যাংকের ভেতরে আধঘণ্টা কেটে গেল। ঘড়ির কাঁটা আড়াইটে থেকে তিনটে ছুঁলো। ২৬ জন যুবক ঠায় দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে। কিন্তু তাদের 'স্যার' আর ফিরে আসছেন না। ম্যানেজারও ভাবল রেইড তো শেষ এবার কাজ শুরু করা দরকার। সে তখন সাহস করে ওই ছেলেদের একজনকে জিজ্ঞেস করলো—ভাই, আপনাদের স্যার কখন আসবেন।ক্যাশ তো সব নিয়ে গেলেন, একটা রসিদ বা সিজার লিস্ট তো দিয়ে গেলেন না?।
ছেলেরা উত্তর দিল—আমরা তো আজই জয়েন করেছি স্যার যা অর্ডার দিয়েছেন আমরা তাই করছি।
ম্যানেজারের মনে প্রথম খটকা লাগলো। আজই জয়েন করেছে মানে। সিবিআই অফিসাররা কি এভাবে কথা বলে।ম্যানেজার তখন চুপিচুপি ব্যাংকের পেছনের একটি সাধারণ ফোন যা কাটতে ডাকাতরা ভুলে গিয়েছিল থেকে লোকাল পুলিশ স্টেশনে ফোন করলো।
মিনিট দশেকের মধ্যে মুম্বই পুলিশ হুড়মুড়িয়ে ব্যাংকে এসে ঢুকলো। পুলিশ এসে ওই ২৬ জন অফিসারকে চেপে ধরলো—তোমাদের লিডার কোথায়, তোমরা কারা?
ছেলেরা তো আকাশ থেকে পড়লো ।তারা বললো—কেন, আমরা তো সিবিআই অফিসার।এই দেখুন আমাদের আইডি কার্ড।
পুলিশ কার্ডগুলো দেখেই মাথায় হাত দিল। সেগুলো ছিল লোকাল প্রিন্টিং প্রেস থেকে ছাপানো সস্তা কাগজের টুকরো পুলিশ চিৎকার করে বললো—আরে মূর্খরা, তোমরা সিবিআই নও, তোমরা একটা আন্তর্জাতিক ডাকাতকে ব্যাংক ডাকাতি করতে সাহায্য করেছ।
যখন সত্যিটা সামনে এলো পুরো মুম্বই পুলিশ মহলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়ে গেল। ভরদুপুরে ব্যস্ততম এলাকায় পুলিশের ছদ্মবেশে একটা আস্ত ব্যাংক খালি করে চলে গেল একজন মানুষ। তাও আবার ইনকাম ট্যাক্স বা সিবিআই-এর নাম করে!
পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে ওই ২৬ জন যুবককে গ্রেফতার করলো। কিন্তু ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ বুঝতে পারলো এই ছেলেরা সম্পূর্ণ নির্দোষ। এরা স্রেফ বেকারত্বের শিকার এবং চাকরির লোভে এই ফাঁদে পা দিয়েছিল। তারা মোহন সিংয়ের আসল পরিচয় বা সে কোথায় গেছে তার কিচ্ছু জানতো না।
পুলিশ তখন তদন্তের জাল ছড়ালো সেই তাজ ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে যেখানে ইন্টারভিউ নেওয়া হয়েছিল। হোটেলের রেজিস্টার চেক করে দেখা গেল মোহন সিং যে নাম এবং ঠিকানা ব্যবহার করে রুম বুক করেছিল তা সম্পূর্ণ ভুয়া। যে প্রিন্টিং প্রেস থেকে আইডি কার্ড ছাপানো হয়েছিল সেখানকার মালিকও মোহন সিংয়ের কোনো স্কেচ বা সঠিক হদিশ দিতে পারলো না কারণ সে সবসময় বড় চশমা এবং টুপি পরে থাকতো।
মুম্বই পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ দিনরাত এক করে দিল। তারা ভারতের সমস্ত এয়ারপোর্ট, রেলওয়ে স্টেশন, বাস টার্মিনালে অ্যালার্ট জারি করলো। স্কেচ বানিয়ে চারিদিকে পোস্টার মারা হলো। কিন্তু মোহন সিং যেন কর্পূরের মতো বাতাসে মিলিয়ে গেল। সে কোনো ক্লু বা প্রমাণ পেছনে ফেলে যায়নি। এমনকি সে যে টাকা এবং সোনা নিয়ে পালিয়েছিল তার একটা অংশও কখনো বাজারে সার্কুলেট হতে দেখা যায়নি।
বন্ধুরা এই ঘটনার পর আজ প্রায় চার দশক পার হয়ে গেছে। ১৯৮৭ সালের সেই ১৯শে মার্চের পর থেকে আজ পর্যন্ত পুলিশ কিন্তু সেই রহস্যময় 'মোহন সিং'কে খুঁজে পায়নি। সে বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে সে ভারতের টাকা নিয়ে বিদেশে পালিয়ে গেছে নাকি নাম বদলে অন্য কোনো শহরে সাধারণ মানুষের মতো জীবন কাটাচ্ছে—তা আজও এক মস্ত বড় রহস্য।
অপেরা হাউস সেন্ট্রাল ব্যাংক ডাকাতি ভারতের অপরাধ জগতের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। কারণ, এটি প্রমাণ করে যে অপরাধ করার জন্য সবসময় অস্ত্রের প্রয়োজন হয় না মানুষের মনের ভয় এবং সিস্টেমের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েও কত বড় অপরাধ করা সম্ভব। মোহন সিং কোনো রক্তপাত না করে কাউকে আঘাত না করে যে নিখুঁত জালিয়াতি করেছিল তা একাধারে যেমন ভীতিজনক তেমনই বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে চমকপ্রদ।
এই ঘটনা থেকে ব্যাংকিং সিস্টেম এবং আমাদের সাধারণ সমাজেও অনেক বড় শিক্ষা মেলে—আইডি কার্ড বা দামি পোশাক দেখলেই কাউকে অন্ধবিশ্বাস করা উচিত নয়। প্রপার ভেরিফিকেশন বা যাচাই করা কতটা জরুরি তা এই ঘটনা আমাদের শিখিয়ে দেয়।
তো বন্ধুরা, এই ছিল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এবং অদ্ভুত ব্যাংক ডাকাতির গল্প। মোহন সিংয়ের এই চতুরতা নিয়ে আপনার কী রায়।আপনার কি মনে হয় পুলিশ তাকে কোনোদিনও ধরতে পারবে, নাকি সে চিরকালই এই ‘পারফেক্ট ক্রাইম’-এর মাস্টারমাইন্ড হিসেবে ইতিহাসের পাতায় থেকে যাবে। আপনার মতামত নিচে কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন।
ব্লগ পোস্টটি ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন এবং এই ধরণের আরও থ্রিলিং এবং অজানা ঐতিহাসিক ঘটনার ব্লগ পড়তে আমাদের ফলো করতে ভুলবেন না। দেখা হচ্ছে পরেরপোস্টে। ধন্যবাদ, ভালো থাকবেন!
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Your valuable feedback or questions below comment Please let me know. Thank you.