কোলকাতা থেকে দার্জিলিং ভ্রমণ যাবেন কী ভাবে।
কলকাতা থেকে দার্জিলিং—বাঙালির চিরকালীন নস্টালজিয়া আর পাহাড়ের প্রতি ভালোবাসার এক অন্য নাম। উত্তরবঙ্গের এই রাণী তার কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়ি পথ, ম্যালের আড্ডা আর কাঞ্চনজঙ্ঘার মোহময়ী রূপ দিয়ে পর্যটকদের বারবার টেনে আনে। আপনি যদি কলকাতা থেকে দার্জিলিং ভ্রমণের পরিকল্পনা করে থাকেন, তবে এই বিস্তৃত গাইডটি আপনার যাত্রাপথকে সহজ এবং আনন্দময় করতে সাহায্য করবে।
কলকাতা থেকে দার্জিলিং: স্বপ্নের পাহাড়ের পথে যাত্রা
কলকাতা থেকে দার্জিলিং যাওয়ার প্রধানত তিনটি উপায় রয়েছে: ট্রেন, বিমান এবং সড়কপথ। আপনার বাজেট এবং সময়ের ওপর ভিত্তি করে আপনি যেকোনো একটি বেছে নিতে পারেন।
১. ট্রেনে ভ্রমণ (সবচেয়ে জনপ্রিয় উপায়)
ট্রেনে কলকাতা থেকে নিউ জলপাইগুড়ি (NJP) যাওয়া সবচেয়ে আরামদায়ক এবং জনপ্রিয় মাধ্যম।
- প্রধান ট্রেনসমূহ: শিয়ালদহ বা হাওড়া স্টেশন থেকে দার্জিলিং মেল, পদাতিক এক্সপ্রেস, কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস, এবং অতি দ্রুতগতির বন্দে ভারত এক্সপ্রেস অন্যতম।
- সময়: ট্রেনভেদে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা সময় লাগে।
- পরবর্তী ধাপ: NJP স্টেশনে নেমে সেখান থেকে শেয়ার ক্যাব, প্রাইভেট গাড়ি বা ঐতিহাসিক টয় ট্রেনে চেপে দার্জিলিং পৌঁছানো যায়।
২. বিমানে ভ্রমণ (দ্রুততম উপায়)
সময়ের অভাব থাকলে আকাশপথই সেরা বিকল্প।
- রুট: কলকাতা (CCU) থেকে বাগডোগরা (IXB) এয়ারপোর্ট। স্পাইসজেট, ইন্ডিগো এবং এয়ার ইন্ডিয়া নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করে।
- সময়: বিমানে লাগে মাত্র ১ ঘণ্টা ১৫ মিনিট।
- পরবর্তী ধাপ: বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে দার্জিলিংয়ের দূরত্ব প্রায় ৭০ কিমি। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ট্যাক্সি বা প্রিপেইড ক্যাব পাওয়া যায়।
৩. সড়কপথে ভ্রমণ (রোমাঞ্চকর যাত্রা)
যারা ড্রাইভিং পছন্দ করেন বা বাসে যেতে চান, তাদের জন্য রয়েছে এসবিএসটিসি (SBSTC) বা এনবিএসটিসি (NBSTC)-এর ভলভো ও সাধারণ বাস। ধর্মতলা বা শিয়ালদহ থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত রাতভর যাত্রা করে সকালে পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছানো যায়।
দার্জিলিংয়ের দর্শনীয় স্থানসমূহ
দার্জিলিং মানেই কেবল ম্যাল নয়, এখানে রয়েছে দেখার মতো অসংখ্য জায়গা। আপনার ভ্রমণ তালিকায় নিচের জায়গাগুলো অবশ্যই রাখুন:
• টাইগার হিল : সূর্য দয়ের সময় কাঞ্চনজঙ্ঘা সোনালী রূপ দেখার সেরা জায়গা।
•বাতাসিয়া লুপ : টয় ট্রেনের আঁকাবাঁকা পথ এবং যুদ্ধে শহীদের স্মারক।
•পদ্মজানাইডু জুলজিক্যাল পার্ক : রেড পান্ডা এবং তুষার চিতার জন্য বিখ্যাত।
•হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট: পর্বত রোহের ইতিহাস এবং তেনজিং নরগের স্মৃতি।
•রং গার্ডেন এবং গঙ্গা মেইয়া পার্ক : পাহাড় কেটে বানানো ঝরনা এবং সুন্দর বাগান।
•হ্যাপি ভেলি টি এস্টেট: চা বাগানের মাঝখানে হারিয়ে যাওয়ার দারুন অনুভূতি।
•পিস প্যাগোডা এবং জাপানের টেম্পল : আধ্যাত্মিক শান্তি এবং শহরের পানোমারিক ভিউ।
৫ দিন ৪ রাতের একটি আদর্শ ভ্রমণ পরিকল্পনা (Itinerary)
- দিন ১: শিলিগুড়ি/NJP/বাগডোগরা থেকে যাত্রা শুরু। কার্শিয়াং হয়ে পাহাড়ি পথে দার্জিলিং পৌঁছানো। সন্ধ্যায় ম্যাল রোডে ঘুরে বেড়ানো।
- দিন ২: খুব ভোরে (ভোর ৪টে) টাইগার হিল। ফেরার পথে বাতাসিয়া লুপ ও ঘুম মনাস্ট্রি দেখে হোটেলে ফেরা। ব্রেকফাস্টের পর জুলজিক্যাল পার্ক, HMI এবং রোপওয়ে ভ্রমণ।
- দিন ৩: মিরিক ভ্রমণ। পথে পড়বে নেপাল সীমান্ত (পশুপতি মার্কেট) এবং পাইন বনে ঘেরা সিমানা ভিউ পয়েন্ট। রাতে দার্জিলিংয়ে ফেরা।
- দিন ৪: রক গার্ডেন ভ্রমণ অথবা নিজের মতো করে ম্যাল রোডে কেনাকাটা। গ্লেনারিতে বসে এক কাপ কফি আর পাহাড়ের দৃশ্য উপভোগ করা।
- দিন ৫: ফেরার পালা। ফেরার পথে লেপচাজগৎ বা কার্শিয়াংয়ের কোনো ক্যাফেতে লাঞ্চ সেরে NJP বা বিমানবন্দরের দিকে যাত্রা।
খাওয়াদাওয়া এবং কেনাকাটা
দার্জিলিং মানেই শুধু মোমো নয়, এখানে রয়েছে রকমারি খাবারের সমাহার।
- খাবার: 'গ্লেনারি' (Glenary's) এর পেস্ট্রি এবং ব্রেকফাস্ট মিস করবেন না। এছাড়া 'কেভেন্টার্স' (Keventer's) এর হট চকলেট আর সসেজ পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। স্থানীয় থুকপা বা নাগা থালিও ট্রাই করতে পারেন।
- শপিং: নেহরু রোড এবং ম্যাল থেকে পশমি পোশাক, হাতে তৈরি গয়না এবং অবশ্যই খাঁটি দার্জিলিং চা কিনতে ভুলবেন না।
কিছু প্রয়োজনীয় টিপস
১. পোশাক: মার্চ-এপ্রিলেও রাতে বেশ ঠান্ডা থাকে, তাই সাথে হালকা জ্যাকেট রাখুন। শীতকালে গেলে ভারী উলের পোশাক অবশ্যই নেবেন।
২. নথিপত্র: হোটেলের বুকিং কনফার্মেশন এবং নিজের পরিচয়পত্রের (আধার বা ভোটার কার্ড) কপি সাথে রাখুন।
৩. ওষুধ: পাহাড়ি রাস্তায় অনেকেরই মোশন সিকনেস (বমি ভাব) হয়, তাই প্রয়োজনীয় ওষুধ সাথে রাখুন।
দার্জিলিং আপনার মনের গভীরে এমন এক ছবি এঁকে দেবে যা আপনি সারাজীবন মনে রাখবেন। মেঘেদের আনাগোনা আর পাইন বনের দীর্ঘশ্বাস আপনাকে বারবার মনে করিয়ে দেবে—পাহাড় সত্যিই ডাকছে!
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন