বিয়াস প্রজেক্ট (BEAS) কী।
নমস্কার বন্ধুরা।আপনারা কি কখনো ভেবে দেখেছেন, ভারতের পাঞ্জাব হরিয়ানা এবং রাজস্থানের মতো রাজ্যগুলোর সবুজ শস্যক্ষেত যেখানে আজ কোটি কোটি মানুষের জন্য খাদ্য উৎপাদিত হচ্ছে সেগুলো একসময় কতটা শুষ্ক ছিল।ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের এই বিশাল পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে একটি অলৌকিক প্রকৌশল বা ইঞ্জিনিয়ারিং মার্ভেল। হ্যাঁ, আজ আমরা কথা বলছি ভারতের অন্যতম বৃহত্তম এবং গুরুত্বপূর্ণ বহুমুখী নদী উপত্যকা পরিকল্পনা— বিয়াস প্রজেক্ট সম্পর্কে।
সিন্ধু নদ অববাহিকার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এই বিয়াস বা বিপাশা নদী। এই নদীর জলকে নিয়ন্ত্রণ করে কীভাবে তিনটি রাজ্যের ভাগ্য বদলে দেওয়া হয়েছিল কীভাবে মরুভূমিতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল জল আর কীভাবে উৎপাদিত হচ্ছে শত শত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ— আজ এই ব্লগে আমরা বিয়াস প্রজেক্টের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ ইতিহাস এবং এর ভেতরের গল্প বিস্তারিত জানবো। ব্লগ টি সম্পূর্ণ পড়ার অনুরোধ রইলো কারণ আজকের ব্লগ টি তথ্য এবং জ্ঞানে ভরপুর হতে চলেছে।
বন্ধুরা, এই প্রজেক্টের গুরুত্ব বুঝতে হলে আমাদের একটু ইতিহাসে ফিরে যেতে হবে। ১৯৪৭ সালে যখন ভারত ও পাকিস্তান বিভক্ত হয় তখন সিন্ধু নদ অববাহিকার নদীগুলোর জল বণ্টন নিয়ে একটি বড় বিবাদ তৈরি হয়েছিল। কারণ, নদীগুলোর উৎস ভারতে হলেও তার বড় অংশ প্রবাহিত হচ্ছিল পাকিস্তানে। এই সমস্যার সমাধানের জন্য ১৯৬০ সালে ঐতিহাসিক 'সিন্ধু জল চুক্তি' স্বাক্ষরিত হয়।
এই চুক্তি অনুযায়ী তিনটি পূর্ববর্তী নদী— রাভি, বিয়াস এবং সতলেজ-এর জলের ওপর ভারতের পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এবার ভারতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল এই নদীগুলোর জলকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো। বিশেষ করে বর্ষাকালে বিয়াস নদীতে যে ভয়াবহ বন্যা হতো তা রুখতে এবং শুষ্ক মরসুমে সেই জলকে সেচের কাজে ব্যবহার করার জন্য একটি মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়। আর এভাবেই জন্ম নেয় 'বিয়াস প্রজেক্ট'। এটি মূলত পাঞ্জাব, হরিয়ানা এবং রাজস্থান— এই তিন রাজ্যের একটি যৌথ উদ্যোগ।
প্রথম অংশটির নাম বিয়াস-সতলেজ লিঙ্ক। হিমাচল প্রদেশের মান্ডির কাছে অবস্থিত পান্ডো বাঁধ হলো এর মূল কেন্দ্র। এটি একটি 'আর্থ-ফিল ড্যাম' বা মাটি ও পাথর দিয়ে তৈরি বাঁধ।
এর মূল উদ্দেশ্যটা কিন্তু দারুণ চমকপ্রদ।বিয়াস নদীর জলকে সতলেজ বা শতদ্রু নদীতে ডাইভার্ট বা ঘুরিয়ে দেওয়া। এর জন্য পাহাড় কেটে প্রায় ৩৮ কিলোমিটার দীর্ঘ টানেল এবং ওপেন চ্যানেল তৈরি করা হয়েছে। এই জল সতলেজ নদীতে গিয়ে পড়ে এবং সেখানে অবস্থিত বিখ্যাত ভাকরা বাঁধে জলের সরবরাহ বাড়ায়। এর ফলে মাঝপথে 'ডাহার পাওয়ার প্ল্যান্ট'-এ প্রায় ৯৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা সম্ভব হয়।
এবার আসি দ্বিতীয় ইউনিটে যা এই প্রজেক্টের আসল প্রাণ। হিমাচল প্রদেশের তালওয়ারা-র কাছে তৈরি করা হয়েছে বিশাল পং বাঁধ। এটি ভারতের অন্যতম সর্বোচ্চ মাটি ও পাথরের তৈরি বাঁধ যার উচ্চতা প্রায় ১৩৩ মিটার।"
পং বাঁধ তৈরির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল জল সঞ্চয় করা। বর্ষাকালের অতিরিক্ত জল এখানে জমা করে রাখা হয় যা পরে শীতকালে এবং শুষ্ক মরসুমে সেচের কাজে ব্যবহার করা হয়। এই বাঁধের পেছনে যে বিশাল হ্রদ বা জলাধার তৈরি হয়েছে তার নাম 'মহারানা প্রতাপ সাগর'। এটি আজ একটি বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র এবং রামসার সাইট বা আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন জলাভূমি।
বন্ধুরা, এবার ভাবুন এই বিশাল জলরাশি দিয়ে কী করা হয়? এই প্রজেক্টটি ভারতের কৃষিক্ষেত্রে বিশেষ করে 'সবুজ বিপ্লব' এনে দেওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে।
পাঞ্জাব ও হরিয়ানা: এই দুই রাজ্যকে ভারতের 'অন্নভাণ্ডার' বলা হয়। বিয়াস প্রজেক্টের খালের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ হেক্টর জমিতে বারো মাস চাষাবাদ সম্ভব হচ্ছে। গম ও ধানের ফলন বহুগুণ বেড়ে গেছে।
রাজস্থানের মরুভূমি জয়: আপনারা নিশ্চয়ই ইন্দিরা গান্ধী খালের নাম শুনেছেন? এটি বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘতম সেচ খাল। পং বাঁধ থেকে ছাড়া জল এই খালের মাধ্যমে রাজস্থানের থর মরুভূমির গভীরে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। যে রাজস্থানে এক ফোঁটা জলের জন্য মানুষ হাহাকার করতো আজ এই বিয়াস প্রজেক্টের কল্যাণে সেখানে শ্রীগঙ্গানগর বা বিকানেরের মতো জেলাগুলোতে সবুজ ফসল হাসছে। মরুভূমি আজ শস্যশ্যামলা হয়ে উঠেছে।
শুধু কৃষিই নয় বিয়াস প্রজেক্ট ভারতের শক্তির চাহিদাও পূরণ করছে। পং বাঁধের নিচে রয়েছে একটি বিশাল জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র যেখান থেকে ৩৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। আর আগেই যেমনটা বললাম, বিয়াস-সতলেজ লিঙ্কের মাধ্যমে আরও প্রায় ৯৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যায়।
এই উৎপাদিত বিদ্যুৎ পাঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান, হিমাচল প্রদেশ এবং দিল্লির শিল্পকারখানা ঘরবাড়ি এবং কৃষিকাজে নিরবচ্ছিন্ন শক্তির জোগান দিচ্ছে। জলবিদ্যুৎ হওয়ার কারণে এটি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব এবং এর ফলে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টন কার্বন নির্গমন কমানো সম্ভব হচ্ছে। ভাবুন, আজ থেকে কয়েক দশক আগে আমাদের দেশের ইঞ্জিনিয়াররা কতটা দূরদর্শী ছিলেন।
উন্নয়নের পাশাপাশি এই প্রজেক্ট প্রকৃতির বুকে এক অনন্য সুন্দর পরিবেশ তৈরি করেছে। পং বাঁধের জলাধার অর্থাৎ মহারানা প্রতাপ সাগরে প্রতি বছর শীতকালে সাইবেরিয়া এবং মধ্য এশিয়া থেকে লাখ লাখ পরিযায়ী পাখি আসে। এটি পক্ষীপ্রেমীদের জন্য একটি স্বর্গরাজ্য।
এখানে ওয়াটার স্পোর্টস, বোট রাইডিং এবং ইকো-ট্যুরিজমের দারুণ ব্যবস্থা রয়েছে যা স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের একটি বড় উৎস হয়ে উঠেছে। তবে হ্যাঁ, যেকোনো বড় বাঁধ প্রকল্পের মতো এখানেও একসময় অনেক মানুষকে বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছিল যা এই ধরনের মেগা প্রজেক্টের একটি অন্ধকার দিক। কিন্তু সামগ্রিকভাবে দেশের স্বার্থে এই ত্যাগের মূল্য অপরিসীম।
তাহলে বন্ধুরা, আজ আমরা জানলাম কীভাবে হিমাচলের পাহাড়ি নদী বিয়াস-কে বেঁধে ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া হয়েছে এবং ঘর আলোকিত করা হয়েছে। বিয়াস প্রজেক্ট কেবল পাথর আর কংক্রিটের কাঠামো নয় এটি ভারতের আত্মনির্ভরতা এবং আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
আশা করি আজকের এই ব্লগে বিস্তারিত আলোচনা আপনাদের ভালো লেগেছে এবং বিয়াস প্রজেক্ট সম্পর্কে আপনারা অনেক নতুন তথ্য জানতে পেরেছেন। ব্লগটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করবেন আর কমেন্ট করে জানান— ভারতের আর কোন মেগা প্রজেক্ট সম্পর্কে আপনারা জানতে চান।
দেখা হবে পরের ব্লগে ততক্ষণে ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। নমস্কার।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Your valuable feedback or questions below comment Please let me know. Thank you.