খাবার খাওয়ার সময় সুখাসন হয়ে কেনো বসবেন?

খাবার খাওয়ার চিরাচরিত অভ্যাসের মধ্যে 'পা গুটিয়ে বসা' বা 'সুখাসন' (Sukhasana) অন্যতম। বর্তমানের ডাইনিং টেবিল আর চেয়ারের ভিড়ে এই প্রাচীন পদ্ধতিটি হারিয়ে যেতে বসলেও, এর পেছনে থাকা বিজ্ঞান এবং স্বাস্থ্যগত উপকারিতা অপরিসীম। 

​নিচে খাবার খাওয়ার সময় নিচে পা গুটিয়ে বসার উপকারিতা নিয়ে একটি বিস্তারিত ব্লগ দেওয়া হলো।

​কেন খাবার খাওয়ার সময় নিচে পা গুটিয়ে বসা উচিত? স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞানের মেলবন্ধন

​আধুনিক জীবনযাত্রায় আমরা অনেক কিছুই বদলে ফেলেছি। মাটির ঘর থেকে অট্টালিকা, খোলা মাঠ থেকে জিম—সবই এখন চার দেয়ালের মাঝে সীমাবদ্ধ। এই পরিবর্তনের ধারায় আমাদের খাওয়ার টেবিলও বদলেছে। এখন আমরা সোফায় বা ডাইনিং টেবিলে বসে খাবার খেতে অভ্যস্ত। কিন্তু আপনি কি জানেন, আমাদের পূর্বপুরুষরা কেন মাটিতে পা গুটিয়ে বসে খাবার খেতেন? এটি কেবল কোনো প্রথা বা সংস্কার ছিল না, এর পেছনে ছিল গভীর শারীরবৃত্তীয় এবং বৈজ্ঞানিক কারণ।

​ হজম প্রক্রিয়ার উন্নতি (Better Digestion)

​মাটিতে পা গুটিয়ে বসাকে যোগশাস্ত্রে 'সুখাসন' বলা হয়। যখন আমরা এই ভঙ্গিতে বসে খাবার খাওয়ার জন্য সামনের দিকে ঝুঁকি এবং খাবার মুখে নিয়ে আবার সোজা হই, তখন পেটের পেশিগুলো সংকুচিত ও প্রসারিত হয়। এই বারবার সামনে-পেছনে নড়াচড়া হজমকারী রস (Digestive juices) নিঃসরণে সহায়তা করে। ফলে খাবার খুব দ্রুত এবং সহজে হজম হয়।

​সঠিক ওজন বজায় রাখা

​আমরা যখন চেয়ারে বসে খাই, তখন আমরা দ্রুত খাবার গিলে ফেলি। কিন্তু মাটিতে পা গুটিয়ে বসলে শরীর প্রাকৃতিকভাবেই শান্ত থাকে। এই ভঙ্গিতে বসে খাওয়ার সময় আমাদের মস্তিষ্ক এবং পাকস্থলীর মধ্যে সংকেত আদান-প্রদান আরও কার্যকর হয়। পাকস্থলী পূর্ণ হয়ে গেলে মস্তিষ্ক দ্রুত 'ভেগাস নার্ভ'-এর মাধ্যমে সংকেত পাঠায় যে আর খাওয়ার প্রয়োজন নেই। এতে অতিরিক্ত খাওয়ার (Overeating) ঝুঁকি কমে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে।

​ শরীরের নমনীয়তা ও ভঙ্গি (Flexibility and Posture)

​সুখাসনে বসার ফলে আমাদের মেরুদণ্ড সোজা থাকে এবং পিঠের নিচের অংশ শক্তিশালী হয়। এটি শরীরের নমনীয়তা বাড়াতে সাহায্য করে। যারা দীর্ঘক্ষণ অফিসে চেয়ারে বসে কাজ করেন, তাদের জন্য অন্তত খাওয়ার সময়টুকু নিচে পা গুটিয়ে বসা একটি চমৎকার ব্যায়াম হিসেবে কাজ করতে পারে। এটি কোমরের ও হাঁটুর জয়েন্টকে সচল রাখে।

​হৃদযন্ত্রের সুরক্ষা (Heart Health)

​চেয়ারে বসে খেলে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে রক্ত চলাচলের বড় একটি অংশ পা বা নিচের দিকে চলে যায়। কিন্তু পা গুটিয়ে বসলে রক্ত সঞ্চালন শরীরের উপরিভাগে অর্থাৎ হৃদযন্ত্র ও পাকস্থলীর দিকে বেশি প্রবাহিত হয়। এতে হৃদযন্ত্রকে কম পরিশ্রমে বেশি রক্ত পাম্প করতে হয় এবং হজম প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় রক্ত সরবরাহ নিশ্চিত হয়।

​মানসিক প্রশান্তি ও মনোযোগ

​খাবার খাওয়া কেবল পেট ভরানো নয়, এটি একটি মানসিক তৃপ্তিরও বিষয়। নিচে বসে খাওয়ার সময় আমরা মাটির সাথে সংযুক্ত থাকি, যা মনকে শান্ত রাখে। পরিবার বা প্রিয়জনদের সাথে মাটিতে গোল হয়ে বসে খাওয়ার ফলে পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হয় এবং এটি মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।

​মাটিতে বসে খাওয়ার কিছু বিশেষ টিপস:

  • পিঠ সোজা রাখুন: খাওয়ার সময় খুব বেশি কুঁজো হয়ে বসবেন না।
  • ​তাড়াহুড়ো নয়:খাবার ভালো করে চিবিয়ে খান।
  • মনোযোগ দিন: খাওয়ার সময় ফোন বা টিভি না দেখে খাবারের স্বাদ ও ঘ্রাণের দিকে মনোনিবেশ করুন।

​উপসংহার

​ডাইনিং টেবিল হয়তো আভিজাত্যের প্রতীক হতে পারে, কিন্তু সুস্থতার প্রতীক হলো আমাদের চিরচেনা সেই মাটির আসন। শরীরকে রোগমুক্ত রাখতে এবং দীর্ঘায়ু পেতে অন্তত রাতের খাবারটি নিচে পা গুটিয়ে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এটি আপনার হজমশক্তি বাড়াবে, হৃদপিণ্ড ভালো রাখবে এবং আপনাকে মানসিকভাবে সতেজ রাখবে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বজ্রপাত হওয়ার সময় কী করা উচিৎ আমাদের ।

সাপ কামড়ালে তৎক্ষণাৎ আমাদের কী কী করণীয়।

বাড়িতে রাতকানা থাকলে আমাদের কী কী করা উচিৎ তাকে সাহায্য করার জন্য।