ছত্রিশগড়ের লুকিয়ে থাকা রত্ন: ভোরমদেও মন্দিরের অজানা ইতিহাস।
ভারতের মধ্যপ্রদেশের খাজুরাহো বা ওড়িশার কোনারক মন্দিরের নাম আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু আপনি কি জানেন, ছত্তিশগড়ের সবুজ পাহাড়ি উপত্যকার কোলে লুকিয়ে রয়েছে এমন এক অপূর্ব স্থাপত্য, যাকে বলা হয় "ছত্তিশগড়ের খাজুরাহো"? বলছি কাওয়ার্ধা (কবীরধাম) জেলা থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত ঐতিহাসিক ভোরমদেও মন্দির-এর কথা। হাজার বছরের পুরনো এই মন্দিরটি ভারতীয় ইতিহাস ও স্থাপত্যের এক অমূল্য দলিল, যা আজও পর্যটক ও গবেষকদের কাছে এক রহস্যময় বিস্ময়।
নামকরণের নেপথ্য ইতিহাস ও জনশ্রুতি
ভোরমদেও মন্দিরের নামকরণ নিয়ে রয়েছে নানা মত।
আদিবাসীদের দেবতা: স্থানীয় গোন্ড ও বৈগা উপজাতির মানুষেরা ভগবান শিবকে অত্যন্ত ভক্তি করেন এবং তাঁকে "ভোরমদেও" বা ভোরম বাবা বলে ডাকেন। মূলত এই উপজাতীয় দেবতার নামানুসারেই মন্দিরটির নামকরণ হয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
নাগ বংশীয় রাজাদের অবদান: ইতিহাসবিদদের মতে, একাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যে ফণীনাগ বংশীয় রাজারা (Naga Dynasty) এই অঞ্চল শাসন করতেন। রাজা লক্ষ্মণ দেব রায় এবং রাজা রামচন্দ্র দেবের রাজত্বকালে এই মন্দির চত্বর গড়ে ওঠে। এখানকার শিলালিপিতেও প্রাচীন রাজা ও গোপালদেবের নামের উল্লেখ পাওয়া যায়।
স্থাপত্যশৈলী এবং শিল্পকলার নান্দনিকতা
ভোরমদেও মন্দিরটি মূলত ভগবান শিবের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়েছে। এর নির্মাণশৈলী এতটাই নিখুঁত যে একে পাথরের গায়ে খোদাই করা এক টুকরো কবিতা বললেও ভুল হয় না।
নাগর শৈলী: মন্দিরটি প্রাচীন ভারতীয় 'নাগর' স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত। এটি স্থানীয় ধূসর ও বাদামী রঙের বালুকা পাথরে (Sandstone) তৈরি।
খাজুরাহোর ছায়া: এই মন্দিরের গায়ে খোদাই করা সূক্ষ্ম মূর্তি এবং কামকলার ভাস্কর্যগুলো মধ্যপ্রদেশের বিখ্যাত খাজুরাহো মন্দিরের কথা মনে করিয়ে দেয়। মন্দিরটির বহির্ভাগে দেব-দেবী, অপ্সরা এবং বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনীর দৃশ্য অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
গর্ভগৃহ ও মণ্ডপ: মন্দিরের মূল প্রবেশদ্বার পূর্বমুখী। ভেতরে রয়েছে একটি সুবিশাল মণ্ডপ যা সুদৃশ্য স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। গর্ভগৃহে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে একটি চমৎকার শিবলিঙ্গ। এছাড়া বিষ্ণুর দশাবতার, গণেশ এবং সূর্য দেবতার মূর্তিও এখানে দেখতে পাওয়া যায়।
আশেপাশের ঐতিহাসিক অবশেষ: মড়ওয়া ও চেরকি মহাল
ভোরমদেও মন্দির চত্বরটি কেবল একটি একক মন্দির নয় এর আশেপাশে আরও কিছু ঐতিহাসিক স্থাপনা ছড়িয়ে আছে:
মড়ওয়া মহাল (বিয়ের মহল): মূল মন্দির থেকে সামান্য দূরে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক সৌধটি ১৩৪৯ খ্রিস্টাব্দে রাজা রামচন্দ্র দেবের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। এটি মূলত শিব ও পার্বতের বিবাহ স্থলী বা মণ্ডপ হিসেবে ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হয়। এর গায়েও চমৎকার ভাস্কর্য দেখা যায়।
চেরকি মহাল: এটিও এই চত্বরের আরেকটি প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, যা প্রাচীন স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন বহন করে।
ভ্রমণের সেরা সময় ও যাতায়াত
ছত্তিশগড়ের এই লুক্কড়ায়িত ঐতিহাসিক স্থানে ভ্রমণের জন্য সেরা সময় হলো অক্টোবর থেকে মার্চ মাস, যখন আবহাওয়া বেশ মনোরম থাকে। প্রতি বছর মার্চ মাসে এখানে বিখ্যাত "ভোরমদেও মহোৎসব" পালিত হয়, যেখানে ছত্তিশগড়ের লোকসংস্কৃতি ও নৃত্যশিল্পের এক অপূর্ব মিলনমেলা বসে।
কীভাবে পৌঁছাবেন: ছত্তিশগড়ের রাজধানী রায়পুর থেকে ভোরমদেও মন্দিরের দূরত্ব প্রায় ১২০-১৩০ কিলোমিটার। রায়পুর বা দুর্গের বিমানবন্দর কিংবা রেলওয়ে স্টেশন থেকে সড়ক পথে ক্যাব বা বাসে চড়ে সহজেই কাওয়ার্ধা হয়ে ভোরমদেও পৌঁছানো যায়।
প্রকৃতির নিস্তব্ধ কোলে মেকল পর্বতমালার পাদদেশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ভোরমদেও মন্দির কেবল একটি পূজার স্থান নয়, এটি আমাদের প্রাচীন ভারতীয় শিল্প ও সংস্কৃতির এমন এক অমূল্য অধ্যায়, যা প্রতি মুহূর্তেই ইতিহাসপ্রেমীদের হাতছানি দিয়ে ডাকে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন