মাস্টারদা এবং চট্টগ্রাম যুববিদ্রোহের মহাকাব্য।

নমস্কার বন্ধুরা।
আজ থেকে প্রায় এক শতাব্দী আগে, অবিভক্ত বাংলার একটি ছোট্ট জেলা শহর কেঁপে উঠেছিল এমন এক হুঙ্কারে, যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। আজ আমরা ফিরে যাব ১৯৩০ সালের ১৮ই এপ্রিলের সেই রক্তঝরা রাতে। যখন মুষ্টিমেয় কিছু তরুণ, পকেটে সামান্য কিছু টাকা আর বুকে হিমালয়সমান সাহস নিয়ে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। আজ আমরা কথা বলব চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন এবং মহানায়ক মাস্টারদা সূর্য সেন-এর অপরাজেয় বীরত্বের গল্প নিয়ে।
একটু ভাবুন তো, ১৯৩০ সালের ভারতের প্রেক্ষাপট কেমন ছিল? চারদিকে মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলন চলছে। কিন্তু বাংলার একদল তরুণ তখন বুঝতে পেরেছিলেন, শুধু অনুরোধ আর আবেদনে এই অহঙ্কারী ব্রিটিশরা এদেশ ছাড়বে না। রক্ত দিতে হবে, রক্ত নিতে হবে। আর এই ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন চট্টগ্রামের এক সাধারণ স্কুলের শিক্ষক—সূর্যকুমার সেন, যাকে আমরা শ্রদ্ধার সাথে ডাকি 'মাস্টারদা'।
তিনি দেখতে কেমন ছিলেন? কোনো বিশাল দেহী পুরুষ নন, সাধারণ ধুতি-পাঞ্জাবি পরা, মৃদুভাষী একজন মানুষ। কিন্তু তাঁর চোখের দিকে তাকালে দেখা যেত স্বাধীনতার এক জ্বলন্ত শিখা। তিনি চট্টগ্রামকে বেছে নিয়েছিলেন এক মহাবিপ্লবের ক্ষেত্র হিসেবে। তিনি গড়ে তুলেছিলেন 'ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি, চিটাগং ব্রাঞ্চ'।

দিনটি ছিল ১৮ই এপ্রিল, ১৯৩০ সাল। সেদিন ছিল গুড ফ্রাইডে। ব্রিটিশ অফিসাররা সবাই তখন ক্লাবে মদ্যপান আর আমোদ-প্রমোদে ব্যস্ত। তারা স্বপ্নেও ভাবেনি যে, এই শান্ত শহরের তরুণেরা তাদের জন্য এক কালরাত্রি অপেক্ষা করে রেখেছে।
রাত ঠিক ১০টা। মাস্টারদার সুনিপুণ পরিকল্পনায় বিপ্লবীরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে একযোগে আক্রমণ চালালেন।
প্রথম দল: অনন্ত সিং এবং গণেশ ঘোষের নেতৃত্বে আক্রমণ হলো পুলিশ অস্ত্রাগারে।
দ্বিতীয় দল: লোকনাথ বল এবং নির্মল সেনের নেতৃত্বে আক্রমণ হলো অক্সিলিয়ারি ফোর্সের অস্ত্রাগারে।
তৃতীয় দল: সুখেন্দু দস্তিদারের দল ধ্বংস করে দিল টেলিফোন এবং টেলিগ্রাফ ভবন। পুরো চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হলো বাকি পৃথিবী থেকে।
চতুর্থ দল: আরেকটি দল ধুম নামক স্থানে রেললাইন উপড়ে ফেলল, যাতে ঢাকা বা কলকাতা থেকে কোনো সৈন্য আসতে না পারে।
বিপ্লবীরা সফল হলেন! পুলিশ অস্ত্রাগার দখল করে তারা চিৎকার করে উঠলেন—"বন্দেমাতরম" এবং "ইনকিলাব জিন্দাবাদ"।
কিন্তু নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস! অস্ত্রাগার তো দখল হলো, কিন্তু দেখা গেল সেখানে প্রচুর রাইফেল ও মাস্কেট রয়েছে, অথচ কোনো গুলি বা গোলাবারুদ নেই! সেগুলো অন্য এক গোপন কক্ষে লক করা ছিল। গোলাবারুদ ছাড়া এই ভারী বন্দুকগুলো তো কেবল লোহার টুকরো!
তবুও বিপ্লবীরা দমে যাননি। সেই রাতেই পুলিশ লাইন্সের মাঠে ভারতের তেরঙা জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হলো। মাস্টারদা সূর্য সেনকে দেওয়া হলো সামরিক অভিবাদন এবং ঘোষণা করা হলো চট্টগ্রামের অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার। ভাবা যায়? মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও, চট্টগ্রামকে ব্রিটিশ শাসন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে স্বাধীন ঘোষণা করেছিলেন এই বীরেরা!
ব্রিটিশরা চুপ করে বসে থাকার পাত্র ছিল না। চারদিক থেকে সেনাবাহিনী আসতে শুরু করল। মাস্টারদা বুঝতে পারলেন, শহরের খোলা ময়দানে টিকে থাকা সম্ভব নয়। তিনি তাঁর বাহিনী নিয়ে আশ্রয় নিলেন জালালাবাদ পাহাড়ে।
তারিখটা ছিল ২২শে এপ্রিল। তীব্র গরমে, জল ও খাবার ছাড়া পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থান করছিলেন বিপ্লবীরা। ঠিক তখনই ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন টেট-এর নেতৃত্বে ল্যাঙ্কাশায়ার রেজিমেন্ট এবং সুরমা ভ্যালি লাইট হর্স-এর হাজার খানেক সশস্ত্র সৈন্য পাহাড়টি ঘিরে ফেলে।
শুরু হলো এক অসম যুদ্ধ। একদিকে ব্রিটিশদের আধুনিক মেশিনগান আর থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল, অন্যদিকে বিপ্লবীদের কাছে থাকা সাধারণ বন্দুক। কিন্তু কী অদ্ভুত সেই লড়াই! পাহাড়ের ওপর থেকে কিশোর বিপ্লবীরা যেভাবে গুলি ছুড়ছিলেন, তাতে ব্রিটিশ সেনারা দিশেহারা হয়ে পড়ে।
এই জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধে শহীদ হলেন ১২ জন তরতাজা বিপ্লবী। এদের মধ্যে ছিলেন—হরুগোপাল বল, নির্মল লালা, বিধুভূষণ ভট্টাচার্য, শশাঙ্ক দত্তের মতো তরুণেরা। অনেকের বয়স তো তখন মাত্র ১৫ বা ১৬ বছর! এই বয়সে আজ আমরা ভিডিও গেম খেলি, ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবি, আর সেই বয়সে তারা দেশের জন্য বুকের রক্ত ঢেলে দিচ্ছিলেন।
ব্রিটিশদের পক্ষেও প্রায় ৭০-৮০ জন সৈন্য নিহত হয়। রাতের অন্ধকারে ব্রিটিশ বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। জালালাবাদের যুদ্ধ প্রমাণ করে দিয়েছিল, ভারতীয় তরুণেরা সামনাসামনি যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীকে পরাস্ত করার ক্ষমতা রাখে।

জালালাবাদ যুদ্ধের পর বিপ্লবীরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে গেরিলা যুদ্ধের পথ বেছে নেন। মাস্টারদা গ্রামের সাধারণ মানুষের বাড়িতে আশ্রয় নেন। চট্টগ্রামের সাধারণ কৃষক, মাঝিরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে, ব্রিটিশদের লোভনীয় পুরস্কারের লোভ অগ্রাহ্য করে মাস্টারদাকে বছরের পর বছর লুকিয়ে রেখেছিলেন।
এই আন্দোলনের আরেকটি স্বর্ণালী অধ্যায় হলো নারীদের অংশগ্রহণ। মাস্টারদা প্রমাণ করেছিলেন যে দেশের স্বাধীনতায় নারীদের ভূমিকা কোনো অংশে কম নয়। তিনি দায়িত্ব দিলেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এবং কল্পনা দত্তকে।
১৯৩২ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর প্রীতিলতার নেতৃত্বে আক্রমণ হয় পাহাড়তলী ইউরোপীয় ক্লাবে। যে ক্লাবের বাইরে সাইনবোর্ডে লেখা থাকত—"ডগস অ্যান্ড ইন্ডিয়ানস আর নট অ্যালাউড" (কুকুর এবং ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ)। প্রীতিলতা সেই ক্লাবে সফল আক্রমণ চালান। পরে গুলিবিদ্ধ হয়ে ব্রিটিশদের হাতে ধরা পড়ার চেয়ে দেশের জন্য আত্মাহুতি দেওয়া শ্রেয় মনে করে পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে শহীদ হন। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন, দেশের জন্য কীভাবে হাসিমুখে মরতে হয়।
কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা ভারতের ইতিহাসকে বারবার কলঙ্কিত করেছে। ১৯৩৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, নেটত্র সেন নামক এক কুলাঙ্গারের বিশ্বাসঘাতকতায় মাস্টারদা সূর্য সেন গৈরালা গ্রামে যৌথবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন।
মাস্টারদার ওপর যে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তা শুনলে আজও গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। ব্রিটিশরা তার সমস্ত দাঁত হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে দিয়েছিল, নখ উপড়ে ফেলেছিল, এবং তাঁর হাড় ও জয়েন্টগুলো পিটিয়ে গুঁড়ো করে দিয়েছিল। তিনি যাতে ফাঁসির মঞ্চে হেঁটে যেতে না পারেন, তাই অবচেতন অবস্থায় তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল ১৯৩৪ সালের ১২ই জানুয়ারি। ফাঁসি দেওয়ার পর তাঁর মৃতদেহটি একটি লোহার খাঁচায় ভরে বঙ্গোপসাগরের বুকে ফেলে দেওয়া হয়, যাতে তাঁর সমাধি কোনোদিন ভারতীয়দের জন্য তীর্থস্থান না হয়ে ওঠে।
ফাঁসির আগে তাঁর শেষ চিঠিটি ছিল অত্যন্ত আবেগপূর্ণ। তিনি লিখেছিলেন:
"আমার শেষ বাণী—আদর্শ ও একতা। স্বাধীনতার সোনালী সূর্য উদিত হবেই। আমি তোমাদের জন্য রেখে গেলাম কেবল একটি জিনিস, তা হলো আমার স্বপ্ন—একটি স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন।"
বন্ধুরা, মাস্টারদা সূর্য সেন, তারকেশ্বর দস্তিদার, প্রীতিলতা বা জালালাবাদের শহীদদের এই আত্মত্যাগ কি ব্যর্থ হয়েছিল?
না, একদমই না। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক টার্নিং পয়েন্ট। এই ঘটনা পুরো ভারতের যুবসমাজের রক্তে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। ভগৎ সিং থেকে শুরু করে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু—সবাই চট্টগ্রামের এই যুববিদ্রোহের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। নেতাজি তো বলেইছিলেন, চট্টগ্রাম লুণ্ঠনের ঘটনা সমগ্র ভারতের বিপ্লবী চেতনাকে এক লাফে বহু বছর এগিয়ে দিয়েছে।
আজ আমরা একটি স্বাধীন দেশে বাস করছি। আমরা স্বাধীনভাবে শ্বাস নিচ্ছি, কথা বলছি। কিন্তু এই স্বাধীনতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন সূর্য সেনের মতো শিক্ষকেরা, প্রীতিলতার মতো ছাত্রীরা এবং জালালাবাদের সেই কিশোরেরা।
আজকের প্রজন্মের কাছে আমার একটাই প্রশ্ন—আমরা কি তাদের সেই স্বপ্নের মর্যাদা দিতে পারছি? দেশপ্রেম মানে শুধু বিশেষ কোনো দিনে জাতীয় পতাকা ওড়ানো বা ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া নয়। দেশপ্রেম মানে নিজের কাজ সততার সাথে করা, দেশের মানুষকে ভালোবাসা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া।
আসুন, আজ এই ব্লগের মাধ্যমে আমরা চট্টগ্রামের সেই অমর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। তাঁদের বীরত্বগাথা যেন আমাদের প্রতিদিন অনুপ্রাণিত করে একটি সুন্দর, বৈষম্যহীন এবং শক্তিশালী সমাজ গড়ে তুলতে।
মাস্টারদা সূর্য সেন এবং সকল বিপ্লবীদের স্মৃতি অমর হোক।
ইনকিলাব জিন্দাবাদ! জয় হিন্দ!
ধন্যবাদ।

মন্তব্যসমূহ