লুধিয়ানা ব্যাংক ডাকাতি ভারতের ইতিহাসের এক রোমহর্ষক ও রহস্যময় অধ্যায় ।

১২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৭। ঘড়িতে তখন সকাল ঠিক ৯টা ৪৫ মিনিট। পাঞ্জাবের লুধিয়ানার শিল্পনগরী সবেমাত্র জেগে উঠছে। শীতের সকালের কুয়াশা কেটে চারপাশটা তখনো পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি। ঠিক এই সময়ে লুধিয়ানার মিলার গঞ্জ এলাকায় অবস্থিত পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রধান শাখায় প্রতিদিনের মতোই সাধারণ মানুষ এবং ব্যাংক কর্মীরা আসতে শুরু করেছেন। কেউ জানতেন না আর মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে এই ব্যাংকের ভেতরে এমন কিছু ঘটতে চলেছে যা শুধু পাঞ্জাব বা ভারতকে নয় পুরো বিশ্বকে চমকে দেবে।
এটি কোনো সাধারণ চুরি বা পকেটমারি ছিল না। এটি ছিল ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ব্যাংক ডাকাতি। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে কোনো রকম রক্তপাত না ঘটিয়ে একটিও গুলি না চালিয়ে একদল সশস্ত্র মানুষ ব্যাংক থেকে গায়েব করে দিয়েছিল ৫ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা।
১৯৮৭ সালের হিসেবে ৫ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা আজকের দিনে দাঁড়িয়ে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ কোটি টাকার সমান। কিন্তু কারা ছিল এই মাস্টারমাইন্ড। কীভাবে পুলিশের নাকের ডগা দিয়ে তারা এই অবিশ্বাস্য অপারেশন সফল করেছিল। আর কেনই বা এই ডাকাতির পেছনে লুকিয়ে ছিল ভারতের একটি বড় রাজনৈতিক এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী ইতিহাস। আজ আমরা উন্মোচন করব লুধিয়ানা ব্যাংক ডাকাতির সেই রোমহর্ষক গল্প।

এই ঘটনার গভীরে যাওয়ার আগে আমাদের একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। ১৯৮০-র দশক পাঞ্জাবের বুক জুড়ে তখন চরম অশান্তি। খলিস্তান আন্দোলনের উত্তাল হাওয়া বইছে চারিদিকে। একদিকে কেন্দ্রীয় সরকার অন্যদিকে সশস্ত্র খলিস্তানি চরমপন্থীরা। এই আন্দোলনের অন্যতম একটি বড় সশস্ত্র গোষ্ঠী ছিল 'খলিস্তান লিবারেশন ফোর্স' বা KLF।
যেকোনো আন্দোলন বা সশস্ত্র লড়াই চালাতে গেলে সবচেয়ে বেশি কিসের প্রয়োজন হয়। উত্তরটা খুব সহজ—টাকা এবং অস্ত্র। KLF-এর তৎকালীন প্রধান লাভ সিং এবং তাঁর সহযোগীরা বুঝতে পেরেছিলেন সরকারের বিরুদ্ধে বড় লড়াই লড়তে গেলে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন। আর সেই অর্থের খোঁজে তারা টার্গেট করে লুধিয়ানার পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংককে। কারণ তারা খবর পেয়েছিল এই নির্দিষ্ট শাখায় পাঞ্জাবের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সরকারের বিপুল পরিমাণ ক্যাশ জমা করা হচ্ছে।
ডাকাতির মূল মাস্টারমাইন্ড ছিলেন ডালজিৎ সিং বিট্টু এবং লাভ সিং। তারা কিন্তু কোনো আনাড়ি অপরাধী ছিলেন না। তারা ছিলেন অত্যন্ত শিক্ষিত চতুর এবং রণকৌশলে পারদর্শী। তারা মাসের পর মাস ধরে এই ব্যাংকের সিকিউরিটি পুলিশ ফাঁড়ির দূরত্ব এবং কর্মীদের যাতায়াতের সময় নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তারা এমন একটি প্ল্যান তৈরি করেছিলেন যেখানে শক্তির চেয়ে বুদ্ধির ব্যবহার ছিল অনেক বেশি।
ফিরে আসা যাক ১২ ফেব্রুয়ারির সেই সকালে। ব্যাংকের ভেতরে তখন ক্যাশিয়াররা টাকা গোছাচ্ছেন ম্যানেজার নিজের কেবিনে বসে চা খাচ্ছেন। ঠিক তখনই ব্যাংকের সামনে এসে থামল দুটি গাড়ি। গাড়ি থেকে নেমে এলেন জনা বারো-চোদ্দো জন ব্যক্তি। তাদের পরনে ছিল পাঞ্জাব পুলিশের উর্দি এবং হাতে ছিল অত্যাধুনিক রাইফেল।
ব্যাংকের সিকিউরিটি গার্ড ভেবেছিলেন হয়তো রুটিন চেকিং বা কোনো বড় ভিআইপি-র টাকা এসকর্ট করতে পুলিশ এসেছে। তাই তিনি বিন্দুমাত্র সন্দেহ না করে স্যালুট জানিয়ে ব্যাংকের মূল দরজা খুলে দেন। ব্যস, এখানেই শেষ হয়ে গেল ব্যাংকের প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
ভেতরে ঢোকার সাথে সাথেই পুলিশের পোশাকে থাকা সেই যুবকদের রূপ বদলে গেল। তারা আর পুলিশ অফিসার ছিলেন না তারা ছিলেন ডাকাত। মুহূর্তের মধ্যে তারা ব্যাংকের সমস্ত গেট ভেতর থেকে লক করে দেন। ব্যাংকের কর্মচারীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই লাইনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয় সবাইকে।
ম্যানেজারের কপালে ঠান্ডা রাইফেলের নল ঠেকিয়ে শান্ত গলায় একজন বললেন কোনো চালাকি নয়। আমরা এখানে কাউকে মারতে আসিনি। আমাদের যা চাই, চুপচাপ দিয়ে দিন। একটা আওয়াজ হলে সবার লাশ পড়বে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় কী জানেন। তারা ব্যাংকের ভেতরে থাকা সাধারণ গ্রাহকদের গায়ে হাতও তোলেনি। অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় প্রফেশনাল আর্মির মতো তারা পুরো ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়।
ডাকাতি বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে হইহুল্লোড় ভাঙচুর বা চিৎকার। কিন্তু লুধিয়ানার এই ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। ব্যাংকের ক্যাশ কাউন্টার এবং মূল ভল্ট বা স্ট্রং রুমের চাবি কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় আসল খেলা।
ডাকাত দল সাথে করে নিয়ে এসেছিল বড় বড় পাটের বস্তা। ভল্টে রাখা থরে থরে সাজানো নোটের বান্ডিল তারা ব্যাগে ভরতে শুরু করে। ১০ টাকা, ৫০ টাকা, ১০০ টাকার নোট নয় তারা বেছে বেছে শুধু ৫০০ এবং ১০০ টাকার বড় নোটগুলো ব্যাগে ভরছিল। মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে তারা প্রায় ৫ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা বস্তাবন্দি করে ফেলে।
টাকা গোছানো শেষ হতেই তারা অত্যন্ত শান্তভাবে ব্যাংকের সমস্ত কর্মচারী এবং গ্রাহকদের একটি বড় স্ট্রং রুমের ভেতর ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালা মেরে দেয়। শুধু তাই নয় যাওয়ার আগে ব্যাংকের সমস্ত ল্যান্ডলাইন ফোনের তার কেটে দেয় যাতে কেউ তৎক্ষণাৎ পুলিশকে খবর দিতে না পারে।
এরপর তারা পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে পার্ক করে রাখা গাড়িতে চড়ে চম্পট দেয়। লুধিয়ানার ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে গাড়িগুলো যখন চলে যাচ্ছিল কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে ওই গাড়ির ভেতরে ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় লুটের মাল রয়েছে।
যখন ব্যাংক কর্মীরা অনেক চেষ্টায় দরজা ভেঙে চিৎকার শুরু করেন ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। পুলিশ যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ডাকাতরা তখন লুধিয়ানা শহর পার হয়ে নিরাপদ ডেরায় পৌঁছে গেছে।

এই ঘটনা প্রকাশ হতেই পুরো ভারতে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকার থেকে শুরু করে পাঞ্জাব পুলিশ—সবার রাতের ঘুম উড়ে যায়। কারণ এটা শুধু একটা ডাকাতি ছিল না এটা ছিল সরকারের গালে একটা বিরাট থাপ্পড়। খলিস্তান আন্দোলনের চরম সময়ে এই বিপুল পরিমাণ টাকা যদি জঙ্গিদের হাতে চলে যায় তবে পরিস্থিতি কতটা ভয়ানক হতে পারে তা পুলিশ খুব ভালো করেই জানত।
তদন্তে নামে ভারতের শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই (CBI) এবং পাঞ্জাব পুলিশের স্পেশাল টিম। শুরু হয় ব্যাপক তল্লাশি। সন্দেহভাজনদের তালিকা তৈরি করা হয়। পুলিশ জানতে পারে এই ডাকাতির পেছনে সরাসরি হাত ছিল খলিস্তান লিবারেশন ফোর্সের।
পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যে পুলিশ এই চক্রের বেশ কয়েকজন সদস্যকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। উদ্ধার করা হয় লুটের কিছু অংশ। কিন্তু সিংহভাগ টাকাই ততক্ষণে দেশের বাইরে বা আন্দোলনের বিভিন্ন গোপন তহবিলে চালান হয়ে গিয়েছিল।
এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া চলেছিল দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে। ২০১২ সালে, অর্থাৎ ঘটনার ২৫ বছর পর লুধিয়ানার একটি বিশেষ আদালত এই মামলার রায় ঘোষণা করে। ডালজিৎ সিং বিট্টুসহ মোট ৯ জনকে দোষী সাব্যস্ত করে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু ততদিনে এই ঘটনার মূল হোতা লাভ সিং পুলিশের সাথে এক এনকাউন্টারে মারা গেছেন।

১৯৮৭ সালের লুধিয়ানা ব্যাংক ডাকাতি শুধু অপরাধের ইতিহাসে একটি বড় চ্যাপ্টার নয় এটি পাঞ্জাবের সেই অন্ধকার এবং রক্তাক্ত সময়ের একটি প্রতীক। এই ডাকাতির টাকা দিয়ে পরবর্তী সময়ে প্রচুর আধুনিক অস্ত্র কেনা হয়েছিল যা পাঞ্জাবের হিংসার আগুনকে আরও কয়েক বছর টিকিয়ে রেখেছিল। Guinness Book of World Records-এও একসময় ভারতের এই ব্যাংক ডাকাতির নাম উঠে এসেছিল তার বিশাল অঙ্কের কারণে।
আজ লুধিয়ানার সেই মিলার গঞ্জ এলাকার পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকে গেলে হয়তো আর সেই আতঙ্কের পরিবেশ পাওয়া যাবে না। ব্যাংকের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন অনেক আধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরায় মোড়া, লকারগুলো ডিজিটাল। কিন্তু আজও ভারতের ক্রাইম হিস্ট্রির পাতায় ১২ ফেব্রুয়ারির সেই সকালটি একটি রোমাঞ্চকর এবং অবিশ্বাস্য সত্য ঘটনা হিসেবে রয়ে গেছে।
একটিও বুলেট না ছুড়ে কাউকে আঘাত না করে কীভাবে নিখুঁত পরিকল্পনার মাধ্যমে এত বড় একটা অপরাধ ঘটানো সম্ভব—তা আজও অপরাধ বিজ্ঞানীদের অবাক করে।
বন্ধুরা, লুধিয়ানার এই রোমহর্ষক ব্যাংক ডাকাতির ঘটনাটি আপনাদের কেমন লাগল। আপনারা কি এই ধরনের ঐতিহাসিক অপরাধের কাহিনী আরও শুনতে চান।কমেন্ট বক্সে আপনাদের মতামত অবশ্যই জানান। ব্লগ টি ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন এবং এই ধরনের আরও অজানা ইতিহাসের গল্প জানতে আমাদের ফলো করতে ভুলবেন না।
আজকের মতো এখানেই শেষ করছি। দেখা হবে পরের পোস্টে। ভালো থাকবেন, সতর্ক থাকবেন। ধন্যবাদ।

মন্তব্যসমূহ