পাটুলিপুত্র থেকে পাটনা : ২৫০০ বছরের গৌরবময় ইতিহাস।
ভারতের মানচিত্রে গঙ্গার তীরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা পাটনা আজ বিহারের রাজধানী। কিন্তু এর নাম এবং ইতিহাসের পাতার ওপারে তাকালে উন্মোচিত হয় এক অবিশ্বাস্য যাত্রা—যেখানে সাধারণ এক গ্রাম থেকে জন্ম নিয়েছিল মৌর্য সাম্রাজ্যের মতো বিশাল এক বিশ্বসাম্রাজ্যের রাজধানী ‘পাটলিপুত্র’। প্রায় আড়াই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এই শহর দেখেছে উত্থান, পতন, ধ্বংস আর নবজাগরণের এক মহাকাব্যিক রূপ।
জন্মকথা ও প্রারম্ভিক ইতিহাস (খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দী)
খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে মগধের রাজা অজাতশত্রু কৌশলগত কারণে গঙ্গা, সোন এবং গণ্ডক নদীর সঙ্গমস্থলে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন। শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে এবং রাজ্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে গঙ্গার তীরে এই ছোট দুর্গটিই পরবর্তীকালে এক বিশাল নগরে রূপান্তরিত হয়। তাঁর মন্ত্রী এবং উত্তরসূরি উদয়িন এই শহরটিকে মগধের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন এবং এর নাম রাখেন ‘পাটলিপুত্র’।
সোনালী যুগ: মৌর্য ও গুপ্ত সাম্রাজ্যের রাজধানী
পাটলিপুত্রের প্রকৃত গৌরবময় অধ্যায় শুরু হয় মৌর্য রাজবংশের হাত ধরে।
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও চাণক্য: এই শহর থেকেই চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও তাঁর গুরু আচার্য চাণক্য এক বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনা করেন।
মেগাস্থিনিসের বিবরণ: গ্রীকদূত মেগাস্থিনিস তাঁর ‘ইন্ডিকা’ গ্রন্থে পাটলিপুত্রের অসাধারণ জাঁকজমক ও সৌন্দর্যের বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর মতে, কাঠের তৈরি সুবিশাল প্রাচীর এবং শত শত দ্বারযুক্ত এই শহর তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও সমৃদ্ধশালী নগরী ছিল।
সম্রাট অশোকের প্রভাব: বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার ও প্রসারে এই শহর এক প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। পরবর্তীকালে গুপ্ত রাজাদের আমলেও (চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শতাব্দী) পাটলিপুত্র বিজ্ঞান, শিল্পকলা, শিক্ষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে ভারত তথা বিশ্বের অন্যতম সেরা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে।
মধ্যযুগ ও শের শাহ সুরির পুনরুত্থান
প্রাচীন সাম্রাজ্যের পতনের পর পাটলিপুত্র দীর্ঘকাল অবহেলিত ও প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। ত্রয়োদশ শতাব্দীর পর তুর্কি ও আফগান আক্রমণের মুখে এই প্রাচীন নগরী তার রূপ হারায়।
তবে ষোড়শ শতাব্দীতে মোড় ঘোরে। ১৫৪১ সালে বিহারের শাসক শের শাহ সুরি এই অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব বুঝতে পেরে গঙ্গার তীরে একটি নতুন দুর্গ নির্মাণ করেন এবং শহরটির নামকরণ করেন ‘পাটনা’। মুঘল আমলেও পাটনা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছিল।
ব্রিটিশ আমল এবং আধুনিক পাটনা
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলেও পাটনা পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র ও প্রশাসনিক ঘাঁটি হিসেবে গড়ে ওঠে। আফিম, চাল, নীল ও তুলার প্রধান বাজার ছিল এটি। ১৯১২ সালে যখন বাংলা প্রেসিডেন্সি থেকে আলাদা করে ‘বিহার ও উড়িষ্যা’ প্রদেশ গঠিত হয়, তখন পাটনাকেই তার নতুন রাজধানী করা হয়।
ঐতিহ্য ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
আজকের পাটনা কেবল আধুনিক ভবন ও কোলাহলপূর্ণ রাস্তাঘাট নয় এর প্রতিটি ধুলিকণায় মিশে আছে প্রাচীন ভারতের সুমহান ঐতিহ্য। গঙ্গার ঘাট, প্রাচীন গোলঘর, তখত শ্রী হরমন্দির জি (শিখ ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র তীর্থক্ষেত্র) এবং অদূরে অবস্থিত কুমারহাটে খননকার্য থেকে প্রাপ্ত প্রাচীন পাটলিপুত্রের নিদর্শন আমাদের সেই সোনালী অতীতের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
আজ আড়াই হাজার বছরের পথ পেরিয়ে পাটুলিপুত্র থেকে পাটনা হয়ে ওঠার এই যাত্রা প্রমাণ করে যে, ইট-কাঠের প্রাসাদ হয়তো ভেঙে যায়, কিন্তু সংস্কৃতির শিকড় ও ইতিহাস চিরকাল অমর হয়ে থাকে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন