ভূমিকম্প চলাকালীন কী ভাবে নিরাপদ থাকা যায়।

ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ যা কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা ছাড়াই আঘাত আনে। কয়েক সেকেন্ডের এই কম্পন মুহূর্তে তছনছ করে দিতে পারে সাজানো সংসার বা শহর। তবে আতঙ্কিত না হয়ে যদি সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তবে প্রাণহানি এবং ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

​আজকের ব্লগে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব ভূমিকম্প চলাকালীন, তার আগে এবং পরে আপনার ঠিক কী করা উচিত।

​ভূমিকম্প: জীবন বাঁচাতে প্রস্তুতি ও করণীয়

​ভূমিকম্পের সময় আমাদের মস্তিষ্ক সাধারণত 'ফাইট অর ফ্লাইট' মোডে চলে যায়, যার ফলে আমরা আতঙ্কিত হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিই। মনে রাখবেন, ভূমিকম্পে কম্পনের চেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় আতঙ্কিত হয়ে ভুলভাবে ছোটাছুটি করার কারণে।

​ ভূমিকম্প চলাকালীন করণীয় (Indoor: ঘরের ভেতরে থাকলে)

​যদি আপনি ঘরের ভেতরে থাকেন, তবে নিচের তিনটি পদক্ষেপ জীবন রক্ষাকারী হিসেবে কাজ করে, যা বিশ্বজুড়ে "Drop, Cover, and Hold on" পদ্ধতি নামে পরিচিত।

  • Drop (মেঝেতে বসে পড়ুন): কম্পন শুরু হওয়া মাত্রই যেখানে আছেন সেখানে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ুন। এতে আপনি ভারসাম্য হারাবেন না এবং পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি কমবে।
  • Cover (আশ্রয় নিন): একটি মজবুত টেবিল বা ডেস্কের নিচে ঢুকে পড়ুন। এটি আপনাকে ওপর থেকে পড়ে যাওয়া সিলিংয়ের টুকরো বা আসবাবপত্র থেকে রক্ষা করবে। যদি আশেপাশে কোনো টেবিল না থাকে, তবে ঘরের কোণে বসে হাত দিয়ে মাথা ও ঘাড় ঢেকে রাখুন।
  • Hold on (ধরে রাখুন): যতক্ষণ কম্পন থামছে না, ততক্ষণ টেবিলের পা শক্ত করে ধরে রাখুন যাতে সেটি সরে না যায়।

অন্যান্য সতর্কতা:

  • জানালা থেকে দূরে থাকুন: কাঁচের জানালা, আয়না বা ভারী আলমারি থেকে দূরে থাকুন। কম্পনে কাঁচ ভেঙে আপনার শরীরে বিঁধতে পারে।
  • বিছানায় থাকলে: যদি আপনি ঘুমানোর সময় ভূমিকম্প অনুভব করেন, তবে বিছানাতেই থাকুন। বালিশ দিয়ে মাথা ও ঘাড় ঢেকে রাখুন। মেঝেতে পড়ে থাকা ভাঙা কাঁচের ওপর দিয়ে হাঁটার চেয়ে বিছানায় থাকা নিরাপদ।
  • লিফট ব্যবহার করবেন না: ভূমিকম্পের সময় কখনোই লিফট ব্যবহার করবেন না। বিদ্যুৎ চলে গেলে আপনি লিফটের ভেতরে আটকে পড়তে পারেন।

​ বাইরে থাকলে করণীয় (Outdoor)

​যদি ভূমিকম্পের সময় আপনি ঘরের বাইরে থাকেন, তবে নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখুন:

  • খোলা জায়গা খুঁজুন: ভবন, গাছপালা, বৈদ্যুতিক খুঁটি এবং ল্যাম্পপোস্ট থেকে দূরে কোনো ফাঁকা জায়গায় চলে যান।
  • উঁচু ভবন থেকে সাবধান: শহরের রাস্তায় থাকলে ভবনের খুব কাছে দাঁড়াবেন না। কাঁচের দেয়াল বা সাইনবোর্ড খসে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
  • গাড়িতে থাকলে: নিরাপদ জায়গায় গাড়ি থামান। ওভারব্রিজ, বড় গাছ বা বিদ্যুতের খুঁটির নিচে গাড়ি থামাবেন না। কম্পন না থামা পর্যন্ত গাড়ির ভেতরেই বসে থাকুন। গাড়ি থেকে নামার পর চারপাশ দেখে নিন কোনো তার ছিঁড়ে আছে কি না।

 ভূমিকম্পের আগে প্রস্তুতি (Pre-Earthquake Planning)

​দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতিই আসল শক্তি। আপনার বাড়িতে আজই এই পরিবর্তনগুলো আনুন:

• আসবাবপত্র আলমারি বা বুকশেলফ দেয়ালের সাথে স্ক্রু দিয়ে আটকে দিন।

• ভারী বস্তু ভারী জিনিস বা কাঁচের শোপিস নিচতলার কাছে রাখুন।

• জরূরী কিট যেমন ব্যাগে শুকনো খাবার, জল, টর্চ, ব্যাটারি, কস্টএইড বক্স এবং জরুরী ওষুধ গুছিয়ে রাখুন।

• গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিবারের সবাইকে শেখান কী ভাবে প্রধান গ্যাস লাইন এবং ইলেকট্রিক সুইচ বন্ধ করতে হয়।

 ভূমিকম্পের পর কী করবেন?

​কম্পন থেমে যাওয়া মানেই বিপদ শেষ নয়। বড় ভূমিকম্পের পর সাধারণত ছোট ছোট কিছু কম্পন বা 'আফটার শক' হয়।

  1. নিজের আঘাত পরীক্ষা করুন: প্রথমে দেখুন আপনি নিজে সুস্থ আছেন কি না, তারপর অন্যদের সাহায্য করুন।
  2. গ্যাস লিক চেক করুন: যদি গ্যাসের গন্ধ পান, তবে দ্রুত জানলা খুলে দিন এবং মেইন সুইচ বন্ধ করুন। এই সময় দিয়াশলাই বা লাইটার জ্বালাবেন না।
  3. রেডিও বা খবর শুনুন: সরকারি নির্দেশাবলী এবং আবহাওয়া বার্তার জন্য রেডিও বা বিশ্বস্ত নিউজ পোর্টাল অনুসরণ করুন।
  4. ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়লে: যদি দুর্ভাগ্যবশত আপনি আটকা পড়েন, তবে চিৎকার করে শক্তি ক্ষয় করবেন না। পাইপ বা দেয়ালে টোকা দিন যাতে উদ্ধারকারীরা শব্দ শুনতে পায়। মুখে রুমাল বা কাপড় দিয়ে রাখুন যাতে ধুলোবালি ফুসফুসে না যায়। খুব প্রয়োজনে শিস দিন।

​ কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা (Common Myths)

​অনেকে মনে করেন ঘরের দরজার ফ্রেমের নিচে দাঁড়ানো নিরাপদ। আধুনিক বিল্ডিংয়ের ক্ষেত্রে এটি ভুল ধারণা, কারণ দরজার ফ্রেম পুরো ছাদের ভার সইবার মতো মজবুত নাও হতে পারে। আবার 'ট্রায়াঙ্গেল অফ লাইফ' বা জীবনের ত্রিভুজ তত্ত্বটি নিয়েও বিতর্ক আছে। বর্তমানে বিশেষজ্ঞরা Drop, Cover, and Hold on পদ্ধতিকেই সবচেয়ে নিরাপদ মনে করেন।

​উপসংহার

​ভূমিকম্প রুখে দেওয়ার ক্ষমতা মানুষের নেই, কিন্তু সচেতনতা দিয়ে প্রাণহানি কমানো অবশ্যই সম্ভব। আতঙ্ক নয়, বরং সঠিক তথ্যের চর্চাই আমাদের নিরাপদ রাখতে পারে। আজই আপনার পরিবারের সাথে একটি 'ইভাকুয়েশন প্ল্যান' বা জরুরি বহির্গমন পরিকল্পনা তৈরি করুন এবং নিয়মিত মহড়া দিন।

​আপনার সুরক্ষা আপনারই হাতে ধন্যবাদ।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বজ্রপাত হওয়ার সময় কী করা উচিৎ আমাদের ।

সাপ কামড়ালে তৎক্ষণাৎ আমাদের কী কী করণীয়।

বাড়িতে রাতকানা থাকলে আমাদের কী কী করা উচিৎ তাকে সাহায্য করার জন্য।