১৯২৫ সালের কাকোরি ট্রেন ডাকাতি কেনো হয়েছিল।

নমস্কার বন্ধুরা। আজ থেকে ঠিক ১০০ বছরেরও বেশি সময় আগে, ১৯২৫ সালের ৯ই আগস্ট। ঘড়িতে তখন রাত প্রায় ৮টা বেজে বেজে ৪৫ মিনিট। লখনউ থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে কাকোরি নামের একটি ছোট্ট রেলওয়ে স্টেশনের কাছে হুড়মুড় করে এগিয়ে চলেছে ৮-ডাউন সাহারানপুর-লখনউ প্যাসেঞ্জার ট্রেনটি। চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। আচমকাই ট্রেনের ভেতরে বসে থাকা এক যুবক ট্রেনের জরুরি চেইনটি টেনে দিলেন।
সজোরে ব্রেক কষার শব্দে কেঁপে উঠল পুরো ট্রেনটি। ইঞ্জিনের চাকা থেকে আগুনের ফুলকি ছুটে এল। ট্রেনটি থামতেই অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে এলেন কয়েকজন তরুণ। তাঁদের চোখে মুখে ভয়ের কোনো চিহ্ন নেই, বরং জ্বলছে এক অদ্ভুত বিপ্লবের আগুন। তাঁদের হাতে জার্মানির তৈরি মাউজার পিস্তল। তাঁরা কোনো সাধারণ চোর বা ডাকাত ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন ভারতের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা একদল অগ্নিযুগের বিপ্লবী।
হ্যাঁ বন্ধুরা, আজ আমরা কথা বলছি ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের অন্যতম সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা—'কাকোরি ট্রেন ডাকাতি' বা 'কাকোরি ট্রেন অ্যাকশন' সম্পর্কে। কীভাবে মাত্র ১০ জন তরুণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলেন? কেন তাঁরা সরকারি ট্রেন লুট করতে বাধ্য হয়েছিলেন? এবং এই একটি ঘটনা কীভাবে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল? আজ বিস্তারিত জানবো এই ভিডিওতে। আপনি যদি ইতিহাসের এই রোমহর্ষক অধ্যায়টি জানতে চান, তবে ভিডিওটি একদম শেষ পর্যন্ত দেখুন। আর চ্যানেলে নতুন হলে অবশ্যই সাবস্ক্রাইব করে বেল আইকনটি প্রেস করে দিন।
বন্ধুরা, এই ঘটনাটি হুট করে ঘটে যায়নি। এর পেছনে ছিল এক গভীর হতাশা এবং ক্ষোভ। ১৯২০ সালে মহাত্মা গান্ধী দেশজুড়ে 'অসহযোগ আন্দোলন' শুরু করেছিলেন। পুরো দেশ বিশ্বাস করেছিল যে এবার হয়তো স্বাধীনতা আসবে। কিন্তু ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চৌরিচৌরা নামক একটি জায়গায় উত্তেজিত জনতা একটি থানায় আগুন ধরিয়ে দিলে কয়েকজন পুলিশকর্মী মারা যান। অহিংস আন্দোলনের নীতিতে বিশ্বাসী গান্ধীজি এই ঘটনার পর হঠাৎ করেই পুরো আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন।
গান্ধীজির এই সিদ্ধান্তে দেশের যুবসমাজ, বিশেষ করে তরুণ বিপ্লবীরা চরম হতাশ হয়ে পড়েন। তাঁদের মনে হলো, কেবল অহিংসা বা অনুনয়-বিনয় করে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সশস্ত্র বিপ্লব। ‘ইট কা জবাব পাত্থর সে দেনা হোগা’।
এই ভাবনা থেকেই ১৯২৪ সালে কানপুরে জন্ম নেয় একটি নতুন বিপ্লবী দল—হিন্দুস্তান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন । এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন শচীন্দ্রনাথ সান্যাল, রামপ্রসাদ বিসমিল এবং যোগেশচন্দ্র চ্যাটার্জির মতো দূরদর্শী বিপ্লবীরা। পরবর্তীতে এই দলে যোগ দেন চন্দ্রশেখর আজাদ, ভগৎ সিং এবং আশফাকউল্লা খানের মতো তরুণ তুর্কিরা।
কিন্তু একটি সশস্ত্র বিপ্লব গড়ে তুলতে গেলে কী প্রয়োজন? প্রয়োজন আধুনিক অস্ত্র, বোমা তৈরির সরঞ্জাম, গোপন আস্তানা এবং বিপ্লবীদের থাকা-খাওয়ার খরচ। আর এই সবকিছুর জন্য প্রয়োজন প্রচুর টাকা।
শুরুর দিকে বিপ্লবীরা দেশি জমিদার বা ধনীদের বাড়ি থেকে টাকা সংগ্রহের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু রামপ্রসাদ বিসমিল লক্ষ্য করলেন, এতে ভারতীয়দেরই ক্ষতি হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের মনে বিপ্লবীদের প্রতি একটা ভুল বার্তা যাচ্ছে। তাই বিসমিল সিদ্ধান্ত নিলেন, "আমরা আর কোনো ভারতীয়র গায়ে হাত দেবো না। আমরা লুট করবো ব্রিটিশ সরকারের কোষাগার। কারণ যে টাকা ব্রিটিশরা ট্যাক্স হিসেবে ভারতীয়দের কাছ থেকে লুট করছে, সেই টাকা সরকারি ট্রেনে করে লখনউ নিয়ে যাওয়া হয়। সেই টাকা আসলে আমাদেরই।
বিপ্লবীরা বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করছিলেন যে, ৮-ডাউন সাহারানপুর-লখনউ প্যাসেঞ্জার ট্রেনে করে ব্রিটিশ সরকারের সংগৃহীত ট্যাক্সের টাকা একটি লোহার সিন্দুকে ভরে লখনউয়ের মূল সরকারি ট্রেজারিতে নিয়ে যাওয়া হয়। রামপ্রসাদ বিসমিল সিদ্ধান্ত নিলেন, এই ট্রেনটিকেই মাঝপথে আটকাতে হবে।
তারিখ ঠিক হলো—৯ই আগস্ট, ১৯২৫ সাল। এই অপারেশনের মূল দায়িত্বে ছিলেন রামপ্রসাদ বিসমিল এবং তাঁর ডান হাত হিসেবে কাজ করছিলেন আশফাকউল্লা খান। এছাড়াও এই ঐতিহাসিক অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন চন্দ্রশেখর আজাদ, রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়ী, শচীন্দ্র বকশী, মন্মথনাথ গুপ্ত, মুকুন্দি লাল, বনওয়ারী লাল, মুরারী শর্মা এবং কুন্দন লাল। মোট ১০ জন দুঃসাহসী যোদ্ধা!
পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়ী, শচীন্দ্র বকশী এবং আশফাকউল্লা খান ট্রেনের সেকেন্ড ক্লাস কম্পার্টমেন্টে সাধারণ যাত্রীর বেশে চড়ে বসেন। ট্রেনটি যখন কাকোরি স্টেশন ছেড়ে লখনউয়ের দিকে রওনা দেয়, তখন ঠিক মাঝপথে, নির্জন এক জায়গায় রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়ী ট্রেনের চেইন টেনে ধরেন।
ট্রেনটি থমকে দাঁড়াল। চালক এবং গার্ড কিছু বুঝে ওঠার আগেই অন্ধকার থেকে চিত্কার করে উঠলেন চন্দ্রশেখর আজাদ এবং রামপ্রসাদ বিসমিল। তাঁরা ট্রেনের চারপাশ ঘিরে ফেললেন। বিপ্লবীরা ফাঁকা আওয়াজ করতে লাগলেন এবং যাত্রীদের উদ্দেশ্যে বললেন, "আপনারা কেউ ভয় পাবেন না। আমরা আপনাদের কোনো ক্ষতি করতে আসিনি। আমরা দেশের বিপ্লবী। আমরা কেবল ব্রিটিশ সরকারের অন্যায়ভাবে লুটে নেওয়া টাকা ফেরত নিতে এসেছি। আপনারা ট্রেনের ভেতরেই থাকুন।"
বিপ্লবীদের মূল লক্ষ্য ছিল ট্রেনের গার্ডের বগিতে থাকা সেই বিশাল লোহার সিন্দুকটি। আশফাকউল্লা খান ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী। তিনি এবং মনমথনাথ গুপ্ত ভারী কুড়াল নিয়ে সিন্দুকটি ভাঙার চেষ্টা করতে লাগলেন। লোহার ভারী সিন্দুকটি সহজে ভাঙছিল না। চারিদিকে তখন টানটান উত্তেজনা। যে কোনো সময় লখনউ থেকে পুলিশ চলে আসতে পারে। চন্দ্রশেখর আজাদ পিস্তল হাতে পাহারায় ছিলেন, যাতে কেউ ট্রেনের কাছে আসতে না পারে।
অবশেষে আশফাকউল্লা খানের প্রচণ্ড আঘাতে সিন্দুকের লকটি ভেঙে যায়। সিন্দুকের ভেতর থেকে সরকারি টাকার থলিগুলো বের করে বিপ্লবীরা নিজেদের চাদরে বাঁধতে শুরু করেন। সেই সিন্দুকে সেদিন ছিল প্রায় ৪,৬০০ টাকা—যা আজকের যুগে কয়েক কোটি টাকার সমান!
কিন্তু এই চরম সফলতার মাঝেই ঘটে গেল একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। মন্মথনাথ গুপ্তের হাতের মাউজার পিস্তল থেকে অসাবধানতাবশত একটি গুলি চলে যায়। সেই গুলিটি গিয়ে লাগে আহমেদ আলী নামের এক সাধারণ ট্রেন যাত্রীর গায়ে, যিনি তাঁর স্ত্রীকে দেখতে অন্য বগি থেকে নেমে এসেছিলেন। ঘটনাস্থলে মৃত্যু হয় তার । এটি ছিল এই অভিযানের একমাত্র অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু। এর ফলে ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ ডাকাতি থাকল না, ব্রিটিশ সরকারের চোখে এটি একটি 'খুনসহ ডাকাতি' বা মার্ডারের মামলায় রূপ নিল।
টাকা সংগ্রহ করে বিপ্লবীরা অন্ধকার জঙ্গলের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন দিকে পালিয়ে গেলেন। ব্রিটিশ পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই স্পট একদম পরিষ্কার!

বন্ধুরা, এই ঘটনার পর ব্রিটিশ সরকারের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গিয়েছিল। ভারতের বুকে একদল তরুণ সরকারি ট্রেন থামিয়ে টাকা লুট করে চলে গেল, আর পুলিশ কিছুই করতে পারল না—এটা ছিল ব্রিটিশ রাজের জন্য এক বিরাট অপমান। লর্ড রিডিংয়ের নেতৃত্বাধীন ব্রিটিশ সরকার এই ঘটনার তদন্তের জন্য স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সমকক্ষ গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক তৈরি করল। CID-র সেরা অফিসারদের এই কেসের দায়িত্বে লাগানো হলো।
বিপ্লবীরা এতটাই নিখুঁতভাবে অপারেশনটি করেছিলেন যে পুলিশ প্রথমে কোনো সূত্রই খুঁজে পাচ্ছিল না। কিন্তু একটি ছোট ভুল সবকিছু ওলটপালট করে দিল। কাকোরি স্টেশনের কাছে তদন্ত করার সময় পুলিশ একটি চাদর খুঁজে পায়। সেই চাদরটি কোনো এক বিপ্লবী তাড়াহুড়ো করে ফেলে গিয়েছিলেন। চাদরটিতে একটি ধোপার মার্ক বা সিল মারা ছিল।
পুলিশ সেই ধোপার সিল ধরে তদন্ত করতে করতে পৌঁছে গেল শাহজাহানপুরে। জানা গেল, চাদরটি ছিল বিপ্লবী রামপ্রসাদ বিসমিলের এক সহযোগীর। এরপর পুলিশ পুরো এলাকায় গুপ্তচর নিয়োগ করল।
১৯২৫ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর, অর্থাৎ ঘটনার মাত্র দেড় মাসের মাথায় ব্রিটিশ পুলিশ এক যোগে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অভিযান চালাল। রামপ্রসাদ বিসমিল, শচীন্দ্রনাথ সান্যাল, যোগেশচন্দ্র চ্যাটার্জি সহ হিন্দুস্তান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের প্রায় ৪০ জন বিপ্লবীকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গ্রেফতার করা হলো।
কিন্তু পুলিশের হাত এড়াতে সক্ষম হলেন দুজন প্রধান ব্যক্তি—চন্দ্রশেখর আজাদ এবং আশফাকউল্লা খান। চন্দ্রশেখর আজাদ ছদ্মবেশ ধারণে ওস্তাদ ছিলেন, তাই পুলিশ তাঁকে ছুঁতেও পারল না। অন্যদিকে আশফাকউল্লা খান পালিয়ে বিহার হয়ে দিল্লি চলে যান। তিনি দেশ ছেড়ে বিদেশে গিয়ে ওখান থেকে বিপ্লব চালানোর পরিকল্পনা করছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, দিল্লির এক বন্ধু টাকার লোভে আশফাকউল্লার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং পুলিশকে খবর দেয়। অবশেষে ১৯২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে আশফাকউল্লা খানও গ্রেফতার হন।
১৯২৬ সালের লখনউয়ের বিশেষ আদালতে শুরু হলো ঐতিহাসিক 'কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলা'। ব্রিটিশ সরকার এই মামলাটির পেছনে জলবৎ পয়সা খরচ করেছিল। বিপ্লবীদের পক্ষে লড়াই করার জন্য দেশের বড় বড় আইনজীবীরা এগিয়ে এসেছিলেন, যার মধ্যে ছিলেন গোবিন্দ বল্লভ পন্থের মতো ব্যক্তিত্ব। এমনকি জওহরলাল নেহেরুও বিপ্লবীদের সাথে দেখা করতে জেলে গিয়েছিলেন।
জেলখানার ভেতরেও বিপ্লবীরা দমে যাননি। রামপ্রসাদ বিসমিল এবং আশফাকউল্লা খানের বন্ধুত্ব ছিল ভারতের হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের এক অনন্য প্রতীক। ব্রিটিশরা আশফাকউল্লাকে প্রলোভন দেখিয়েছিল যে, "তুমি যদি মুসলিম হয়ে একজন হিন্দুর দলে না থেকে সরকারি সাক্ষী হও, তবে তোমাকে ছেড়ে দেওয়া হবে।" আশফাকউল্লা গর্জে উঠে বলেছিলেন, রামপ্রসাদ বিসমিল আমার ভাই। আর ভারতের স্বাধীনতার চেয়ে বড় আমার কাছে কোনো ধর্ম নেই।
জেলখানার অন্ধকার কুঠুরিতে বসেই রামপ্রসাদ বিসমিল লিখেছিলেন তাঁর সেই অমর কবিতা—
"সরফরোশি কি তামান্না আব হামারে দিল মে হ্যায়,
দেখনা হ্যায় জোর কিতনা বাজু-এ-কাতিল মে হ্যায়..."
দীর্ঘ দেড় বছর ধরে চলা এই প্রহসনের বিচারের পর, ১৯২৭ সালের জুলাই মাসে আদালত চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করে। ব্রিটিশ সরকার বিপ্লবীদের এমন শাস্তি দিতে চেয়েছিল যাতে ভবিষ্যতে কেউ আর সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্র তোলার সাহস না পায়।
আদালত চারজন প্রধান বিপ্লবীকে মৃত্যুদণ্ড অর্থাৎ ফাঁসির আদেশ দেয়। তাঁরা হলেন—রামপ্রসাদ বিসমিল, আশফাকউল্লা খান, রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়ী এবং রোশন সিং। শচীন্দ্রনাথ সান্যালকে দেওয়া হয় আন্দামানে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড (কালাপানি)। বাকি বিপ্লবীদের ৫ থেকে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
১৯২৭ সালের ডিসেম্বরের সেই কালো দিনগুলো ঘনিয়ে এল।
১৭ই ডিসেম্বর, নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগেই গোন্ডা জেলে ফাঁসি দেওয়া হয় রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়ীকে, কারণ ব্রিটিশরা ভয় পেয়েছিল যে বিপ্লবীরা জেল ভেঙে তাঁকে মুক্ত করতে পারে।
১৯শে ডিসেম্বর, গোরক্ষপুর জেলে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে ফাঁসির দড়ি গলায় পরে নেন রামপ্রসাদ বিসমিল। তাঁর শেষ কথা ছিল, "ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন হোক।"
ঠিক একই দিনে, ফৈজাবাদ জেলে ফাঁসি দেওয়া হয় আশফাকউল্লা খানকে। ফাঁসির দড়িটি চুমু খেয়ে তিনি বলেছিলেন, "আমি কোনো অপরাধ করিনি। আমার এই কোরবানি বৃথা যাবে না।"
এবং এলাহাবাদ জেলের মালাকাওয়াত-এ ফাঁসি দেওয়া হয় ঠাকুর রোশন সিংকে।
এই চারজন তরুণ দেশের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করলেন। তাঁদের বয়স তখন কতই বা ছিল? মাত্র ২৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে!

বন্ধুরা, ব্রিটিশরা ভেবেছিল কাকোরির বিপ্লবীদের ফাঁসি দিয়ে তারা ভারতের বিপ্লবী আন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেবে। কিন্তু তারা ভুল ভেবেছিল। কাকোরি ট্রেন অ্যাকশন ভারতের যুবসমাজের মনে যে আগুনের স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দিয়েছিল, তা পরবর্তীতে দাবানলে রূপ নেয়।
এই ঘটনার পর চন্দ্রশেখর আজাদ দমে যাননি। তিনি ভগৎ সিং, সুখদেব এবং রাজগুরুর মতো তরুণদের সাথে নিয়ে হিন্দুস্তান রিপাবলিক অ্যাসোসিয়েশন-কে পুনর্গঠিত করেন এবং নাম দেন HSRA (Hindustan Socialist Republican Association)। কাকোরির শহীদদের রক্ত বৃথা যায়নি। তাঁদের ফাঁসির প্রতিশোধ নিতেই পরবর্তীতে ভগৎ সিংরা লালা লাজপত রায়ের মৃত্যুর পর ব্রিটিশ পুলিশ অফিসার স্যান্ডার্সকে হত্যা করেন এবং সেন্ট্রাল অ্যাসেম্বলিতে বোমা ফেলেন।
কাকোরি ট্রেন ডাকাতি কেবল একটি সরকারি ট্রেন লুট করার ঘটনা ছিল না; এটি ছিল ভারতীয়দের আত্মসম্মান, সাহস এবং ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে এক প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ। আজ আমরা যে স্বাধীন ভারতে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিচ্ছি, তার পেছনে রয়েছে রামপ্রসাদ বিসমিল, আশফাকউল্লা খানদের মতো শত শত বিপ্লবীদের বলিদান।
২০২১ সালে উত্তরপ্রদেশ সরকার এই ঐতিহাসিক ঘটনার সম্মানার্থে এর নাম পরিবর্তন করে 'কাকোরি ট্রেন অ্যাকশন' বা 'কাকোরি ট্রেন শৌর্য দিবস' রেখেছে, কারণ 'ডাকাতি' শব্দটি আমাদের দেশের বীর বিপ্লবীদের জন্য মানানসই নয়। তাঁরা ডাকাত ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন আমাদের দেশের গর্ব, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামী।
আজকের এই বিশেষ ব্লগটিতে এই বীর শহীদদের স্মরণে উৎসর্গ করলাম। ইতিহাসের এই রোমহর্ষক অধ্যায়টি আপনার কেমন লাগল, কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। রামপ্রসাদ বিসমিল এবং আশফাকউল্লার এই অমর আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধা জানাতে পোস্টি প্রচুর শেয়ার করুন। দেখা হবে পরের ব্লগে। জয় হিন্দ, বন্দে মাতরম!

মন্তব্যসমূহ