কয়লা খনি থেকে তোপচাচি লেক : ধানবাদের সেরা কিছু দর্শনীয় স্থান।
ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের ধানবাদ শহরটি কেবল তার বিশাল কয়লা খনির জন্যই সারা বিশ্বে পরিচিত নয়, বরং এর আশেপাশে লুকিয়ে রয়েছে প্রকৃতির এক অপূর্ব রূপ, ইতিহাস এবং সংস্কৃতির এক অনবদ্য মিশ্রণ। সাধারণত যাকে "ঝাড়খণ্ডের কয়লার রাজধানী" বলা হয়, সেই ধানবাদেই রয়েছে এমন কিছু চোখ জুড়ানো পর্যটন কেন্দ্র, যা যে কোনো ভ্রমণপিপাসু মানুষের মন কেড়ে নেবে। কয়লার কালো মাটির কোল থেকে শুরু করে সবুজ পাহাড়ের মায়াবী হাতছানি—ধানবাদের সেরা কিছু দর্শনীয় স্থানের এক রোমাঞ্চকর খোঁজ রইল এই ব্লগে।
তোপচাচি লেক (Topchanchi Lake)
ধানবাদ থেকে প্রায় ৩৭ কিলোমিটার দূরে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের (GT Road) পাশে অবস্থিত তোপচাচি লেক ধানবাদের মুকুটে সবচেয়ে উজ্জ্বল একটি রত্ন। ১৯২৪ সালে ব্রিটিশ আমলে সেচ ও পানীয় জলের সুবিধার জন্য পারাসনাথ পাহাড়ের পাদদেশে এই কৃত্রিম জলাশয়টি নির্মাণ করা হয়।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য: প্রায় ২১৪ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই লেকের চারপাশে রয়েছে ঘন শাল ও মহুয়ার জঙ্গল। এর পিছন থেকেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বিখ্যাত পারাসনাথ পাহাড়।
দর্শনার্থীদের জন্য আকর্ষণ: শীতকালে এখানে প্রচুর পরিযায়ী পাখি আসে, যা পাখিপ্রেমীদের জন্য স্বর্গরাজ্য। লেকের জলে নৌকাভ্রমণ এবং এর শান্ত পরিবেশে সময় কাটানো এক স্বর্গীয় অনুভূতি দেয়।
মাইথন ও পাঞ্চেত বাঁধ (Maithon and Panchet Dams)
ধানবাদ ভ্রমণে গেলে দামোদর নদ ও তার উপনদীর ওপর নির্মিত বিশাল বাঁধগুলো দেখা এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। ধানবাদ শহর থেকে প্রায় ৪৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মাইথন বাঁধ ভারতের প্রথম বহুমুখী নদী উপত্যকা প্রকল্পগুলির মধ্যে অন্যতম।
মাইথন বাঁধ: ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গ সীমানায় বারাকির নদীর ওপর এই বাঁধটি নির্মিত হয়েছে। এখানে একটি বিশাল জলাশয় রয়েছে যা সমুদ্রের মতো মনে হয়। বাঁধের গায়ে একটি আন্ডারগ্রাউন্ড পাওয়ার স্টেশন রয়েছে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রথম। এছাড়া এখানে লেকের মাঝখানে একটি ছোট দ্বীপে কল্যাণেশ্বরী মন্দির অবস্থিত।
পাঞ্চেত বাঁধ: মাইথন থেকে খুব বেশি দূরে নয় পাঞ্চেত বাঁধ, যা দামোদর নদীর ওপর তৈরি। পাহাড়ের কোলে ঘেরা এই বাঁধের চারপাশের নৈসর্গিক দৃশ্য পর্যটকদের ক্লান্তি দূর করে দেয়।
শক্তি মন্দির (Shakti Mandir)
ধানবাদের জোড়াপাটক (Joraphatak) এলাকায় অবস্থিত শক্তি মন্দির এই শহরের অন্যতম প্রধান এবং পবিত্র তীর্থস্থান। এই মন্দিরের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এখানে যে ‘অখণ্ড জ্যোতি’ বা পবিত্র প্রদীপটি প্রজ্জ্বলিত রয়েছে, তা সরাসরি জম্মুর পবিত্র বৈষ্ণো দেবী গুহা থেকে আনা হয়েছে।
প্রতি বছর নবরাত্রি এবং দীপাবলির সময় এখানে লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম ঘটে। শহরের কোলাহল থেকে দূরে একটু মানসিক শান্তি পেতে ভক্তরা এখানে ছুটে আসেন।
ভাটিন জলপ্রপাত (Bhatinda Falls)
প্রকৃতির খুব কাছাকাছি সময় কাটাতে চাইলে মুনিডিহ (Munidih) এলাকার কাছে অবস্থিত ভাটিন জলপ্রপাত আপনাকে মুগ্ধ করবে। ধানবাদ শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১৪ কিলোমিটার।
কাতার নদী পাথরের বুক চিরে নিচে নেমে আসার ফলে এই জলপ্রপাতের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে এর রূপ অত্যন্ত হিংস্র ও মনোরম হয়ে ওঠে। চারপাশের পাথুরে ভূখণ্ড এবং সবুজ বনানী পিকনিক করার জন্য বা ছুটির দিনে পরিবারকে নিয়ে সময় কাটানোর জন্য এটি একটি আদর্শ জায়গা।
চাসনালা কয়লা খনি (Chasnala Coal Mine)
ধানবাদে এসে এর আসল পরিচয় অর্থাৎ কয়লা খনি না দেখলে ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ১৯৭৫ সালে চাসনালা কয়লা খনিতে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছিল, যা নিয়ে পরবর্তীতে হিন্দি সিনেমাও নির্মিত হয়েছে।
খনি এলাকার বিশাল সব মেশিনারি, মাটির গভীর থেকে কয়লা উত্তোলনের প্রক্রিয়া এবং শিল্প সভ্যতার এই রূপটি কাছ থেকে দেখা এক রোমাঞ্চকর এবং শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা। (অবশ্য খনির ভেতরে প্রবেশের জন্য নির্দিষ্ট অনুমতি প্রয়োজন হয়)।
ভ্রমণের সেরা সময়
ধানবাদ ভ্রমণের জন্য অক্টোবর থেকে মার্চ মাস সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এই সময়ে এখানকার আবহাওয়া অত্যন্ত মনোরম ও ঠান্ডা থাকে, যা ঘোরাঘুরির জন্য দারুণ সহায়ক।
কীভাবে পৌঁছাবেন?
বিমানে: নিকটতম বিমানবন্দর হলো রাঁচির বিরসা মুন্ডা বিমানবন্দর (প্রায় ১৫০ কিমি) এবং কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (প্রায় ২৬০ কিমি)।
ট্রেনে: ধানবাদ জংশন পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রধান ও ব্যস্ত রেলওয়ে স্টেশন। দেশের প্রায় সমস্ত বড় শহর থেকেই এখানে সরাসরি ট্রেন পাওয়া যায়।
সড়কপথে: কলকাতা, রাঁচি, পাটনা এবং জামশেদপুর থেকে নিয়মিত বাস ও ক্যাব পরিষেবা উপলব্ধ।
কয়লার কালো ইতিহাস এবং সবুজ প্রকৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন দেখতে চাইলে আপনার পরবর্তী ছুটির গন্তব্য হোক ধানবাদ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন