উনকোটি: ত্রিপুরার পাহাড়ে পাথরে খোদাই করা এক রহস্যময় জগৎ।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ছোট্ট ও সুন্দর রাজ্য ত্রিপুরা। পাহাড়ি উপত্যকা, সবুজ বনানী আর সমৃদ্ধ সংস্কৃতির এই রাজ্যে লুকিয়ে রয়েছে এমন এক প্রাচীন ও রহস্যময় ঐতিহাসিক নিদর্শন, যা বিশ্বজুড়ে ইতিহাসপ্রেমী ও পর্যটকদের মনে বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। এই বিস্ময়ের নাম উনকোটি। ঘন সবুজ রঘুনন্দন পাহাড়ের গায়ে পাথরে খোদাই করা লক্ষ লক্ষ দেব-দেবী ও পৌরাণিক মূর্তির এক বিশাল সংগ্রহশালা এটি, যাকে বলা চলে ভারতের অন্যতম এক অমূল্য প্রত্নতাত্ত্বিক রহস্য।
ভৌগোলিক অবস্থান ও নামকরণের নেপথ্য ইতিহাস
ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা থেকে প্রায় ১৪০ কিলোমিটার দূরে, কৈলাসহর মহকুমার ঠিক কোল ঘেঁষে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক তীর্থস্থান ও পর্যটন কেন্দ্র। 'উনকোটি' কথাটির আক্ষরিক অর্থ হলো 'কোটির চেয়ে এক কম' অর্থাৎ এক কোটিতে একটি কম (৯৯,৯৯,৯৯)।
এই নামকরণ নিয়ে স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে এক আকর্ষণীয় পৌরাণিক কাহিনী। হিন্দু পুরাণ অনুসারে, একসময় দেবাদিদেব মহাদেব কোটি (এক কোটি) দেব-দেবীকে সঙ্গে নিয়ে কৈলাশ থেকে বারাণসী বা কাশীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন। যাত্রাপথে সন্ধ্যার সময় তারা এই রঘুনন্দন পাহাড়ে রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন। শিব তার সঙ্গীদের সূর্যোদয়ের আগেই ঘুম থেকে জেগে যাত্রা শুরু করার নির্দেশ দিয়ে নিজে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন।
পরদিন সকালে নির্ধারিত সময়ে ঘুম থেকে জেগে দেখা গেল, মহাদেব ছাড়া আর কেউই জেগে ওঠেননি! এই অলসতা দেখে ক্রুদ্ধ হয়ে শিব অভিশাপ দেন যে, তাদের সবাই যেন পাথর হয়ে এখানেই চিরকালের মতো রূপ নেয়। আর ঠিক সেই কারণেই পাহাড়ের বুকে খোদাই হয়ে রয়েছে কোটি থেকে ঠিক একটি কম অর্থাৎ উনকোটি মূর্তি।
পাহাড়ের বুকে খোদাই করা অপূর্ব শিল্পকলা
উনকোটির শিল্পশৈলী যেকোনো মানুষকে হতবাক করে দিতে বাধ্য। এখানে পাহাড় কেটে কোনো মূর্তি তৈরি করা হয়নি, বরং পাহাড়ের বিশালাকার পাথরের গায়ে অত্যন্ত নিখুঁত ও চমৎকার শৈল্পিক দক্ষতায় খোদাই করা হয়েছে বিভিন্ন দেব-দেবী ও পৌরাণিক চরিত্রের অবয়ব। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই স্থাপত্যগুলো মূলত অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ের। প্রাগৈতিহাসিক ও মধ্যযুগীয় বাংলার শিল্পরীতির এক অনন্য মিশ্রণ দেখা যায় এখানে।
উন্নত ও বিশাল শিবমূর্তি: উনকোটির প্রধান আকর্ষণ হলো পাহাড়ের গা জুড়ে খোদাই করা বিশাল আকৃতির শিবের মুখাবয়ব, যা স্থানীয়ভাবে 'উনকোটিশ্বর কালভৈরব' নামে পরিচিত। প্রায় ৩০ ফুট উঁচু এই পাথরের মাথাটির উচ্চতা ও গলার নকশা দর্শনার্থীদের মন্ত্রমুগ্ধ করে। এর মুকুট বা জটাতেই রয়েছে অসাধারণ সব কারুকার্য।
গণেশ ও অন্যান্য দেব-দেবী: কালভৈরবের দুপাশে রয়েছে দুটি বিশালাকার গণেশ মূর্তি। এছাড়াও এখানে দেবী দুর্গা, বিষ্ণু, সূর্যদেব এবং নানান পৌরাণিক চরিত্রের অপূর্ব সুন্দর ভাস্কর্য দেখা যায়।
ঝর্ণা ও জলপ্রপাত: পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা প্রাকৃতিক ঝর্ণার জল এই পাথরের ভাস্কর্যগুলোর ওপর দিয়ে বয়ে চলে, যা পুরো পরিবেশকে এক অদ্ভুত মায়াবী ও আধ্যাত্মিক রূপ দেয়।
প্রত্নতাত্ত্বিক রহস্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব
শত শত বছর ধরে ঘন জঙ্গলে ঢাকা থাকার কারণে উনকোটি দীর্ঘদিন ধরে বাইরের পৃথিবীর আড়ালেই ছিল। স্থানীয় আদিবাসী উপজাতির মানুষ বহু শতাব্দী ধরে এই স্থানটিকে পবিত্র তীর্থস্থান হিসেবে পুজো করে আসলেও, আধুনিক বিশ্বে এর গুরুত্ব উন্মোচিত হয় বেশ দেরিতে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এই স্থানটি একসময়ে শৈব ও শাক্ত সংস্কৃতির এক বিশাল পীঠস্থান ছিল।
তবে এই পাথরের মূর্তিগুলো কে বা কারা তৈরি করেছিলেন, তা আজও এক পরম রহস্য। পাহাড়ের দুর্গমতা এবং প্রাচীন কারিগরদের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কথা চিন্তা করলে আধুনিক কালেও এই ধরনের শিল্পকর্ম সৃষ্টি করা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। ঐতিহাসিকদের একাংশ মনে করেন, পাল রাজবংশ কিংবা স্থানীয় কোনো রাজবংশের পৃষ্ঠপোষকতায় এই স্থাপত্যগুলো গড়ে উঠেছিল।
উনকোটি ভ্রমণ: অভিজ্ঞতা ও প্রস্তুতি
প্রতি বছর জানুয়ারি মাসে এখানে ঐতিহাসিক 'অশষ্টমী মেলা' বসে, যেখানে ভারত তথা বাংলাদেশ ও বিভিন্ন রাজ্য থেকে হাজার হাজার পুণ্যার্থী ও পর্যটক ভিড় জমান। পাহাড়ের নির্মল হাওয়া, পাখির কলকাকলি এবং প্রাচীন ইতিহাসের ঘ্রাণ এক অদ্ভুত মানসিক শান্তি এনে দেয়।
কীভাবে যাবেন:
বিমানপথ: আগরতলা বিমানবন্দর (এমবি মহারাজা বীর বিক্রম বিমানবন্দর) থেকে সড়কপথে কৈলাসহর হয়ে উনকোটি পৌঁছানো যায়।
রেলপথ: সাম্প্রতিককালে কুমারঘাট রেলওয়ে স্টেশন চালু হওয়ার পর যাতায়াত আরও সহজ হয়েছে। কুমারঘাট থেকে উনকোটির দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার।
থাকার ব্যবস্থা: কৈলাসহর বা ধর্মনগরে সাধারণ মানের হোটেল ও লজ পাওয়া যায়।
উনকোটি কেবল পাথরের কিছু মৃত খোদাই করা মূর্তি নয়এটি আমাদের সুপ্রাচীন ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। ভারতের প্রাচীন সংস্কৃতির গভীরে প্রবেশ করতে এবং নিস্তব্ধ পাহাড়ে লুকিয়ে থাকা এক রহস্যময় জগতের রোমাঞ্চ অনুভব করতে জীবন একবার হলেও উনকোটি ঘুরে আসা উচিত। প্রকৃতির অকৃপণ সবুজ আর মানুষের শিল্পস্রোতের এমন অপূর্ব মিলনস্থল পৃথিবীতে সত্যিই খুব কমই দেখা যায়।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন