সবুজের টানে সিপাহিজলা : প্রকৃতির কোলে একটি স্মরণীয় দিন।
যান্ত্রিক শহরের হাঁপিয়ে ওঠা জীবন থেকে একটু মুক্তি পেতে কে না চায় সবুজের সান্নিধ্যে হারিয়ে যেতে? কংক্রিটের জঙ্গল, যানবাহনের শব্দ আর কর্মব্যস্ততার ক্লান্তি থেকে দূরে গিয়ে মন যখন একটু শান্ত নিঃশ্বাস নিতে চায়, তখনই মনে উঁকি দেয় কোনো এক অরণ্যপ্রকৃতির হাতছানি। গত ছুটির দিনটিতে এমনই এক ক্লান্তি কাটাতে আমি বেরিয়ে পড়েছিলাম ত্রিপুরার এক অপূর্ব প্রাকৃতিক রত্ন—সিপাহিজলা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য (Sipahijala Wildlife Sanctuary)-র উদ্দেশ্যে। আজকের ব্লগে আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নেব সেই সবুজ অরণ্যের কোলে কাটানো আমার এক স্মরণীয় দিনের গল্প।
সিপাহিজলার পথ ধরে: যাত্রা শুরু
রাজধানী আগরতলা থেকে সিপাহিজলার দূরত্ব খুব বেশি নয়—মাত্র ২৫ কিলোমিটারের মতো। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে ক্যামেরা, জলের বোতল আর হালকা কিছু খাবার ব্যাগে ভরে রওনা হয়ে গেলাম। ত্রিপুরার প্রধান সড়ক ধরে চলার সময় দুপাশের গ্রামীণ দৃশ্য মন জুড়িয়ে দিচ্ছিল। ত্রিপুরার আবহাওয়া সবসময়ই একটু স্নিগ্ধ, আর সকালের রোদে সেই স্নিগ্ধতা যেন দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম সিপাহিজলা অভয়ারণ্যের প্রবেশদ্বারে। চারপাশের ঘন সবুজ গাছপালা আর পাখির ডাক আমাদের স্বাগত জানাল।
অভয়ারণ্যের গভীরে: গাছপালা ও বন্যপ্রাণীর মেলা
সিপাহিজলা প্রায় ১৮.৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত একটি বিশাল অভয়ারণ্য। এখানে পা রাখতেই মনে হলো যেন এক অন্য দুনিয়ায় এসে পৌঁছলাম। শহরের কোলাহল এক পলকে উধাও হয়ে গেল, তার জায়গা দখল করল ঝিঁঝি পোকার ডাক, গাছের পাতায় বাতাসের শাঁ শাঁ শব্দ আর বিভিন্ন প্রজাতির পাখির মধুর কলকাকলি।
এখানে প্রবেশ করার পর প্রথম যা আমাদের নজর কাড়ল, তা হলো এর চমৎকার প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য। শাল, সেগুন এবং বিভিন্ন ঔষধি গাছের ঘন সমারোহ পুরো এলাকাটিকে এক দুর্ভেদ্য সবুজ চাদরে ঢেকে রেখেছে। এই অভয়ারণ্যটি তার বিখ্যাত স্পেকটাকলড মাঙ্কি বা চশমা পরা বানরের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। ভাগ্য আমাদের সহায় ছিল, কিছুদূর এগোতেই গাছের ডালে ডালে চোখে পড়ল একদল চশমা পরা বানর। চোখে যেন তাদের সাদা চশমা আঁটা, তাদের এই অদ্ভুত সুন্দর রূপ দেখে আমরা মুগ্ধ হয়ে গেলাম।
এ ছাড়াও এখানে রয়েছে হরিণ, মেঘকালো চিতা, ভালুক এবং নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখি। শীতকালে এখানে পরিযায়ী পাখির মেলা বসে, যা লেকের সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
আবাসা লেকের জলে নৌভ্রমণ
সিপাহিজলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো এর ভেতরের শান্ত ও স্নিগ্ধ আবাসা লেক (Abasa Lake)। গভীর বনের মাঝখানে অবস্থিত এই লেকের নীল জলরাশি যেন প্রকৃতির আয়না। লেকের চারপাশের সবুজ পাহাড় এবং গাছের প্রতিচ্ছবি জলে এক অপূর্ব পেন্টার্সের ক্যানভাস তৈরি করেছে।
আমরা একটি নৌকায় চড়ে লেকের জলে কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। মাঝির ছিপ্পার টানে যখন নৌকাটি লেকের শান্ত জলে এগিয়ে চলল, তখন চারপাশের নীরবতা মনকে এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে দিল। লেকের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চারপাশের ঘন জঙ্গল দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, আমরা যেন সভ্যতার অনেক দূরে কোনো আদিম ও সুন্দর পৃথিবীতে এসে পড়েছি। লেকের ওপর রোদ-ছায়ার খেলা এবং মাঝে মাঝে কোনো পাখির জলের ওপর ডানা ঝাপটানোর শব্দ এক জাদুকরী পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল।
বোটানিক্যাল গার্ডেন এবং অর্কিড হাউসের সৌন্দর্য
লেক ভ্রমণ শেষে আমরা পা রাখলাম অভয়ারণ্যের বোটানিক্যাল গার্ডেন এবং অর্কিড হাউসে। প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এটি যেন এক স্বর্গরাজ্য। এখানে রয়েছে হরেক রকমের অর্কিড, ক্যাকটাস এবং নানা ধরনের দুষ্প্রাপ্য ফুলের সমাহার। বিভিন্ন রঙের অর্কিডের সুবাস পুরো এলাকায় এক মিষ্টি আমেজ তৈরি করেছিল। বোটানিক্যাল গার্ডেনের ছায়াঘেরা পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে গাছের নাম জানা এবং প্রকৃতির নিভৃত সৌন্দর্য উপভোগ করার অনুভূতি সত্যিই অতুলনীয়।
সূর্যাস্তের আলোয় বিদায়বেলা
পুরো দিনটি কীভাবে যেন চোখের পলকে কেটে গেল। বনের ভিতর দিয়ে হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত হলেও মনের মধ্যে এক অনাবিল আনন্দ কাজ করছিল। বিকেলের নরম রোদে যখন বনের গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে আলো এসে পড়ছিল, সেই দৃশ্যটি ছিল ক্যামেরাবন্দী করার মতো চমৎকার।
সন্ধ্যা নেমে আসার আগেই আমাদের সিপাহিজলা থেকে ফেরার পথ ধরতে হলো। তবে গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার সময়ও বারবার মন পেছনে ফিরে তাকাচ্ছিল ওই সবুজ অরণ্যের দিকে। সিপাহিজলার এই দিনটি আমাদের শিখিয়ে দিল যে, প্রকৃতির সান্নিধ্যই মানুষের ক্লান্ত মনকে নিরাময় করার সবচেয়ে বড় ঔষুধ।
আপনি যদি শহুরে জীবনের একঘেয়েমি থেকে ছুটি নিয়ে প্রকৃতির কাছাকাছি কয়েকটা শান্ত মুহূর্ত কাটাতে চান, তবে সিপাহিজলা আপনার জন্য একটি আদর্শ গন্তব্য। সবুজ অরণ্য, শান্ত লেক আর বন্যপ্রাণীর বৈচিত্র্য—সব মিলিয়ে সিপাহিজলা আপনার প্রতিটি মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখবে।
আপনার কি কখনো সিপাহিজলা যাওয়ার সুযোগ হয়েছে? কমেন্ট করে জানান আপনার অভিজ্ঞতার কথা! আজকের মতো এখানেই শেষ করছি, আবার দেখা হবে নতুন কোনো ভ্রমণকাহিনি নিয়ে। তত দিন ভালো থাকুন, প্রকৃতির কাছাকাছি থাকুন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন