বজ্রপাত হওয়ার সময় কী করা উচিৎ আমাদের ।
আকাশ যখন রাগে অগ্নিশর্মা: বজ্রপাত থেকে বাঁচতে আপনার যা জানা একান্ত প্রয়োজন
বর্ষার রিমঝিম শব্দ যেমন মন ভালো করে দেয়, তেমনি আকাশ কাঁপানো বজ্রপাত বয়ে আনতে পারে চরম আতঙ্ক। বর্তমান সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমাদের দেশে বজ্রপাত কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং একটি বড় ধরণের আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর শত শত মানুষ এই বজ্রাঘাতে প্রাণ হারান। কিন্তু আমরা যদি একটু সচেতন হই এবং সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারি, তবে এই প্রাণহানি অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব।
আজকের ব্লগে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব বজ্রপাত কেন হয় এবং এই দুর্যোগের সময় আমাদের ঠিক কী কী করা উচিত।
বজ্রপাত কেন হয়? সংক্ষেপে জেনে নিই
মেঘে মেঘে যখন ঘর্ষণ লাগে, তখন সেখানে বিপুল পরিমাণ স্থির তড়িৎ উৎপন্ন হয়। মেঘের উপরের অংশে পজিটিভ চার্জ এবং নিচের অংশে নেগেটিভ চার্জ জমা হয়। যখন এই চার্জের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়, তখন তা বাতাসের বাধা ভেদ করে ভূমির দিকে ধাবিত হয়। এটিই হলো বজ্রপাত। বজ্রপাতের সময় তাপমাত্রা প্রায় ৩০,০০০° সেলসিয়াস পর্যন্ত হতে পারে, যা সূর্যের পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রার চেয়েও বেশি!
১. বজ্রপাত শুরুর আগে: সতর্কতার প্রথম ধাপ
আকাশে ঘন কালো মেঘ জমলে বা বিদ্যুতের ঝলকানি দেখা দিলে ঘরে বসেই কিছু প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি:
- আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখুন: ঘরের বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে আগে আবহাওয়া রিপোর্ট দেখে নিন। যদি বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে, তবে বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।
- ৩০-৩০ নিয়ম মেনে চলুন: বজ্রপাতের আলো দেখার পর যদি ৩০ গোনার আগেই মেঘের ডাক শোনেন, তবে বুঝবেন বিদ্যুৎ আপনার খুব কাছেই চমকাচ্ছে। অবিলম্বে নিরাপদ আশ্রয়ে যান। আর বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পরও অন্তত ৩০ মিনিট ঘরের ভেতরেই থাকুন।
- উঁচু গাছ ও বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে দূরে থাকুন: আপনার আশেপাশে যদি বড় কোনো গাছ বা বিদ্যুতের টাওয়ার থাকে, তবে সেখান থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন।
২. বজ্রপাতের সময় ঘরের ভেতর করণীয়
অনেকে মনে করেন ঘরের ভেতর থাকা মানেই ১০০% নিরাপদ। কিন্তু কিছু ভুল পদক্ষেপে ঘরের ভেতরেও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
- বৈদ্যুতিক যন্ত্র থেকে দূরত্ব: বজ্রপাত শুরু হলে ফ্রিজ, টিভি, কম্পিউটার, রাউটার বা এসি-র মতো ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির প্লাগ খুলে দিন। বজ্রপাতের সময় ‘সার্জ প্রোটেক্টর’ থাকলেও সরাসরি আঘাত হানলে যন্ত্রটি নষ্ট হতে পারে এবং আগুন লাগার ঝুঁকি থাকে।
- ল্যান্ডফোন ব্যবহার করবেন না: এই সময়ে কর্ডযুক্ত ল্যান্ডফোন ব্যবহার করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। তবে কর্ডলেস ফোন বা মোবাইল ফোন ব্যবহার করা সাধারণত নিরাপদ, যতক্ষণ না তা চার্জে দেওয়া থাকে।
- ধাতব সংযোগ এড়িয়ে চলুন: জানালার গ্রিল, বারান্দার রেলিং বা কোনো ধাতব পাইপ স্পর্শ করবেন না। বাড়ির কল বা ট্যাপ ছেড়ে গোসল করা বা থালাবাসন ধোয়া থেকে বিরত থাকুন, কারণ পানি এবং ধাতব পাইপ উভয়েই বিদ্যুৎ সুপরিবাহী।
- জানালা থেকে দূরে থাকুন: জানালার কাঁচ ভেঙে আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাই জানালার পাশে না দাঁড়িয়ে ঘরের মাঝখানে থাকার চেষ্টা করুন।
৩. বাইরে থাকাকালীন কী করবেন?
সবচেয়ে বড় বিপদের ঝুঁকি থাকে যারা মাঠে, ঘাটে বা খোলা জায়গায় কাজ করেন তাদের। এমন অবস্থায় যা করবেন:
- পাকা দালানের নিচে আশ্রয় নিন: যদি সম্ভব হয় দ্রুত কোনো শক্ত ছাদওয়ালা পাকা দালানে ঢুকে পড়ুন। টিনের চালা বা আধাপাকা ঘর খুব একটা নিরাপদ নয়।
- গাড়ির ভেতর থাকলে: আপনি যদি গাড়িতে থাকেন, তবে গাড়ির ভেতরেই থাকুন। গাড়ির টায়ার রাবারের হওয়ায় এবং বডি ধাতব হওয়ায় তা একটি 'ফ্যারাডে কেজ' হিসেবে কাজ করে আপনাকে রক্ষা করবে। তবে খেয়াল রাখবেন যেন গাড়ির জানালার কাঁচ আটকানো থাকে এবং আপনি কোনো ধাতব অংশ স্পর্শ না করেন।
- খোলা মাঠে থাকলে: যদি আশেপাশে কোনো আশ্রয় না থাকে, তবে কোনো বড় গাছের নিচে দাঁড়াবেন না। কারণ উঁচু জিনিস বিদ্যুৎকে আগে আকর্ষণ করে। পরিবর্তে নিচু কোনো জায়গায় উবু হয়ে বসে পড়ুন।
- বসার ভঙ্গি: দুই পা একসাথে করে দুই হাত দিয়ে কান ঢেকে মাথা নিচু করে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে উবু হয়ে বসুন। মাটিতে শুয়ে পড়বেন না, কারণ এতে বিদ্যুৎ আপনার শরীরের বেশি অংশ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
৪. দলবদ্ধ অবস্থায় করণীয়
আপনারা যদি কয়েকজন বন্ধু বা পরিবারের সদস্য একসাথে বাইরে থাকেন, তবে সবাই গাদাগাদি করে এক জায়গায় দাঁড়াবেন না। অন্তত ৫০ থেকে ১০০ ফুট দূরত্ব বজায় রেখে আলাদা আলাদাভাবে ছড়িয়ে পড়ুন। এতে করে যদি একজনের ওপর বজ্রপাত হয়ও, তবে অন্যেরা নিরাপদ থাকবেন এবং সাহায্য করতে পারবেন।
৫. জলাশয় থেকে দূরে থাকুন
মাছ ধরা বা নৌকা ভ্রমণের সময় বজ্রপাত শুরু হলে দ্রুত তীরের কাছাকাছি চলে আসুন। পানি বিদ্যুতের খুব ভালো পরিবাহী। তাই নৌকায় থাকা বা পানিতে নেমে থাকা এই সময়ে মৃত্যুর পরোয়ানা ডেকে আনার সমান।
৬. কেউ বজ্রাহত হলে কী করবেন?
বজ্রাঘাতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্পর্শ করলে আপনার শক খাওয়ার ভয় নেই, কারণ মানবদেহ বিদ্যুৎ ধরে রাখে না। তাই আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত সাহায্য করুন:
- চিকিৎসা সহায়তা: প্রথমেই অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন বা নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন।
- শ্বাসপ্রশ্বাস পরীক্ষা: আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস চলছে কি না দেখুন। যদি শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়, তবে অভিজ্ঞ কেউ থাকলে তাকে CPR (Cardiopulmonary Resuscitation) দিন।
- শরীরের ক্ষত পরীক্ষা: বজ্রাঘাতে শরীর পুড়ে যেতে পারে বা হাড় ভেঙে যেতে পারে। ক্ষতস্থান পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ঢেকে দিন।
কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা (Fact Check)
- ভুল: মোবাইল ব্যবহার করলে বজ্রপাত বেশি হয়।
- সঠিক: মোবাইল ফোন বা টাওয়ারের সাথে সরাসরি বজ্রপাতের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে মোবাইলে চার্জ দেওয়ার সময় বজ্রপাত হলে বিপদের ঝুঁকি থাকে।
- ভুল: রাবারের জুতো পড়লে আপনি পুরোপুরি নিরাপদ।
- সঠিক: রাবারের জুতো সামান্য সুরক্ষা দিলেও লাখ লাখ ভোল্টের বিদ্যুতের সামনে এটি নগণ্য। মূল সুরক্ষা হলো সঠিক স্থানে আশ্রয় নেওয়া।
উপসংহার
বজ্রপাতকে থামানোর ক্ষমতা আমাদের নেই, কিন্তু সতর্কতা অবলম্বন করে আমরা নিজেদের এবং প্রিয়জনদের জীবন রক্ষা করতে পারি। মনে রাখবেন, প্রাকৃতিক এই তাণ্ডব মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য স্থায়ী হয়। এই অল্প সময়টুকু ঘরে থাকা বা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখাই হতে পারে আপনার জীবনের সেরা সিদ্ধান্ত।
প্রকৃতির সাথে লড়াই নয়, বরং সচেতনতাই হোক আমাদের ঢাল।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন